চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বাইরে করোনাভাইরাস ভেতরে অভাব, বাঁচার উপায় কী?

জানুয়ারিতেও সারাবিশ্ব ছিলো একেবারেই স্বাভাবিক। মানুষ যে যার মতো ঘুরেছে, খেয়েছে-ধেয়েছে। কিন্তু মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানেই দুনিয়ার মানচিত্র পাল্টে গেলো। শুরু হলো ঘোর অন্ধকার-তিমির এক রাত্রির, শুরু হলো অনিশ্চিত ও আতঙ্কিত ভবিষ্যতের দিন। সারাবিশ্বে কোভিড-১৯ রোগ বা করোনাভাইরাস নামের এক মহামারীর আঘাত এসে পড়লো, যা পুরো বিশ্বকে লকডাউনে বন্দি করলো, মানুষকে পাঠালো কোয়ারেন্টিনে-আইসোলেশনে। কিন্তু আজকের দিনে এসে বিশ্ববাসী এমন এক সংকটে পতিত হলো যে, বাড়ির বাইরে গেলে ধরছে করোনা, আর ভেতরে থাকলে পড়তে হচ্ছে দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি!

যদিও শুরুতে বাঁচার চেষ্টা হলো করোনাভাইরাস থেকে। তাই সারাবিশ্ব চলে গেলো লকডাউনে। লকডাউনের মধ্যেও এরই মধ্যে বিশ্বব্যাপী করোনায় আক্রান্ত হয়েছে ২৮ লাখ মানুষ। মারা গেছে ২ লক্ষাধিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্পষ্ট নির্দেশনা,করোনা মানে লকডাউন, টেস্ট, রোগী শনাক্তকরণ, বিচ্ছিন্নকরণ-এটাই চিকিৎসা। ভ্যাকসিন তৈরি না হওয়া অবধি করোনা থেকে মুক্ত থাকার উপায় এটাই। ওদিকে গবেষক ও বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভ্যাকসিন বাজারে আসতে অন্তত ১ বছর থেকে ১৮ মাস সময় লেগে যাবে! কথা হলো এতোটা মাস লকডাউন কীভাবে সম্ভব? যেখানে মানুষের সকল জীবনযাত্রা থেমে গেছে। বন্ধ নৌ-রেল, সড়ক, বিমানপথ। বন্ধ সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সামাজিক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এতে হুমকি এসে পড়লো আরেক দিক থেকে। বলা হলো, এভাবে টানা লকডাউনে পড়ে থাকলে মানুষ মখোমুখি হবে মহা দুর্ভিক্ষের, যা ১৯৩০ দশকের মহামন্দার চেয়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ।  এতে ১৩৫ থেকে ২৫০ বিলিয়ন মানুষ ভুগতে পারে। ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগাম, জাতিসংঘ, আইএমএফ প্রভৃতি সংস্থা এমনই সংকেত দিলো! তারা বললো, লকডাউনের ফলে মানুষ যতোটা না করোনায় মারা যাবে তার চেয়ে বেশি মারা যাবে খেতে না পেয়ে! কী ভয়াবহ পরিস্থিতি ভাবতেই গা শিউরে উঠছে! কোনটির বিরুদ্ধে লড়াই করবে মানুষ?

বিজ্ঞাপন

করোনাভাইরাস এমন এক অদৃশ্য শত্রু, যাকে দমানোর জন্য মধ্যস্থতাকারী নেই। ১ম ও ২য় মহাযুদ্ধ থামানোর জন্য অন্তত দৃশ্যমান পক্ষ ছিলো। জার্মানি কিংবা হিটলার ছিলো। সুযোগ ছিলো পরাজিত করার কিংবা মধ্যস্থতা করার। কিন্তু এখন? এখানে কার সঙ্গে মধ্যস্থতা করা হবে? এই শত্রুকে তো দেখা যায় না। এই যে অদৃশ্য থেকে হামলা করছে, এটাই হলো মানুষের বড় চ্যালেঞ্জ। একে দমানোর জন্য প্রয়োজন ভ্যাকসিন-ড্রাগ। কিন্তু ভ্যাকসিন বা ড্রাগ তো বহুদূরের ব্যাপার। তাহলে উপায়?

উপায় হিসেবে মানুষ নানা পদ্ধতি বের করার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, করোনাভাইরাস থেকে সেরে ওঠা লোকজনের কাজে ফেরা কিংবা ভ্রমণের জন্য বিভিন্ন দেশ ‘ইমিউনিটি পাসপোর্ট‘ তথা ঝুঁকিমুক্ত পাসপোর্ট‘ দিয়ে বিশেষ অনুমতি দেওয়ার চেষ্টা করছে। বিশ্ব অর্থনীতির অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে মরিয়া বিভিন্ন দেশের সরকার বিশেষ এই ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করেছে। কিন্তু বিশেষ এই ব্যবস্থাও ঝুঁকিমুক্ত নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এই ভাইরাস প্রতিরোধে একজন মানুষের দেহে অ্যান্টিবডি থাকলেই যে সে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হবে না এখনও পর্যন্ত তার কোনো প্রমাণ নেই। সুস্থ হয়ে ওঠা কোভিড-নাইনটিন রোগীরা এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটাতে পারে এবং তাদের কাজে ফেরার অনুমতি দেওয়া হলে এতে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যাবে। অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার কারণে প্রতিরোধ ক্ষমতা আসলেই কারো হয়েছে কি না তার স্বপক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ এখনও বিজ্ঞানীদের হাতে নেই। তাই “ইমিউনিটি পাসপোর্ট” বা “ঝুঁকিমুক্ত সার্টিফিকেট” কাউকে দেওয়া নতুন করে ঝুঁকি তৈরির সামিল হবে।

তারপরও অনেক দেশ অর্থনৈতিক অচলায়তনে থাকতে নারাজ। করোনার চেয়ে তারা দুর্ভিক্ষের ভয়ে ভীত। যার ফলে ধীরে ধীরে লকডাউন উঠিয়ে দেয়ার কথাই ভাবছে। শুরুতে লকডাউন শিথিল করছে। এক্ষেত্রে চীনের ব্যাপার ভিন্ন। উহানে লকডাউন উঠিয়ে দেওয়ায় জীবনযাত্রা সবকিছু এখন স্বাভাবিক। সেখানে মানুষ আর আক্রান্ত হচ্ছে না। সাউথ কোরিয়াও লকডাউন শিথিল করেছে। জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হচ্ছে। তারা স্বাস্থ্যবিধির সব নিয়ম মেনেই তা করেছে। ইউরোপের সুইডেনের কথাও এক্ষেত্রে ভিন্ন। দেশটি শুরু থেকেই একেবারে উল্টোপথে ছিলো। করোনার কারণে লকডাউনেই যায়নি সুইডেন। বরং লোকজনকে উন্মুক্ত চলাচল করতে দিয়েছে। তাদের পলিসি ছিলো, ‘লোকজন আক্রান্ত হোক, আর প্রতিরোধ ক্ষমতা দিয়ে চালিয়ে যাক। কপালে যা থাকে হবে‘। তার মানে করোনাকে পাত্তাই দেয়নি সুইডেন। এই পলিসিতে অবশ্য দেশটাকে ব্যর্থ বলা যাচ্ছে না। কিন্তু শুরুতে এমন পলিসি নিয়ে যুক্তরাজ্য এখনো ভুগছে। দেশটিতে প্রতিদিনই হাজারে হাজারে মানুষ মারা যাচ্ছে। যুক্তরাজ্য তাই লকডাউন থেকে বেরিয়ে আসার কথা কল্পনাই করতে পারছে না। ব্রিটিশরা তা না পারলেও ইউরোপের বহু দেশ ইতোমধ্যে লকডাউন শিথিল করেছে-যেমন- ইতালি, স্পেন, ডেনমার্ক, পোল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, চেক রিপাবলিক । জার্মানিও লকডাউন শিথিল করেছে। এছাড়া গ্রিসও সে পথে হেঁটেছে।

করোনাভাইরাসের প্রকোপে মৃত্যুহারের শীর্ষস্থানে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে দুই থেকে তিন হাজারের ওপরে ওপরে। আক্রান্ত হচ্ছে ৩০ হাজরের ওপরে প্রতিদিন। গোটা দেশ লকডাউনে আছে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন অনেক মার্কিন নাগরিক। তারা লকডাউন মানতে নারাজ। লকডাউনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করেছে। আর বিক্ষোভের মুখে জর্জিয়া ও ওকলাহামাতে সেলুন ও স্পা খুলে দেওয়া হয়েছে আর আলাস্কাতে রেস্টুরেন্টগুলোর উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা ‍তুলে নেওয়া হয়েছে। স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্টও লকডাউনের পক্ষে থাকতে পারছেন না। যদিও দেশটিতে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা জীবন্ত এখনো। কিন্তু বাড়ছে বেকারত্ব, বাড়ছে অর্থনৈতিক সংকট, তেলের মূল্য শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। এই অবস্থায় তাই করোনার চেয়ে আর্থিক সংকটের ভয়েই বেশি ভীত ডোনাল্ড ট্রাম্প।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও লকডাউন চলছে দীর্ঘদিন ধরে। তবে সেই একই কথা। মানুষের আর্থিক জীবনযাত্রার দিকে দেখে সম্প্রতি দুই দফায় লকডাউন শিথিল করেছে দেশটি। বিশেষ করে যেসব রাজ্যে করোনা আক্রান্ত কম ও হ্রাস পাচ্ছে সেখানে লকডাউন শিথিল করছে।

বিজ্ঞাপন

এরই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সম্প্রতি বলেছেন, ‘রোজায় আমরা সবকিছু একেবারে বন্ধ করে রাখতে পারবো না। আমাদের কিছু কিছু জায়গা আস্তে আস্তে উন্মুক্ত করতেই হবে‘।

যদিও বাংলাদেশে দিন দিন বাড়ছে করোনাভাইরাস। মৃত্যুর হারও কমছে না। দেশের প্রায় প্রত্যেকটি জেলায় করোনা শনাক্ত হচ্ছে। করোনার হুমকি কম নেই। কিন্তু তার চেয়ে বড় হুমকি হয়ে যে আসছে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা! তাই বাধ্য হয়েই লকডাউন শিথিলের পথে হাঁটতে হচ্ছে বাংলাদেশকেও।

কথা হলো, বাংলাদেশ কি পারবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৬টি নির্দেশনা ফলো করতে? সংস্থাটি লকডাউন প্রত্যাহার বা শিথিল করার আগে ছয়টি শর্ত পূরণের তাগিদ দিয়েছে। যেমন-

-রোগ সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা,

-দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ প্রতিটা রোগীকে শনাক্ত, পরীক্ষা, আইসোলেশন আর চিকিৎসায় এবং সংস্পর্শে আসা প্রত্যেককে শনাক্ত করতে সক্ষম

-নার্সিংহোমের মতো সেবা কেন্দ্রগুলোর মতো নাজুক স্থানগুলোয় ঝুঁকি নূন্যতম পর্যায়ে নামিয়ে আনা।

– স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত ও অন্যান্য দরকারি স্থানে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।

– বাইরে থেকে আসা নতুন রোগীদের সামলানো।

-সমাজের বাসিন্দারা পুরোপুরি সচেতন, সতর্ক ও নতুন জীবনযাপনের ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ।

বিশেষজ্ঞ মতামত এবং বিভিন্ন গণমাধ্যম রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ওপরের ৬টি শর্তের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোনোটাই পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি বা পারছে না। দেশে প্রতিদিনই আক্রান্ত হচ্ছে ও মারা যাচ্ছে। পরীক্ষা, শনাক্তকরণ, আইসোলেন কোনোটারই ব্যবস্থাপনা সেভাবে নেই। হাসপাতালের যাচ্ছেতাই অবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুরক্ষা নিশ্চিত করার মতো পরিবেশই নেই। আর বাইরে থেকে আসা নতুন রোগীদের সামলানোর কোনো নিয়ম আছে তা জোর গলায় বলতে পারবে না কর্তৃপক্ষ। সবদিকে অব্যবস্থাপনা চরমে। জনগণের কথা তো বলারই দরকার নেই। মানুষ এই বিষয়ে একেবারেই অসচেতন। নতুন জীবনযাপন দূরে থাক, সুযোগ পেলে জনসাধারণ আগের চেয়ে বেপরোয়া হয়ে বের হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশেষজ্ঞরা এক্ষেত্রে একমত, করোনাভাইরাসের সতর্কতার ব্যাপারে বাংলাদেশের মানুষের সচেতনতার অভাব রয়েছে। এমন কঠিন পরিস্থিতিতেই বিভিন্ন গার্মেন্টস শিল্পকারখানা আংশিক চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিথিল হবে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নিয়মও। কঠিন এই পরিস্থিতি মোকাবিলা কীভাবে করবে বাংলাদেশ? তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, বিশ্ববাসী কি পারবে দুই বিগ পাওয়ার- করোনাভাইরাস এবং দুর্ভিক্ষ- এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জিততে?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)