চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বাজেটে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও জীবন-জীবিকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার চায় বিএনপি

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সময়ে আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্ব্য ব্যাবস্থাকে পুরোপুরি ভেঙ্গে নতুন করে সাজানোর দাবি করেছে বিএনপি। এছাড়াও বাজেটে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে জোর না দিয়ে মানুষের জীবন ও জীবিকার বিষয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

মঙ্গলবার বেলা ১১টায় উত্তরার নিজ বাসা থেকে ‘বাজেট ভাবনা: অর্থবছর ২০২০-২১’ শীর্ষক ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে দলের এ বাজেট ভাবনা তুলে ধরেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, আমরা বিগত ৪ এপ্রিল জরুরি ভিত্তিতে নগদ সহায়তা প্রদান, তৈরি খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী বিতরণ, ছিন্নমূলদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র খোলা, গার্মেন্টস ও রফতানিমুখী শিল্প, প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্প, কৃষিখাত, খাদ্য সংগ্রহ এবং প্রবাসীদের জন্য আর্থিক সহায়তা সাপোর্ট প্রদান, স্বাস্থ্যখাতের জরুরি উন্নয়ন ও অপ্রত্যাশিত খাত ইত্যাদি ক্ষেত্রে ৮৭ হাজার কোটি টাকার যে জরুরি আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ প্রস্তাব করেছিলাম, তা আগামী বাজেট প্রণয়নের প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনায় নিতে হবে।

মির্জা ফখরুল বলেন, এ সংকটকালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে জোর না দিয়ে মানুষের জীবন রক্ষা ও জীবিকার বিষয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। মন্দকালীন বিনিয়োগ, ভোগ ব্যয় ও রফতানি কমে যাওয়ায় সামষ্টিক চাহিদা বাড়াতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধিতে সর্বাধিক জোর দিতে হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সার্বজনীন মৌলিক প্রয়োজনীয় যেমন-স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, শ্রমকল্যাণ, কৃষি, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। কৃষি, শিল্প ও সেবাখাতের বহুমুখীকরণ, উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো কৌশলগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘কোভিড-১৯ মহামারির প্রকোপে সারা বিশ্ব বিপর্যস্ত। কতদিন এ দুর্যোগ চলবে তাও অনিশ্চিত। জীবন ও জীবিকার টানাটানিতে জনজীবন ও অর্থনীতি দুটোই মহা সংকটে রয়েছে। এ পটভূমিকায় শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনাকালের এবারের বাজেট গতানুগতিক হবে না। করতে হবে বিশেষ বাজেট। এর মুখ্য উদ্দেশ্য হবে করোনা ভাইরাসের প্রভাব মোকাবিলার মাধ্যমে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা ও দুর্ভোগ উপশম করা। ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করে স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনা। এজন্য দরকার হবে সহায়ক নীতি সহায়তা। অনেকে মনে করেন, করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা না কমলে নতুন বাজেট করে কোনো লাভ নেই। লক্ষ্য হওয়া উচিত আগামী ছয় মাসের জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন বাজেট করা। কারণ করোনার কারণে পূর্ণাঙ্গ বাজেটের কোনো লক্ষ্যই অর্জিত হবে না। আবার অনেকে মনে করেন, অর্থনীতির অস্বাভাবিক সংকোচনে প্রচলিত বাজেট ব্যবস্থা থেকে সরে এসে তিন বছরের মধ্য-মেয়াদি পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার আলোকে বাজেট প্রণয়ন করতে হবে।’

বিজ্ঞাপন

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘কোভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি সবকিছুর মধ্যে এক ধরনের পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে। আমূল পরিবর্তন না করলে অর্থনীতি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থবির হয়ে যাবে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতায় বড় ধরনের আঘাত আসবে। এ পরিবর্তন কীভাবে ঘটবে তা নির্ভর করবে রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কের ওপর।’

তিনি বলেন, ‘এ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা তখনই কাজ করে যখন দেশে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিরাজমান থাকে, যা আমাদের দেশে বর্তমানে চরমভাবে অনুপস্থিত। জনগণের কাছে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের কোনো জবাবদিহিতা নেই। কারণ তারা জনগণের ভোটের তোয়াক্কা করে না। একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের কারণে সরকারের কোনো বৈধতা নেই। তারপরও এ মহা সংকটের সময় বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে আমরা দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ জাতীয় প্রয়াসের আহ্বান জানিয়েছিলাম। সরকার তা গ্রাহ্য না করে পুরো জাতিকে আজ চরম ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। করোনা ভাইরাস সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থতা এবং এর সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিণতির দায় বর্তমান সরকারকেই বহন করতে হবে।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘করোনা ভাইরাস সংকটের মধ্যে ১১ জুন আগামী ২০২০-২০২১ অর্থবছরের জন্য একটি গতানুগতিক বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। পত্রপত্রিকার সূত্রে জানা যায়, বাজেটের আকার হতে পারে ৫ লাখ ৫৬ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেট ছিল ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে মূল বাজেটে প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। সংশোধিত হার ৫ শতাংশ নির্ধারণের কথা শোনা যায়। যদিও আইএমএফ বলছে, চলতি অর্থবছরে জিডিপি হবে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, বিশ্বব্যাংক বলছে ২-৩ শতাংশ এবং ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স বলছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ।’

তিনি বলেন, ‘আসন্ন বাজেটে ঘাটতির প্রস্তাব করা হচ্ছে জিডিপির ৬ শতাংশ। ঘাটতির পরিমাণ হতে পারে ১ লাখ ৭২ থেকে ৭৫ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত রাজস্ব প্রাপ্তি ধরা হচ্ছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি বছর ছিল ৩ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ৭ হাজার কোটি টাকা বেশি। তন্মধ্যে এনবিআর সূত্রে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি, আর বাকি ৫৯ হাজার কোটি অন্য খাত থেকে। এনবিআরের পক্ষে এতো বিরাট অংকের রাজস্ব আহরণ (প্রায় ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি) একেবারেই অসম্ভব। তাই এবারের বাজেট হতে যাচ্ছে কাল্পনিক কাগুজে বাজেট।’

তিনি আরও বলেন, ‘শোনা যায় আগামী অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। আর গড় মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা স্পষ্টতই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তৈরি পোশাক শিল্পে ক্রয়াদেশ অর্ধেক হয়ে যেতে পারে। রাজস্ব আাদায়ও বড় ধরনের অনিশ্চিত। প্রবাসী আয়ও কমে যাবে। স্বাভাবিকভাবে অভ্যন্তরীণ ভোগের চাহিদাও কমবে। তাহলে এতো প্রবৃদ্ধি হবে কীভাবে ? লক্ষ্য যদি ভুল হয় তাহলে সব খাতেই ভুল হতে বাধ্য। সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোতেই গলদ রয়েছে।’