চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বাড়ছে ডেঙ্গু, সচেতনতাই বাঁচার ‘একমাত্র উপায়’

গত বছর দেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবে সরকারি হিসাবে ১৭৯ জন মানুষ মারা গেলেও এই বছর এখন পর্যন্ত মাত্র একজন মারা গেছেন। মশাবাহিত এ রোগের কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কারও হয়নি। তাই ডেঙ্গু থেকে রক্ষা পেতে সচেতনতাকেই গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ্ ইমার্জেন্সী অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. এ বি মো. শামছুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এ দিন সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি মাসে এখন পর্যন্ত ১৩ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) ডেঙ্গু সন্দেহে এখন পর্যন্ত দুইটি মৃত্যুর তথ্য পাঠানো হয়েছে। তবে আইইডিসিআর পর্যালোচনা শেষ করে একটি মৃত্যু ডেঙ্গুজনিত বলে নিশ্চিত করেছে।

এ নিয়ে চলতি বছরের ৬ অক্টোবর (মঙ্গলবার) পর্যন্ত দেশে মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৪৭৭ জন। যার মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৪৬২ জন।

এর মধ্যে ঢাকা শহরের বিভিন্ন সরকারী, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত ৩৯৯ জন। যাদের মধ্যে ৩৮৫ জন চিকিৎসা সেবা নিয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছেন। এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ১৩ জন এবং ১ জন মারা গেছেন।

এছাড়াও বিভাগীয় শহরে ৭৮ জন রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি আছেন। ঢাকা বিভাগে (ঢাকা শহর ব্যতীত) ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৩২ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১১ জন, রাজশাহী বিভাগে ১ জন, খুলনা বিভাগে ১৯ জন, বরিশাল বিভাগে ৩ জন এবং সিলেট বিভাগে ১ জন।

তাদের মধ্যে ৭৭ জন চিকিৎসা সেবা নিয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছেন। যে একজনের মৃত্যু হয়েছে সেটি পর্যালোচনা শেষ করে সেটি ডেঙ্গুজনিত নয় বলে নিশ্চিত করেছে আইইডিসিআর।

জানুয়ারিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত ১৯৯, অক্টোবরে ১৩
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, জানুয়ারিতে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৯৯ জন। এরপর ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত এ সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমেছে। তবে জুন থেকে তা আবার বাড়তে শুরু করেছে।

ফেব্রুয়ারিতে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৪৫ জন, মার্চে ২৭ জন, এপ্রিলে ২৫ জন, মে’তে ১০ জন, জুনে ২০ জন, জুলাইয়ে ২৩ জন আগস্টে ৬৮ জন এবং সেপ্টেম্বরে ৪৭ জন এবং অক্টোবরে এখন পর্যন্ত ১৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

যেসব হাসপাতলে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীরা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, বর্তমানে হাসপাতালে সর্বমোট ভর্তি ১৩ জন রোগী সবাই ঢাকার বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী হাসপাতালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ৪ জন, পিলখানার বিজিবি হাসাপাতলে চিকিৎসাধীন ৪ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন।

এছাড়াও বেসরকারী ধানমন্ডির ইবনে সিনা হাসপাতালে ৩ জন, বসুন্ধরার এভার কেয়ার হসপিটাল, মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ১ জন করে রোগী ভর্তি রয়েছেন।

ডেঙ্গুর প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কার হয়নি
ডেঙ্গুর প্রতিষেধক ভ্যাকসিন এখনো আবিষ্কার হয়নি জানিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: এটা খুবই কষ্টদায়ক ব্যাপার। কারণ ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপ আছে।যার কারণে এখনো ভাইরাসটির ভ্যাকসিন আবিষ্কার সম্ভব হয়নি। তারপরেও ফিলিপাইনে একটা ট্রায়াল হয়েছিল কিন্তু অনেকেই মারা যাওয়ায় সেটা আর সামনে এগোয় নি।

অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ

তিনি বলেন, ডেঙ্গুর ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। যেমন আমাদের মশারি টানাতে হবে, মশার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে, সিটি করপোরেশনগুলোর মশা নিধনে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হবে। ঘর বাড়ির আঙ্গিনা পরিস্কার রাখতে হবে। জমা পানি রাখা যাবে না।

বিজ্ঞাপন

দেশে বর্তমানে কিছু ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে, তাই সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত ভূমিকা রাখতে হবে জানান তিনি।

এডিস মশা নিধনে সিটি করপোরেশনের ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ জানিয়ে স্বাচিপ মহাসচিব ডা. আজিজ বলেন, সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে মশা নিধনে ফগার মেশিনে যে স্প্রে টা করা হয় সেটার মাধ্যমে এডিস মশার লার্ভা মারা যায়।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে, আশঙ্কাজনক তথ্য নেই
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহনীলা ফেরদৌসী চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘‘ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ভেতরে আছে, কোন আশঙ্কাজনক তথ্য নেই। তারপরেও আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আসলে মশানিধন তো আমাদের কাজ না। আমাদের কাজ রোগী থেকে গেলে তার সঠিক চিকিৎসা দেওয়া। তারপরেও যেহেতু সাম্প্রতিক সময়ে বৃষ্টি হয়েছে, তাই আমরা বাড়তি পদক্ষেপ নিয়েছি। নিয়মিত সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করছি, তারা যেন তাদের কাজ সঠিকভাবে করেন।’’

অধ্যাপক ডা. শাহনীলা ফেরদৌসী

‘‘এরআগে আমরা সতর্কতা মূলক কাজ ও সার্ভে করেছি। যা কিনা কোভিড-১৯ এর ভেতর দ্রুততার সঙ্গে করেছি। আমরা দুই সিটি করপোরেশন সহ অন্যান্য যারা আছে তাদের সঙ্গে শেয়ার করেছি।’’

দুই সিটি করপোরেশন এই মৌসুমে ভালো কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘গত বছর এই সময়ে খুবই খারাপ অবস্থা ছিল, এ বছর এখন পর্যন্ত একজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে।এছাড়াও আমরা সারা দেশের সিভিল সার্জন অফিসে জানিয়েছিলাম জ্বর নিয়ে রোগী আসলে যেন সময় ক্ষেপন না করে কোভিড-১৯ ও ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো হয়। এবং সিভিল সার্জনরা সেটাই করেছে।’’

অধ্যাপক শাহনীলা জানান, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এপ্রিল মাসকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া মাস ঘোষণা করে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশের সব উপজেলায় সরবরাহের জন্য ৬৪টি জেলার সিভিল সার্জনদের কাছে ডেঙ্গু পরীক্ষায় ৪১ হাজার ৭০০টি কিট পাঠানো হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আরো পাঠানো হয়েছে। দেশে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটের কোন সংকট নেই।’

এডিস মশা নিধনে যা বলছে দুই সিটি করপোরেশন
ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন (উত্তর ও দক্ষিণ) কার্যক্রর ভূমিকা গ্রহণের কথা জানিয়েছে। ফলে বর্তমানে ডেঙ্গু অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

মো. গোলাম মোস্তফা সারওয়ার

ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কার্যক্রর ভূমিকা পালন করেছে জানিয়ে সংস্থাটির স্বাস্থ্য বিভাগের উপ প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. গোলাম মোস্তফা সারওয়ার চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে নতুন করে ৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আমরা মশা নিধনে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছি।

এছাড়াও আমাদের সিটি করপোরেশনের আওতাধীন বাড়ি, নির্মাণাধীন বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এডিস মশার লার্ভা ও এডিস মশা বংশবিস্তার উপযোগী পরিবেশ পাওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নিয়মিত জরিমানা করা হচ্ছে।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবু নাছের চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে অনেকগুলো স্টেকস হোল্ডারের মধ্যে সিটি করপোরেশন অন্যতম একটা স্টেকস হোল্ডার। মেয়র ফজলে নূর তাপসের নির্দেশনায় মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নতুন আঙ্গিকে পরিচালনা শুরু হয়েছে।’

মো. আবু নাছের

তিনি বলেন, ‘আগে যেখানে মশার প্রজননস্থলে ১ ঘণ্টা করে লার্ভিসাইডিং করা হতো সেটা বর্তমানে তা বাড়িয়ে ৭৫টি ওয়ার্ডেই দৈনিক চার ঘণ্টা করা হয়েছে। এছাড়াও পূর্ণ বয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য এক ঘণ্টার স্থলে দৈনিক চার ঘণ্টা করে এডাল্টিসাইডিং করা হচ্ছে।’

‘আগে মশক নিয়ন্ত্রণে সঙ্গে সম্পৃক্তদের কাজের ঘাটতি ছিল। এখন সেখানে এখন প্রায় শতভাগ কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়াও মশার কীটনাশকের গুণগত মানও নিশ্চিত করা হয়েছে।’