চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বাউল শিল্পীর ছদ্মবেশে তিন হত্যার আসামি

ইউটিউবে বাউল শিল্পীর ছদ্মবেশে লুকিয়ে ছিলেন তিন হত্যা মামলার আসামি মো. হেলাল হোসেন ওরফে বাউল সেলিম।

র‍্যাব জানায়, খুনি হেলাল ২০০১ সালের বগুড়ার চাঞ্চল্যকর বিদুৎ হত্যা মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ফেরারি আসামি। এছাড়াও, সে আরও দু’টি হত্যা মামলার আসামি। ১৯৯৭ সালে বগুড়ার বিষ্ণু হত্যা মামলা এবং ২০০৬ সালে রবিউল হত্যা মামলার আসামি।

বুধবার ১২ জানুয়ারি রাতে কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেল স্টেশন থেকে মো. হেলাল হোসেন ওরফে সেলিম ফকির ওরফে বাউল সেলিম ওরফে খুনি হেলালকে (৪৫) গ্রেপ্তার করে র‍্যাব-৩।

বৃহস্পতিবার ১৩ জানুয়ারি দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের র‍্যাব মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

বাউল শিল্পীর আড়ালে খুনি হেলাল
র‍্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার আল মঈন বলেন, আনুমানিক ৬ মাস আগে এক ব্যক্তি ইউটিউবে প্রচারিত একটি গানের বাউল মডেল সম্পর্কে র‍্যাবের কাছে তথ্য দেয় যে, ওই গানের মডেল সম্ভবত বগুড়ার বিদ্যুৎ হত্যা মামলার আসামি। পরে বিষয়টি আমলে নিয়ে র‍্যাব ছায়া তদন্ত শুরু করে। এক পর্যায়ে ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে র‍্যাব নিশ্চিত হয়।

যেসব হত্যা মামলার আসামি খুনি হেলাল
র‍্যাব জানায়, ২০০১ সালের বগুড়ার চাঞ্চল্যকর বিদুৎ হত্যা মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ফেরারি আসামি হেলাল। সে আরও দু’টি হত্যা মামলার আসামি। ১৯৯৭ সালে বগুড়ার বিষ্ণু হত্যা মামলা এবং ২০০৬ সালে রবিউল হত্যা মামলার আসামি।

২১ বছরেই হত্যা মামলার আসামি হয় হেলাল
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের প্রেক্ষিতে র‍্যাবের মুখপাত্র বলেন, ১৯৯৭ সালে বগুড়াতে চাঞ্চল্যকর বিষ্ণু হত্যাকাণ্ড হয়। হেলাল ২১ বছর বয়সে ঐ হত্যা মামলার আসামি। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ডটি হয়। এভাবেই সে বিভিন্ন অপারাধমূলক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হতে শুরু করে এবং এলাকায় দূধর্ষ হেলাল নামে পরিচিতি পায়।

গ্রেপ্তার হেলাল আরও জানায় যে, ২০০০ সালে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এলাকায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে প্রতিপক্ষের ধারালো দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে তার বাম হাতে মারাত্মক জখম হয় এবং বাম হাত পঙ্গু হয়। এই ঘটনার পর হতে সে বিভিন্ন নামে যেমন দূর্ধর্ষ হেলাল, হাত লুলা হেলাল হিসেবে এলাকায় পরিচিতি লাভ করে।

বিজ্ঞাপন

গত ২০০১ সালে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বগুড়ায় মাহমুদুল হাসান বিদ্যুৎকে (২০) পূর্বপরিকল্পিতভাবে দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঐ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিবার বাদী হয়ে বগুড়া সদর থানায় হত্যা মামলা (নং-২) করেন। পরে ঐ মামলায় আদালত তাকে যাবজ্জীবন সাজা প্রদান করেন।

এছাড়াও ২০০৬ সালে বগুড়াতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রবিউল নামের এক ব্যক্তিকে কতিপয় দুর্বৃত্তরা দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। গ্রেপ্তার হেলাল ঐ হত্যাকাণ্ডের একজন চার্জশীটভুক্ত আসামি ।

চুরির মামলার আসামিও ছিলেন হেলাল
কমান্ডার মঈন বলেন, হেলাল ২০১০ সালে বগুড়া সদর থানায় দায়ের করা একটি চুরির মামলায় ২০১৫ সালে গ্রেপ্তার হয়। একই সাথে ২০০১ সালের বিদ্যুৎ হত্যা মামলার বিচারকার্যও চলতে থাকে। ২০১৫ সালেই চুরির মামলায় সে জামিনে মুক্ত হয় এবং একই দিনে বিদ্যুৎ হত্যা মামলায় আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। এছাড়াও, ২০১১ সালে তার বিরুদ্ধে বগুড়া সদর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা রয়েছে।

জামিন পেয়ে ফেরারি জীবন বেছে নেয় খুনি হেলাল
সংবাদ সম্মেলনে কমান্ডার আল মঈন বলেন, গ্রেপ্তার হেলাল অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করে এবং এলাকায় মুদি দোকানদারী শুরু করে। পরে হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রমের সাথে জড়িয়ে পড়লে এলাকায় তার কুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তার বিরুদ্ধে ২০১০ সালে দায়েরকৃত চুরির মামলায় ২০১৫ সালে জামিনের দিনে বিদ্যুৎ হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হলে সে সু-কৌশলে এলাকা ছাড়ে এবং ফেরারি জীবন যাপন শুরু করে। প্রথমে সে বগুড়া থেকে ট্রেনে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে আসে।

পরে কমলাপুর থেকে ট্রেনে সে চট্টগ্রামে চলে যায় এবং সেখানকার আমানত শাহ মাজারে ছদ্মবেশ ধারণ করে বেশ কিছুদিন অবস্থান করে। সেখান থেকে ট্রেন করে সিলেটের শাহজালাল মাজারে চলে যায়। সিলেটে গিয়ে ছদ্মবেশ ধারণ করে আরও কিছুদিন অবস্থান করে।

জানা যায় যে, বিভিন্ন সময়ে সে বাংলাদেশের বিভিন্ন রেলস্টেশন ও মাজারে ছদ্মবেশে অবস্থান করত। সে কিশোরগঞ্জ ভৈরব রেলস্টেশনে নাম-ঠিকানা ও পরিচয় গোপন রেখে সেলিম ফকির নাম ধারণ করে।

যেভাবে হলেন বাউল গানের মডেল
কমান্ডার আল মঈন বলেন, আনুমানিক ৫ বছর আগে হেলাল নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশনে একটি গানের শুটিং চলাকালে রেললাইনের পাশে বাউল গান গাচ্ছিল। তখন শুটিং এর একজন ব্যক্তি তাকে গানের মিউজিক ভিডিওতে অভিনয়ের প্রস্তাব দিলে বহুল জনপ্রিয় ‘ভাঙ্গা তরী ছেড়া পাল’ শিরোনামের গানের বাউল মডেল হিসেবে তাকে দেখা যায়।

সাত বছর ধরে হেলালের ফেরারি জীবন
র‍্যাব মুখপাত্র বলেন, হেলাল প্রায় সাত বছর ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ফেরারি জীবন যাপন করছেন এবং গত প্রায় চার বছর ধরে কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলস্টেশনের পাশে একজন মহিলার সাথে সংসার করে আসছে। বিভিন্ন রেলস্টেশনে সে বাউল গান গেয়ে মানুষের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

আসামি হেলালের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন বলেও জানান র‍্যাবের এই মুখপাত্র।

বিজ্ঞাপন