চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ
Partex Cable

বার্তা ছড়ানো জয়ে শুরু বাংলাদেশের বিশ্বকাপ

Nagod
Bkash July

চারিদিকে ফেভারিট, হট-ফেভারিট নিয়ে বিস্তর আলোচনা। বিশ্লেষকদের মনোযোগে নেই বাংলাদেশের কথা। দৃষ্টিটা নিজেদের দিকে টেনে নিতে ব্যাটে-বলে বার্তা দেয়া ছাড়া যে বিকল্প নেই সেটি ভালোই জানা মাশরাফী-সাকিবদের। ওভালে বার্তা দেয়া তেমনই এক ২১ রানের দাপুটে জয়ে বিশ্বকাপ শুরু করেছে বাংলাদেশ।

Reneta June

সাকিব ৭৫, মুশফিক ৭৮ ও মাহমুদউল্লাহ অপরাজিত ৪৬ রানের ইনিংস খেলেন। মোস্তাফিজ ৩ ও সাইফউদ্দিন ২ উইকেট নিয়ে জয় ত্বরান্বিত করেছেন।

২৭তম ওভারে মেহেদী হাসান মিরাজের চতুর্থ বলটি ফ্যাফ ডু প্লেসিসের স্টাম্প ভেঙে দিতেই আগাম উল্লাস শুরু হয়ে গেল বাংলাদেশ শিবিরে। টাইগারদের ছুঁড়ে দেয়া ৩৩১ রানের বিশাল লক্ষ্যের পথে কাঁটা হতে পারতেন যিনি, সেই প্লেসিস ২৩ ওভার আগে ফিরলে জয় হাতছানি দেয়ারই কথা! ডেভিড মিলার-জেপি ডুমিনিরা অবশ্য ছিলেন। কিন্তু সব বাধা উড়িয়ে দুরন্ত এক জয় তুলে নিয়েছে মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার দল।

বিশ্বকাপের তথা ওয়ানডেতে নিজেদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩৩০ রানের স্কোর গড়ে সাউথ আফ্রিকার জন্য পথটা আগেই কঠিন করে রেখেছিলেন সাকিব-মুশফিকরা। জবাবে ডু প্লেসিস-মিলাররা ম্যাচ জমিয়ে তুললেও শেষপর্যন্ত ৮ উইকেটে ৩০৯ রানে থেমে যায় মোস্তাফিজ-সাইফউদ্দিনদের সামনে।

বিশ্বকাপের আগে থেকেই হৈচৈ, রান দেখবে এবারের বিশ্বকাপ। কিন্তু এশিয়ার তিন প্রতিনিধি- পাকিস্তান ১০৫, শ্রীলঙ্কা ১৩৬ এবং আফগানিস্তান ২০৭ রানে নিজেদের প্রথম ম্যাচে অলআউট হওয়ায় বাংলাদেশকে নিয়ে ভাবনা ছিল! কেনিংটন ওভালে বিশাল সংগ্রহ গড়ে প্রথম আশ্বাসটা দিয়েছিলেন ব্যাটসম্যানরা।

চোটের কারণে হাশিম আমলার মতো অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান না থাকলেও প্রোটিয়াদের ব্যাটিং লাইনআপ বেশ লম্বা। শুরুতে কুইন্টন ডি ককের মতো মারকুটে ব্যাটসম্যান জ্বলে উঠলে সর্বনাশ ঘটতে পারে যেকোনো দলেরই।

সর্বনাশটা ঘটতে দেননি মুশফিক। এইডেন মার্করামের সঙ্গে উদ্বোধনী জুটিতে ৪৯ রান তুলে যখন বিপদ হয়ে উঠছিলেন ডি কক, তখনই আঘাত হানেন টাইগার উইকেটরক্ষক। মেহেদী মিরাজের করা দশম ওভারের চতুর্থ বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ নিতে ব্যর্থ হলেও দুই ব্যাটসম্যানের ভুল বোঝাবুঝির সুযোগে ডি কককে (২৩) রানআউট করেন মুশফিক।

ডি কক ফিরতেই উইকেটে আসেন প্রোটিয়া অধিনায়ক ডু প্লেসিস। মার্করামের সঙ্গে জুটিতে তুলে ফেলেন ৫৩ রান। সেই জুটি ভয়ঙ্কর হওয়ার আগেই সাকিবের আঘাত। ২০তম ওভারের চতুর্থ বলে তার আর্মবল ভেঙে দেয় ৪৫ রান করা মার্করামের উইকেট।

এই উইকেটেই অভিজাত এক রেকর্ডে ঢুকে পড়লেন সাকিব। ওয়ানডে ইতিহাসে মাত্র পঞ্চম ক্রিকেটার হিসেবে ৫০০০ রান ও ২৫০ উইকেট নেয়ার দারুণ কীর্তি গড়লেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার। জ্যাক ক্যালিস, সনাথ জয়সুরিয়া, শহিদ আফ্রিদি ও আব্দুল রাজ্জাকের এই রেকর্ড আছে। তবে তাদের চেয়ে কম ম্যাচ খেলে রেকর্ড গড়ে এখন চূড়ায় সাকিব।

১০২ রানে ২ উইকেট তুলে নিলেও বাংলাদেশের গলার কাঁটা হয়ে ছিলেন ডু প্লেসিস। এক ফাঁকে তুলে নেন নিজের ৩২তম ফিফটিও। ৬২ রান করে যখন ক্রমেই ম্যাচটাকে বের করে নেয়ার হুমকি দিচ্ছিলেন প্রোটিয়া অধিনায়ক তখনই বাংলাদেশের ত্রাণকর্তা হয়ে এলেন মেহেদী মিরাজ। ২৭ওভারে তার চতুর্থ বলটি বেরিয়ে এসে খেলতে গিয়ে বোল্ড হয়ে ফেরেন ডু প্লেসিস।

প্লেসিস ফিরলে উইকেটে তখন আরেক বিপজ্জনক ব্যাটসম্যান ডেভিড মিলার। ২০১৭ সালে পচেফস্ট্রমে টি-টুয়েন্টিতে মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনের এক ওভারে ৩১ রান নিয়েছিলেন। তাই তাকে নিয়ে চাপা আতঙ্ক ছিলই। রেসি ফন ডার ডুসেনের সঙ্গে চতুর্থ উইকেট জুটিতে ৫৫ রান তুলে মিলার জানানও দিচ্ছিলেন, সময় পেলে আবারও সেই ইনিংসটা খেলতে চান তিনি।

তবে মিলারকে পচেফস্ট্রমের সেই খুনে ব্যাটসম্যান হতে দেননি মোস্তাফিজুর রহমান। ফিজের ৩৬তম ওভারের প্রথম বলে মিডউইকেতে মিরাজের হাতে ক্যাচ হয়ে শেষ পর্যন্ত ৩৮ রানে থামে ‘দ্য কিলারের’ ইনিংস।

আতঙ্ক ছড়াচ্ছিলেন রেসি ফন ডার ডুসেনও। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফিফটি পাওয়া প্রোটিয়া ব্যাটসম্যান যখন এগোচ্ছেন টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফিফটির দিকে সাইফউদ্দিনের উইকেট বরাবর বলে লাইন মিস করে ৪১ রানে খুঁয়ে বসেন নিজের স্টাম্প। তিন ওভার বাদে সাইফউদ্দিনের ফুলটসে কাভার দিয়ে মারতে গিয়ে সাকিবের হাতে ধরা পড়েন আন্দিলে ফেলুকোয়ও (৮)।

সময়ে সময়ে ব্রেক-থ্রু পেলেও বাংলাদেশের বিপদ তখন পর্যন্ত কাটেনি। কারণ লম্বা প্রোটিয়া লাইনআপের শেষ ভরসা হয়ে উইকেটে ছিলেন অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান জেপি ডুমিনি। ৩৬ বলে ৪৫ করে জয়ের কাঁটা একটা পর্যন্ত নিজেদের দিকে হেলেও রেখেছিলেন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। ১৮ বলে ৪৪ রান প্রয়োজন পড়লেও সাউথ আফ্রিকা ম্যাচ জয়ের স্বপ্ন দেখছিল একমাত্র ডুমিনির কারণেই।

একে তো ডেথ ওভার তার উপর শ্বাসরুদ্ধকর এক অবস্থা। ৪৮ ওভারের দায়িত্বটা তাই নিজের সেরা অস্ত্র মোস্তাফিজের হাতে তুলে দিলেন মাশরাফী। ওভারের প্রথম বলেই ডুমিনির স্টাম্পের বেল ফেলে দিয়ে অধিনায়কের মুখ রক্ষা করেছেন ফিজ। এরপর কাগিসো রাবাদা ও ইমরান তাহির মিলে বাকি তিন ওভারে ২২ রানের বেশি তুলতে না পারায় স্বপ্নের এক জয় পায় বাংলাদেশ।

এর আগে বাংলাদেশকে বড় রানের পথটা প্রথমে দেখিয়েছেন সৌম্য সরকার। দুর্দান্ত শুরু করে সামনে এগোচ্ছিলেন নিজের টানা চতুর্থ ফিফটির দিকে। তার চলার পথে অনেকটা সত্যি হতে যাচ্ছিল তাকে নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক তারকা ড্যারেন গঙ্গার একটি অনুমান। ম্যাচ শুরুর আগে গঙ্গা বলেছিলেন, বাংলাদেশের অন্য ব্যাটসম্যানদের শর্ট বলে দুর্বলতা থাকলেও এই শর্ট বলের বিরুদ্ধেই মিশন সৌম্যর! ক্যারিবীয় তারকা অনুমান অনেকটা সত্যি করে ব্যাট চালাতে থাকেন বাংলাদেশ ওপেনার। যদিও শেষ পর্যন্ত আউটও হয়েছেন শর্ট বলেই।

৩০ বলে ৯ চারে ৪২ রানের তড়িৎ ইনিংস খেলার পর ক্রিস মরিসের একটি শর্ট বলে হুক খেলতে গিয়ে আউট হন। বল সৌম্যর ব্যাটের উল্টো পাশে লেগে উপরে যায় বাতাসে। অসাধারণ প্রচেষ্টায় সেই ক্যাচ লুফে নেন প্রোটিয়া উইকেটকিপার কুইন্টন ডি কক।

এরপরই সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিম ইনিংস মেরামত শুরু করেন। দুজনে এমনভাবে ব্যাট করতে থাকেন, যেন দোলনায় চড়িয়ে দোলাচ্ছেন প্রতিপক্ষ বোলারদের! ১৪২ রানের জুটি গড়েন সাকিব ও মুশফিক। এই এক জুটিতেই হয়েছে কয়েকটি রেকর্ড। এটি সাকিব-মুশফিকের পঞ্চম শতরান জুটি, যা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ। সঙ্গে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জুটির রেকর্ডও।

বোলিংয়ের মতো ব্যাটিংয়েও রেকর্ড করেছেন সাকিব। তার ৭৫ রানের ইনিংসটি তাকে বসিয়ে দিয়েছে অনন্য রেকর্ডে। ২০০৭ সালে প্রথম বিশ্বকাপ খেলা সাকিব টানা চার বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই হাঁকিয়েছেন ফিফটি। একই ম্যাচে ব্যক্তিগত ৫ রানের সময় দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটে ১১ হাজারি রানের ক্লাবে নাম লিখিয়েছেন তিনি। সাকিবের সামনে কেবল তামিম ইকবাল (১২৫৯২ রান)।

২৪ ওভার একসঙ্গে ব্যাট করার পর বিচ্ছিন্ন হন সাকিব-মুশফিক। সাকিব ৮৪ বলে ৭৫ করে ফিরলে ভাঙে জুটি। শুরু থেকে সাউথ আফ্রিকা বোলারদের দৌঁড়ের উপর রাখলে যাকে নিয়ে ভয় ছিল, সেই ইমরান তাহিরের বলে সুইপ খেলতে গিয়ে ফেরেন তিনি।

সাকিব ফেরার পর বেশিদূর যেতে পারেননি সেঞ্চুরির পথে হাঁটা মুশি। ফেলুকোয়ওর বলে বাউন্ডারিতে ভ্যান ডার ডুসেনের হাতে ধরা পড়লে শেষ হয় মিস্টার ডিপেন্ডেবলের ৭৮ রানের ইনিংস। তার ৮০ বলের ইনিংস সাজানো চোখ ধাঁধানো আটটি বাউন্ডারিতে।

ব্যাটে-বলে ভালো সংযোগ করলেও ইনিংস লম্বা করতে পারেননি নিউজিল্যান্ডের বাউন্সি উইকেটে সফল মোহাম্মদ মিঠুন। দুই চার ও এক ছক্কায় ২১ বলে ঠিক ২১ রান করেন তিনি। তবে শেষের ছোঁয়াটা দারুণ দেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও মোসাদ্দেক হোসেন। ২০ বলে ২৬ রান করে মরিসের বল মিডঅফরে উপর দিয়ে খেলতে গিয়ে ফেলুকোয়ও’র হাতে ক্যাচ দেন মোসাদ্দেক।

তবে শেষ ওভারে ১৪ রান নিয়ে বাংলাদেশের স্কোর ডাবল থ্রি জিরোতে পৌঁছে দেন মাহমুদউল্লাহ। ৩৩ বলে তিন চার ও এক ছয়ে ৪৬ রানের বিদ্যুৎগতির ইনিংস খেলে অপরাজিত থাকেন তিনি।

প্রোটিয়াদের হয়ে দুটি করে উইকেট নেন ফেলুকোয়ও, মরিস ও তাহির।

BSH
Bellow Post-Green View