চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বাঙালির যাপিত জীবনে এক নন্দিত আলেখ্যেরই মূর্ত প্রকাশ

টেলিভিশনকে বোকার বাক্স বলা হয়। এখনো কেউ কেউ বলে। কিন্তু কেন বলা হয় সকাল থেকে সংস্কৃতি জগতের কতক বিশিষ্টজনকে জিজ্ঞেস করে বোকাই থেকে গেলাম। তখন মনে হলো বাংলাদেশে টেলিভিশন পরিচালনায় শৈল্পিক দক্ষতার দুই মহীরূহ কিংবদন্তি আসনে এখনো তো দীপ্যমান।

তাদের এই বোকার বাক্সের তালা খোলার কথা বোধ হয় পাব। মোস্তফা মনোয়ার ভাইকে (তার প্রযোজনায় আমি প্রথম প্রথম শিশুদের প্রোগ্রাম উপস্থাপনা করি ডিআইটি ভবন থেকে) ফোন করি। কিন্তু তাঁর এনালগ ফোন শুধু বেজেই চলে।

বিজ্ঞাপন

আমি এখন মরিয়া। কানাডায় ফোন করি জামিল ভাইকে। তিনি একটু সময় চাইলেন, এ নিয়ে বলবেন বলে। এই সময়টায় কলকাতায় ফোন করলাম নাট্যকার, অভিনেতা ও ইংরেজি বাংলার লেখক (আনিস স্যারের ‘আমার একাত্তরের’ অনুবাদক) অংশুমান ভৌমিককে। তিনি তখনই ফোন ধরতে পারছেন না জানালেন অপারেটর। ইতোমধ্যে কানাডা ঘন্টি বাজিয়ে দিলো জামিল ভাইয়ের ফোন। তিনি বললেন, প্রথম দিকে টেলিভিশনে শুধু ছবি আসতো। কথা তেমন কিছু না। ওতে আমোদ বা বুদ্ধিবৃত্তিকতার কিছু ছিল না। ছবিটবি দেখে বোকার মতো হাসি বা হে হে করা আর কি!

বিজ্ঞাপন

এর কিছু পরে ফোন এলো অধ্যাপক নাট্যকার অংশুমান ভৌমিকের। তিনি বিষয়টি বললেন আরো সবিস্তারে। তার বয়ানটি জামিল চৌধুরীর ধারণার অনুপুক্সখ ভাষ্য। তিনি বললেন, ঘটনা ইংল্যান্ডের। তখন প্রচার ও গভীর চিন্তার মাধ্যম রেডিও। বিনোদনও সেখানে লভ্য। তবে তা শ্রবণযোগ্য, দৃশ্যমান নয়। সেই জায়গায় টেলিভিশনে এল দৃশ্যমান ছবি। তবে শুধু ছবি নয়, কিছু ইঙ্গিতও। সাধারণ মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ল। তিনি বললেন, সেসব তো গভীর কোনো চিন্তার খোরাক দেয় না। এ হলো আম লোকের মজার জিনিস। ইন্টেলেকচুয়ালরা তাই একে ইডিয়েট বক্স বলে বাড়িতে স্থান দিলেন না।

১৯৬৪ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের কর্মকর্তারা মননে, মেধায় উদ্ভাবনায় এক অনন্য চিত্তবিনোদন ও শৈল্পিক গণমাধ্যমে পরিণত করলেন। জামিল চৌধুরীকে বললাম আপনারা দস্তয়েভস্কির ইডিয়ট করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’, মুনীর চৌধুরীর অনুবাদে শেক্সপিয়রের ‘দ্য টেমিং অব দ্য শ্রিউ’ (মুখরা রমনী বশীকরণ) অভিনয় করিয়েছিলেন। শহীদুল্লাহ কায়সারের ‘সংশপ্তক’ও ছিল, কেমন করে সম্ভব হলো? উত্তরে তিনি বললেন, আমরা তো কিছু জানতাম না। তাই আগ্রহ, কৌতুহল ও জানবার চেষ্টা ছিল আন্তরিক তাই হয়ে গেছে।

চ্যানেল আই সেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারকে আন্তরিকতার সঙ্গে ধারণ করার প্রয়াসী হয়েছে। বাংলা, বাঙালিত্ব, রবীন্দ্র-নজরুলের সৃজনী সম্ভার এবং বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথাকে অবিচল নিষ্ঠায় বিশ্বাসে অন্তর্বিবেচনায় প্রচার শীর্ষে রেখে বাংলার লোকজীবন ও লোক সংস্কৃতিকে বাঙালির জাতিসত্তার আত্মা ভেবে চ্যানেল আই তার প্রচারে সদা প্রয়াসী।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ কৃষকের দেশ। বাঙালি জাতিসত্তা গঠন, বাঙালি জাতি নির্মাণ ও জাতীয়তাবাদ তৈরির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে বীরত্ব সংগ্রামে মূল ভূমিকায়ও ছিল বাংলার কৃষক সন্তান। এই কৃষক সমাজ অকুতোভয় সংগ্রামী, লড়াকু যোদ্ধা ও সৃজনে নিপুণ শিল্পশ্রমিক। তাদের নারীরা হাতের ছোঁয়ায় অনুপম নকশিকাঁথা বানায়। তৈরি করে পিঠাপুলির অনিন্দ্য সম্ভার। কৃষকেরা অবসর সময়ে বাংলায় বাঁশের তৈরি ঝাপ ও নানা শৈল্পিক কারকার্য সর্বোপরি ক্ষেতে খামারে উৎপাদন করে ধান, পাট, সর্ষে, কালাই, গমসহ কতনা শস্য, শাক-সবজি। চ্যানেল আই এদের উৎপাদিত শস্য ও তাদের ওপর কতনা অনুষ্ঠান তৈরি করছে।

শাইখ সিরাজের উদ্ভাবনী পরিকল্পনার বৈশিষ্ট্যে আমরা মুগ্ধ হই। কৃষকের ঈদ, দেশে ও বিদেশে ছাদকৃষিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চ্যানেল আই প্রাঙ্গণের মেলা ও উৎসবগুলো প্রবর্তিত। বাঙালি সংস্কৃতির মূলধারার প্রবহমানতার স্মারক।

আরেকটি অনুষ্ঠান অনবদ্য। মুকিত মজুমদার বাবু উপস্থাপিত ও পরিচালিত প্রকৃতি ও জীবন।

মুক্তিযুদ্ধের নানা অনুষ্ঠান, বঙ্গবন্ধু বিষয়ক গ্রন্থ আলোচনা, তৃতীয় মাত্রা, টু দ্য পয়েন্ট, সমকালিন চিন্তা চেতনা ও রাজনৈতিক তর্ক বিতর্ক আকর্ষণীয়। তবে দলীয় নেতা কর্মীদের রোজকার শোনা একঘেয়ে কথাবার্তা বর্জন করে তাতে পড়াশোনার ছাপসমৃদ্ধ নতুনত্ব থাকলে ভালো লাগবে।

চ্যানেল আই আসলে সংস্কৃতি ও বাঙালির যাপিত জীবনে এক নন্দিত আলেখ্যেরই মূর্ত প্রকাশ। বাংলাদেশের অন্য কোনো চ্যানেলে আই সাংস্কৃতিক জীবনধারার ভিত্তিতে টেলিভিশন উপস্থাপনা বিন্যস্ত নয়।

তাই যখন চ্যানেল আইয়ে যাই অনুষ্ঠান করতে, তখন মনে হয় নিজ বাড়িরই এক সংস্কৃতিপাদপীঠে এলাম। ফরিদুর রেজা সাগর, আমীরুল ইসলাম সহ সাগরের রুমে বসে চা কফি খাব, তারপর অনুষ্ঠান করে একটু বক্তৃতা দিয়ে চলে যাব অন্য কোনো কাজে।