চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ
Partex Group

ঐক্যের কথা বলেও বামেরা কেন ভাঙনে?

বিজ্ঞাপন

ওয়ার্কার্স পার্টির ৬ জন নেতা সম্প্রতি লেজুরবৃত্তি ও আদর্শচ্যুতির অভিযোগ তুলে যশোরে ওয়ার্কার্স পার্টির ১০ম কংগ্রেসের পাল্টা কংগ্রেস আহবান করেছেন। এর আগে ২০০৪ সালেও এমন পাল্টাপাল্টি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়েছিল৷ ৫ নেতার আহবানে সেদিন ওয়ার্কার্স পার্টি ভেঙে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি গঠিত হয়েছিল৷ পরবর্তীতে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিও ফের ভাঙনের মুখোমুখি হয়৷ ৫ নেতার এক নেতা নাসির উদ্দীন নাসুর নেতৃত্বে গঠিত হয় গণমুক্তি ইউনিয়ন নামের একটি আলাদা দল৷

সাইফুল হকের নেতৃত্বে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি বাম গণতান্ত্রিক জোটের অন্তর্ভূক্ত হয়ে বাম ঐক্যের কথা বলে যাচ্ছে৷ সোভিয়েতের পতনের পর বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টি সিপিবিও বিভক্ত হয়ে পড়ে৷ রূপান্তর পন্থী কমিউনিষ্ট পার্টি নাম দিয়ে সাইফুদ্দিন আহমদ মানিকের নেতৃত্বে একটি অংশ আলাদা হয়ে যায়৷ পরে এ অংশটি বিলুপ্ত হয়ে গণফোরামে যোগ দেয়৷ সাইফুদ্দীন মানিক হয়ে যান গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক৷ একই নামে ব্র্যাকেট বন্দী পৃথক সংগঠন গড়ে তুলতে বামেরাই এগিয়ে৷ জাসদ (রব), জাসদ (ইনু), জাসদ (আম্বিয়া)৷ জাসদ ভেঙে গড়ে ওঠা বাসদেও ব্র্যাকেট৷ জাসদ ভেঙে হল বাসদ৷ কিন্তু বাসদও এক থাকতে পারলো না৷ হয়ে গেল বাসদ (জামান) ও বাসদ (মাহবুব)৷ এই দুই বাসদও এক থাকতে পারলো না৷ বাসদ(জামান) এর একটি অংশ বেরিয়ে গঠন করল বাসদ (মার্ক্সবাদী)৷ বাসদ (মাহবুব)ও এক থাকতে পারলো না। বিভক্ত হয়ে গঠন করল বাসদ (রেজা) ও বাসদ (লিটন)৷ বামেরা এভাবেই দল ভাঙে আর বাম ঐক্যের আহবান জানায়৷ তাদের এই আহবানকে জনগণ কিভাবে মূল্যায়ন করে তা কি তারা ভাবে?

pap-punno

এমন প্রেক্ষাপটে ১৪ দলের শরীক ওয়ার্কার্স পার্টি আবারও ভাঙনের মুখে পড়লো৷ সরকারের সাথে থাকা, দলীয় প্রতীক হাতুড়ি বাদ দিয়ে নৌকা নিয়ে নির্বাচন ও মার্ক্সবাদের আদর্শচ্যুতির অভিযোগ তুলে একসময় নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বিমল বিশ্বাস আরও একটি ব্র্যাকেট সৃষ্টির দিকে যাচ্ছেন৷ তিনি একসময় ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ও দলত্যাগ করার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত ছিলেন পলিব্যুরোর সদস্য৷ ২০০৮ সালে নৌকা প্রতীক নিয়েও বিমল বিশ্বাস হেরে যান৷ পরের নির্বাচন গুলোতেও নৌকা প্রতীকের জন্য তিনি চেষ্টা করেছেন৷ এক্ষেত্রে প্রশ্ন নৌকা প্রতীক পেয়ে জয়লাভ করলে কী করতেন তিনি? এখন প্রশ্ন তুলছেন, পার্টি কেন নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করল? ওয়ার্কার্স পার্টি অতীতে আরও কয়েকবার ভাঙনের মুখে পড়েছে৷ তখন দল থেকে বেরিয়ে যান হায়দার আকবর খান রনো, আজিজুর রহমান ও আব্দুস সাত্তার প্রমুখ৷ তারা ওয়ার্কার্স পার্টি (পুনর্গঠন) নাম দিয়ে আরও একটি নতুন ব্র্যাকেটকে স্বাগত জানান৷ পরবর্তীতে হায়দার আকবর খান রনো চলে যান সিপিবিতে৷ আর একটি চমকপ্রদ বিষয় হলো ওয়ার্কার্স পার্টি ও সিপিবির এক পার্টি হয়ে ওঠার আলোচনার সময় হায়দার আকবর খান রনো তত্ত্ব দিয়ে বলেন যে, সিপিবির সাথে মতাদর্শগতভাবে এক হয়ে ওয়ার্কার্স পার্টির এক পার্টি হয়ে ওঠা সম্ভব নয়৷ পরবর্তীতে ওয়ার্কার্স পার্টি (পুনর্গঠন) নাম দিয়ে কিছু অনুসারী নেতাকর্মী নিয়ে বেরিয়ে যান৷ পরে আবার তিনি অনুসারীদের রেখে সিপিবিতে চলে যান৷

১৪ দলের আরেক শরীক জাসদ (ইনু)৷ দলটি গত কাউন্সিলে বিভক্ত হয়ে যায়৷ দলটির সাধারণ সম্পাদক শরীফ নূরুল আম্বিয়া, কার্যকরী সভাপতি মঈন উদ্দীন খান বাদল ও যুগ্ম সম্পাদক নাজমুল হক প্রধানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাসদ নাম দিয়ে আরও একটি নতুন দল গঠিত হল৷ তবে এ দলটিও ১৪ দলের অন্তর্ভূক্তই থাকে ও নৌকা প্রতীক পেতে দলটির নেতারা দৌড়ঝাঁপ করতে থাকে৷ মঈন উদ্দীন খান বাদল নৌকা প্রতীক নিয়ে জয়লাভ করে সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হন৷

Bkash May Banner

বাংলাদেশে মোট বামদল কয়টি? ব্র্যাকেটবিহীন কোন দল কি আছে? থাকলে কয়টি? বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টি সিপিবিও দুইটি৷ সিপিবি (এম) নাম দিয়ে আর একটি অংশ গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে৷ এভাবে বামরা আলাদা দল ও জোট গঠন করে চলেছে আর বাম ঐক্যের কথা বলছে৷ বামদের কত জোট বাংলাদেশে? বামগণতান্ত্রিক জোট, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য, ১০ দলীয় জোট, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট ও আরও কত কী! বাম দলে বিভক্তি, বাম জোটে বিভক্তি তবু তাদের মুখে বাম ঐক্য!

দল ভেঙে নতুন দল গড়েই তারা মিশে যায় কোন জোটে৷ কারণ আলাদাভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার সামর্থ্য নেই তাদের৷ সাম্যবাদী দলের একটি ব্র্যাকেট মিশে গেল ২০ দলে আরেকটি ব্র্যাকেট গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যে৷ এক্ষেত্রে বিএনপি জামাত-জোটকে আর না বলে ১৪ দলে যোগ দিয়ে সম্প্রতি নতুন ব্র্যাকেট করতে যাওয়া ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য বিমল বিশ্বাস, নূরুল হাসান ও ইকবাল কবির জাহিদরা কী করবেন? তারা কি ১৪ দলেই থাকছেন নাকি সাম্যবাদী দলের সেই অংশটির মত ২০ দলে যাচ্ছেন? নাকি যাচ্ছেন বামগণতান্ত্রিক জোট কিংবা গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যে?জোটগুলোও মুখিয়ে থাকে নতুন কোন দলকে নিয়ে জোটের পরিধি বাড়াতে৷ মুখে বাম ঐক্য আর বাস্তবে অনৈক্যের চারণ ভূমি সৃষ্টি করা বামদের সম্পর্কে আমার এক ঘনিষ্ট অগ্রজ কথাচ্ছলে বলেন, বামরা হল ব্যাঙের মতো৷ ব্যাঙ যেমন এক জায়গায় বেশিদিন থাকতে পারে না বামেরাও ঠিক তাই৷ উল্লেখ্য, তিনিও একসময় বামরাজনীতির সম্মুখ সারির নেতৃত্বে ছিলেন৷ এসব কারণে এখন আর বামরাজনীতি করেন না৷ আসলে সমস্যাটা বাম রাজনীতির নয় সমস্যাটা নেতৃত্বের৷ এসব নেতৃত্বই বাম রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। আর এসব কারণেই বামরাজনীতি হচ্ছে গণবিচ্ছিন্ন। ফলে সরে যাচ্ছে আদর্শবাদীরা৷

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বামপন্থীদের বিকল্প হয়ে ওঠার খুবই সুযোগ ছিল৷ আওয়ামী লীগ বিএনপি-জামাতকে দুর্বল করেছে এটা যেমন সত্য নিজেরাও জনমত ও গণআস্থা হারিয়েছে এটাও তেমন সত্য৷ সেজন্যই মানুষ ভোটদানে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে৷ এক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ও অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল ধারায় বামপন্থীদের বিকল্প হয়ে ওঠার বিশেষ সুযোগ ছিল৷ কিন্তু বাংলাদেশের বামপন্থী দলগুলো সেই আত্মবিশ্বাস নিয়ে রাজনীতিটা করতে পারেনি৷ তারা নিজ প্রতীক নিয়েও নির্বাচন করতে সাহস পায়নি৷ ১৯৯১ সালে সিপিবি কাস্তে হাতুড়ী বাদ দিয়ে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেছে৷ পরে আওয়ামী লীগ কর্তৃক অবমূল্যায়িত হয়ে নিজ প্রতীকে ফিরে এসেছে৷ ওয়ার্কার্স পার্টিও তাই৷ ২০০৮ সাল হতে তারা নিজেদের দলীয় প্রতীক হাতুড়ী বাদ দিয়ে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করে আসছে৷ এবার ২০১৯ সালের কংগ্রেসে তারা নিজ প্রতীকে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছে৷ এখানেও কারণটা আওয়ামী লীগ কর্তৃক অবমূল্যায়নের৷ দলীয় প্রতীক মশাল বাদ দিয়ে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেছে জাসদ৷ আগামী নির্বাচনে তারা কী করবে দলটিই জানে?

১৪ দল ও ৮ দল গঠন করে যদি দলীয় প্রতীক বিসর্জন দিতে পারে তবে বামপন্থীরা সবাই মিলে একটি জোট গঠন করে যে কোন একটি বামপন্থী দলের মার্কাকে কেন তাদের জোটের মার্কা করতে পারছে না? আপাতত একটি অভিন্ন মার্কা নিয়ে নির্বাচনী জোটের মাধ্যমে বামপন্থীরা একটি ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে৷ তারা নিজেদের বাস্তববাদী ভাবলেও এই বাস্তব সত্যটাকে উপেক্ষা করে চলছে৷ এভাবে দল ভেঙে নতুন দল করে বাম ঐক্যের আহবানে মানুষ এখন হাসে৷ অনেকেই গণভিত্তি উপেক্ষা করে নিজেদের পদপদবীকেই বড় করে দেখে চলছে৷ ঢাকায় বসে বড় কেন্দ্রীয় নেতা এলাকার মানুষ জানে না নেতার পরিচয়৷ চেনে না নেতাকে, চেনে না নেতার পার্টিকে৷

সমাজতান্ত্রিক মজদুর পার্টি ১৪ দলের শরীক৷ নির্বাচনে দলের প্রধানও মনোনয়ন পায় না৷ সারাদেশে সংসদ নির্বাচন করতে পারে এমন একজনও নেই৷ সেই দলও ভেঙে দু’টো হয়ে যায়৷ ঢাকার তোপখানা রোডে গেলে দেখা মেলে কত কত বামের৷ তারা এখন শ্রেণি শত্রু তত্ত্ব বাদ দিয়ে যেন বামশত্রু তত্ত্বে ফিরে এসেছে৷ তারা সারাদিন টো টো করে ঘুরে আর আরেক বামের গোষ্ঠী উদ্ধার করে৷ কিন্তু জনগণ একটি বিকল্প শক্তির জন্য মুখিয়ে আছে৷ এই বাস্তব সত্যটা বামেরা যত তাড়াতাড়ি বুঝবে বামেদের জন্য তা ততই মঙ্গলজনক হবে৷ কিন্তু বাংলাদেশের বামপন্থীরা তা বুঝবে কি?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন

Bellow Post-Green View
Bkash May offer