চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বাজেট ২০২০: গৌরী সেনের টাকা কে কতটা পাবে?

প্রতিটি দেশের জাতীয় বাজেটে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন ঘটে, এমনটিই বলা হয়।

বাংলাদেশে ধনবান এবং মন্ত্রী-এমপিরা হাচি-কাশি-সর্দি হলেই সিঙ্গাপুর-ব্যাঙ্কক চলে যায়। এটা নিয়ে এতদিন বিস্তর আলোচনা হয়েছে। রোগী নিয়ে যেতে ৪০-৫০ লাখ ব্যয় করে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত ভাড়া করা হয়েছে। কত ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ! কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ায় বিভিন্ন দেশ বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয়। এর মধ্যেও কেউ কোনো কারণে বাধ্য হয়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে গেলে তাকে ১৪ দিন কোয়ারাইনটেনে থাকতে হয়। ঢাকাতে এসেও অনেককে এমন দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। সেটা বাসায় হতে পারে। আইসোলেন কেন্দ্র বা হাসপাতালে হতে পারে। করোনার কারণে বাংলাদেশের ধনবান কিংবা অন্যভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতে পারছেন না, এ নিয়ে মজার আলোচনা চলছিল। কিন্তু দেখা গেল ধনবানদের মুশকিল আছানের ব্যবস্থা রয়েছেই। তিন জুটির জন্য চার্টার্ড ফ্লাইট আকাশে উড়েছে। টাকা কথা বলছে, বলবে তার প্রমাণ বাংলাদেশে মিলেছে। বিমান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠে যাক। দেখবেন আরও কত স্পেশাল ফ্লাইট ওড়ে।

বিজ্ঞাপন

স্বাধীনতার কয়েক বছর পর বাংলাদেশের সকল ব্যাংকে খোঁজ পড়েছিল এক কোটি টাকা ব্যাংকে জমা আছে, এমন অ্যাকাউন্ট কতটি রয়েছে। সর্বসাকুল্যে ২৪ টি মিলেছিল। কোটিপতি বাড়ছে, এ নিয়ে বিস্তর সমালোচনা। কারণ ১৯৭২ সালে না-কি এ রকম দুটি অ্যাকাউন্ট ছিল। তাও সম্ভবত সরকারি প্রকল্পের জমা রাখা টাকা। ২০০০ সালে ‘বাংলাদেশে ব্যাংকিংয়ের তিন দশক’ বিষয়ে একটি গ্রন্থ লিখতে গিয়ে জানতে পারি ব্যাংকে এক কোটি টাকা জমা রয়েছে, এমন ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট সংখ্যা ১৮ শ’ ছাড়িয়ে গেছে। গত ২০ বছরে এ সংখ্যা বেড়ে ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে।

ঋণপ্রাপ্তিতেও ধনবানদের অগ্রাধিকার। সেই ২০০০ সালেই জেনেছিলাম, সব ব্যাংক মিলে যত ঋণ দেয় তার অর্ধেকের বেশি পায় কোটিপতিদের শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান। এখন কোটিপতিদের কদর বেড়েছে।করোনাভাইরাস

স্বাধীনতা সংগ্রামের অঙ্গীকার ছিল, ব্যাংক-বীমা-পাট ও বস্ত্র শিল্প জাতীয়করণ করা হবে। বঙ্গবন্ধু সে অঙ্গীকার পূরণ করেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর নিষ্ঠুর সামরিক স্বৈরশাসন জারি করে এ নীতি থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সরে আসা হয়। রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠান একে একে চলে যায় ব্যক্তি খাতে। ব্যক্তি খাতে ব্যাংক-বীমা স্থাপিত হয়। হাল আমলের হিসাব, দেশের ব্যাংকগুলোতে যে প্রায় ১২ লাখ কোটি টাকা জমা আছে, তার ৭০ শতাংশের বেশি রয়েছে ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে। এটাও জানা যে, এমন অনেক শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী রয়েছেন যারা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে দাপটে বিরাজমান, আবার তারাই শিল্প ও বাণিজ্যের বিভিন্ন চেম্বারের নেতা এবং একইসঙ্গে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক। চেম্বার নেতা হিসেবে তারা দাবি করেন, শিল্প-বাণিজ্য খাতে ঋণের সুদ কমাতে হবে। আবার একই ব্যক্তিবর্গ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বসে ব্যাংক ঋণের সুদ হার কমাতে পারেন না। সংবাদপত্রের মালিকরা পত্রিকা প্রকাশের জন্য সরকারের কাছে কাগজ-কালির আমদানির ওপর সাবসিডি দাবি করেন। এক সময়ের ৮ পৃষ্ঠার পত্রিকা ৩২-৩৬ পৃষ্ঠায় নিয়েছে কিন্তু মালিকরাই। তারপরও আমজনতার ট্যাক্সের পয়সায় ভর্তুকি দিতে হবে সরকারের বাজেট থেকে।

এক সময় দেখা গেল, ব্যাংকের মালিকরা নিজ নিজ ব্যাংক থেকে বিস্তর ঋণ নিচ্ছে। এর কুফল হিসেবে খেলাপি ঋণের বোঝা বাড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ম করে দেয়, পরিচালনা পর্ষদের কেউ নিজের ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবে না। দুষ্টু বুদ্ধি উদ্ভাবনে দেরি হয় না। ‘আমি তোমার ব্যাংক থেকে ঋণ নেব, তুমি আমার ব্যাংক থেকে।’ পারস্পরিক পিঠ চুলকানিতে কিছু ঝামেলা হওয়ার জন্যই দুই ব্যাংকের ‘মালিকদের’ মধ্যে সাম্প্রতিক বিরোধ। এটা দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। স্থায়ী হলে অনেক শিল্প গ্রুপ সমস্যায় পড়বে। একশ’ কোটি টাকার জামানত রেখে ৫০০ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের ব্যবস্থা অনেকে ধনবান পরিবারের জন্য সোনার ডিম পাড়া হাঁস। এ ধরনের ঋণের সুবিধা যারা ভোগ করে, তারা করোনাকালে একটা নয় ১০০ টা বিমান চার্টার করলেও কোনো সমস্যা নেই। টাকা তো আর পকেট থেকে যায় না। এ জন্য আছে গৌরী সেন।

করোনার শিক্ষা দাবি করে, সরকারি অর্থ বরাদ্দে যুগ যুগ ধরে চলে আসা মনোভাব কিছুটা হলেও পাল্টাবে। গৌরী সেন আগের মতো কেবল ধনবানদের স্বার্থ দেখবেন না। স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা খাতের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা প্রসারের কৃিতত্ব সরকার দাবি করতেই পারে। পাশাপাশি বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতও বিকশিত হয়েছে। কিন্তু যখন ক্যান্সার, কিডনি, হৃদরোগ, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা এ ধরনের জটিল ও ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে তখন দরিদ্র কেন, মধ্যবিত্ত পরিবারও অসহায়। বেসরকারি খাতে অন্তত ২০ টির মতো প্রতিষ্ঠান দাবি করে। তারা বিশ্বমানের হাসপাতাল তৈরি করেছে বাংলাদেশে। সরকারি খাতে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান কেবল একটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু করোনাকালে দেখা গেল, কতই না অহসায় তারা!

একটি তথ্য জানার আগ্রহ বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালের কত জন সিনিয়র চিকিৎসক বেসরকারি হাসপাতালের মালিকানার সঙ্গে জড়িত। অনেক খ্যাতিমান চিকিৎসক একাই বড় ক্লিনিকের মালিক। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর ও ওষুধ প্রশাসনের সঙ্গেও সরকারি হাসপাতালের সিনিয়র চিকিৎসকদের সম্পর্ক কতটা, সেটা জানতেও আগ্রহ স্বাভাবিক।

বিজ্ঞাপন

প্রায় একবাক্যে আমরা জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলছি। কিন্তু ব্যাংক-বড় শিল্প ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান এবং একদল সিনিয়র চিকিৎসকের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে যে স্বাস্থ্যখাত গড়ে তোলা হয়েছে তাতে পরিবর্তন না এনে নতুন যুগের উপযোগী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে না। অর্থমন্ত্রী হয়ত বরাদ্দ বাড়াবেন, কিন্তু শেষ বিচারে তা ভোগে লাগবে বড় বড় প্যাথলজিক্যাল ল্যাব ও ক্লিনিকের মালিকদের।

গোরৗ সেনের টাকার ভাগের কিন্তু অনেক দাবিদার। শিক্ষার প্রসার ঘটেছে ব্যাপকভাবে, সন্দেহ নেই। ১৭ লাখ ছাত্রছাত্রী মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেছে, ভাবা যায়। শতাধিক দেশের কোনোটিতেই তো এত লোক লোক বসবাস করে না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও প্রকৌশল শিক্ষার প্রতিষ্ঠান শতাধিক। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ও বাড়ছে। কিন্তু উচ্চতর এ সব প্রতিষ্ঠানে গষেণা কেন গুরুত্ব পাচ্ছে না? এখন থেকে কি সরকারের মনোভাবে পরিবর্তন ঘটবে? পাস করে চাকরির নিশ্চয়তা নেই। উচ্চ শিক্ষিত বেকার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনতে যে সব নীতি ও কৌশল দরকার, বাজেটে তা থাকবে কি?

পাঁচ-ছয় বছর আগে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজটে বরাদ্দ তুলনামূলক কম এ তথ্য তিনি অনেক কেটে বের করেছেন। পরের বাজেটে পরিবর্তন ঘটবেই, সে আশ্বাস তিনি দেন তুমূল করতালির মধ্যে। ওই বক্তব্য প্রদানের আগে তিনি অন্তত পাঁচটি বাজেট দিয়েছিলেন। কোন খাতে কত বরাদ্দ দেওযা হবে, সে সিদ্ধান্তের প্রধান ক্ষমতাও ছিল তার। আর বক্তব্যের পরের বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত আদৌ বিশেষ গুরুত্ব পায়নি, সেটা ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকের মতো আমারও জানা।

ফাইল ছবি

কৃষির কথাও বলা যেতে পারে। করোনার ধাক্কা সামলাতে পেরেছে বাংলাদেশের কৃষি খাত, এটা বলা অযৌক্তিক নয়। বোরো চাল উঠেছে ২ কোটি টনের বেশি। গ্রামে গ্রামে এখন কোটি কোটি কৃষকের পণ, আগামী কয়েক মাস কোনো জমি খালি রাখা যাবে না। সরকার ১০৪০ টাকা দামে ৪০ কেজি ধান কিনতে চেয়েছে কৃষকদের কাছ থেকে। আর ৪০ কেজি চাল কিনবে ১৪৪০ টাকা দরে। চালই কিনবে বেশি এবং এটা সরবরাহ করতে পারবে কেবল বড় চালকল মালিকরা। অথচ লাখ লাখ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত কৃষক যদি সরকারের কাছ থেকে ৪০ কেজি ধান বাবদ ১০৪০ টাকা পেত, গ্রামীণ অর্থনীতির চেহারা পাল্টে যেত। ব্যবস্থাটা এমন হতে পারত যে সরকার কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনে চালকল মালিকদের কাছে ভাঙ্গিয়ে সিএসডি গোডাউনে মজুদ করবে। আর চালকল মালিকরা পাবে ধান ভাঙানোর চার্জ। এর ফলে অনেক লোকের হাতে অর্থ যেত। তারা ত্রাণের লাইনে ভিড় জমাত না। রিলিফ চাইত না। বরং শিল্প পণ্যের বাড়তি চাহিদা তৈরি করত। কৃষি খাতে সরকার হয়ত বরাদ্দ বাড়াবে। কিন্তু মূল নীতিতে পরিবর্তন না আনলে করোনাত্তোর যুগের প্রত্যাশা পূরণ হবে না।

রফতানি বাণিজ্যে কিছু ক্ষেত্রে আমাদের সমস্যা হওয়ার কথা। খাদ্য ও কয়েক ধরনের কৃষি পণ্য রফতানি করে তার কিছুটা আমরা পূরণ করতে পারি। আমাদের এটা জানা যে, শিল্প ও বাণিজ্যের মতো উচ্চ হারে কৃষিতে রিটার্ন আসে না। বছরে হাজার মণ ধান তোলেন যে ধনী কৃষক, তার দুই-তিন লাখ টাকা লাভ তোলা কঠিন। অথচ এই ধান কিনেই চালকল মালিকরা অঢেল অর্থের মালিক হয়ে যান।

করোনাত্তোর সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক লাখ কোটি টাকার ওপর প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। এ অর্থ বিতরণ শুরু হয়েছে। বাজেটে এ বিষয়টির বিশেষ উল্লেখ থাকবে, ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু উদ্বেগের কথাও জেনেছি। অনেক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সন্দেহ ঋণ নিয়ে কিছু গ্রাহক লাপাত্তা হয়ে যাবে। তারা যথাযথ বন্ধকি সম্পত্তি রাখবে না। ১০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ২০ কোটি টাকার সিকিউরিটি দেবে। কোনো ব্যাংক অফিসার তা দিতে অস্বীকার করলে আটকে রেখে খোঁড়া করে ফেলার হুমকি দেওয়া হবে। নসিব খারাপ হলে কেবল খোঁড়া নয়, জানও যেতে পারে। এ কারণে ব্যাংকগুলোর দাবি, তারা যে ঋণ দেবে সে ঋণ যদি গ্রহীতাদের একটি অংশ ফেরত না দেয়, তা পূরণ করে দেবে সরকার। বেশ মজার বিষয়, তাই না? ঋণ নিয়ে ব্যবসা করবে ব্যক্তি। কিন্তু ঋণ ফেরত না এলে তা পুষিয়ে দেবে সরকার।

অর্থমন্ত্রীর জন্য কাজটি কঠিন, সন্দেহ নেই। যে কোনো অর্থমন্ত্রীকেই সমাজের নানা অংশের চাহিদা-প্রত্যাশার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হয়। কিন্তু সকলে তো অর্থমন্ত্রীর কাছে পৌঁছাতে পারে না। একবার অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া আমাকে বলেছিলেন, শিল্প ও বণিক সমিতির বিভিন্ন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন তার কাছে যে সুবিধা চাইছে, তা মেটাতে হলে কয়েক বছরের রাজস্ব আয় দিয়েও হবে না। তারা সরকারকে ট্যাক্স দিতে চায় না। ফাঁকি দেয় বিস্তর। করোনার বিপর্যয়ের কারণে বর্তমান অর্থমন্ত্রীর সামনে দাবিনামা আরও অনেক বড় হয়েই আছে। এর সঙ্গে আছে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের বিপুল চাহিদা। অর্থমন্ত্রী কী করবেন?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)