চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বাংলার মাটিতে জঙ্গিদের কোনো স্থান নেই, থাকতে পারে না

গত পহেলা জুলাই গুলশানে হলে আর্টিজানে যে ন্যাক্কারজনক ও বর্বরোচিত ঘটনা ঘটেছে, একজন বাঙ্গালি হিসেবে আমি মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ। আমার মত নিরানব্বই দশমিক নিরানব্বই ভাগ বাঙালি এ ধরনের অনভিপ্রেত সন্ত্রাসী হামলায় হতবিহ্বল। আমি মনে করি, আমাদের দেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এই ঘটনার পর আমি সিএনএনে যে ধরনের বক্তব্য ও বিশ্লেষণ দিতে দেখেছি তাতে বেদনার্ত বাংলাদেশকে হেয় করার প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়েছে।

অথচ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে অন্যদেশে প্রতি মুহূর্তে কত সংখ্যক মানুষই না সন্ত্রাসের শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন- সেটি নিয়ে আমি কথা বলতে চাচ্ছি না। বরং আমাদের দেশে এই উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থানের পেছনে আন্তর্জাতিক চক্রের হাত রয়েছে। শুধুমাত্র ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত নয় বরং উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং অ্যাডভেঞ্চারের মতো তথাকথিত ধর্মের নাম দিয়ে দেশকে আজ একটি বৈরি পরিবেশের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।

আমি অত্যান্ত দুঃখের সঙ্গে বলছি, পত্রিকায় যে সমস্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায়, বাংলাদেশের অনেক ভালো ভালো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা উচ্চ শিক্ষিত হয়ে বিপথ যাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত বেশ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলশানের মত এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য করে চলছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঈদের পর অন্যত্র স্থানান্তরিত হয় সে জন্য সরকারের কাছে জরুরি আবেদন করছি। কেননা দেশের স্বার্থ আগে বিবেচ্য।

যারা আজ জঙ্গি তৈরি করছেন, যেসব তরুণকে বিপথগামী করছেন, সন্ত্রাসী তৈরি করছেন আমি বিশ্বাস করি জননেত্রী শেখ হাসিনার বিজ্ঞোচিত নেতৃত্বগুণে এই সমস্যার সমাধান অবিলম্বে সম্ভাব হবে। আমার বিশ্বাস এই জন্য দেশের অভ্যন্তরে বিদেশী শক্তির প্রয়োজন নেই।

তবে যেহেতু সন্ত্রাস বিষয়টি বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে প্যারিস, বেলজিয়াম, মধ্যপ্রাচ্য, পাকিস্তান, ভারতসহ সর্বত্র দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ছে। এই জন্য আন্তর্জাতিক সংবাদ আদান-প্রদান ও সন্ত্রাসীদের বিষয়ে খবর নেয়ার বিষয়টি বর্তমানে যে অবস্থায় রয়েছে তা আরো জোরদার করা যেতে পারে। আমি অনুরোধ করবো, এদেশের নিন্মবিত্ত থেকে উচ্চ বিত্তের প্রত্যেক পিতা-মাতা উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েদের প্রতি বিশেষ নজর দিবেন।

তাঁরা কাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করছেন, মোবাইলে কার সঙ্গে আলাপ করছেন, ইন্টারনেটে কিভাবে আলোচনা করছেন, ফেসবুকে কি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, পিতা-মাতার দায়িত্ব সে বিষয়গুলোকে তদারকির আওতায় নিয়ে আসা। কেননা কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে সব কিছু ছেড়ে দিয়ে পিতা-মাতার হাল ছেড়ে দেয়া উচিৎ নয়।

কয়েকদিন আগে বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ জাতীয় সংসদে যথার্থই বলেছেন, যে আমাদের দেশে রাজনৈতিক সমস্যা নেই বরং আছে সামাজিক সমস্যা। এই সামাজিক সমস্যা দূর করা না গেলে আমাদের দেশে পঞ্চম স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে থাকে তারা তাদের বিদেশী বেনিয়া গোষ্ঠীর সহযোগিতায় অবৈধ কর্মকা- পরিচালনা করতেই থাকবে। ধর্ম হোক, সাধারণ শিক্ষা হোক, কিংবা কারিগরি শিক্ষা হোক সব কিছুর উর্দ্ধে উঠে মানুষকে কতল করার জিঘাংসায় লিপ্ত হবে।

পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে আমাদের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে যে, শুধু এদেশে নয় বাইরে থেকে পড়ে আসে তারাও এধরনের অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। বেশ কয়েক বছর আগে নাফিসের ঘটনাটি বের হবার পর বাংলাদেশে যে পত্রিকাটি সবচেয়ে বেশি চালু বলে দাবিদার তাদের কাছে একটি লেখা দিয়েছিলাম, তারা ঐ লেখা প্রকাশ করেনি।

কিন্তু জনকণ্ঠে যখন আমার লেখাটি প্রকাশিত হলো অনেকেই সাধুবাদ জানিয়েছিল। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আমি আরো দুইটি লেখা লেখেছি। এখানে আমি বিষয়টি স্পষ্ট করে বলতে চাই, সেটি হচ্ছে জঙ্গিবাদ তাড়াতে হলে অবশ্যই সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এই সামাজিক আন্দোলনটি হবে তৃর্ণমূল থেকে উচ্চ মহল পর্যন্ত।

আমাদের দেশে ঈদুল ফেতর পালিত হতে যাচ্ছে। আমি প্রস্তাব করছি, প্রতিটি ঈদের জামায়াতে দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ দেশি-বিদেশী যারা মারা গেছেন তাদের জন্য আল্লাহর দরবারে বিশেষ মোনাজাতের ব্যবস্থা করা। একই সঙ্গে ঈমাম সাহেবরা যাতে খুতবায় বা আলোচনায় জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন এবং সম্প্রতি এক লাখ আলেম যে বিবৃতি দিয়েছেন সেটিও যেন  পড়ে শুনানো হয়।

আজকেও একটি পত্রিকায় দেখলাম যে, রয়টার্সের বরাদ দিয়ে তারা শিরোনাম করেছে বাংলাদেশে আরো ভয়ংকর জঙ্গির মুখোমুখি হতে পারে। পৃষ্ঠা-৭, প্রথম আলো। আমার বিশ্বাস আমাদের দেশে যে চৌকস গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা রয়েছেন তাদের সম্মিলিত প্রতিরোধ এবং দৃঢ়তায় জঙ্গিদের সব পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। আমি মনে করি জঙ্গিবাাদ ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পরিকল্পনা করে আগাতে হবে।

বিজ্ঞাপন

প্রতিদিনের জন্য পরিকল্পনা করা ছাড়াও, স্বল্প, মধ্যম এবং দীর্ঘমেয়াদের জন্য পরিকল্পনা করতে হবে। পরিকল্পনা প্রনয়ণকালীন সময়ে যে নিয়ম শিক্ষা দেয় যেমন-পি ফর প্লান, ডি ফর ডু, সি ফর চেক, এ ফর অ্যাক্ট করে দেখতে হবে পরিকল্পনায় কোনো ফাঁকফোকর আছে কিনা।

আমরা বিশ্বাস করি প্রতিটি মানুষের জীবন অমূল্য- দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তারাই হোক, দেশি-বিদেশি যারাই হোক। জাপান থেকে যারা মেট্রোরেলের মত মহতি কাজে যোগ দিয়েছিলেন কিংবা ইতালি থেকে যারা এ দেশে এসেছিলেন বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে আরো সমৃদ্ধ করার জন্য, এদেশের ছেলে মেয়ে বা ভারতীয় যুবতী হোক প্রতিটি প্রাণই অমূল্য।

আজ বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদের যে উথান ঘটেছে। তার দায় অবশ্যই বিশ্ব নেতারা অবহেলা করতে পারেন না। বিশ্ব নেতাদের মধ্যে যারা বড়বড় কথা  বলেন তাদের উচিৎ কোন দেশ কোথায় জঙ্গিবাদকে ছড়িয়ে দিচ্ছে, সম্প্রসারিত করছে সেই ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা রাখা।

পরোক্ষভাবে যুক্তরাজ্য যেভাবে বিভিন্ন দেশে জঙ্গিবাদকে রপ্তানি করে থাকে বলে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় রিপোর্টে দেখা যায় সেটি বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে আবেদন সেটি খতিয়ে দেখতে হবে। আবার সৌদি আরব থেকে বিভিন্ন দেশে গিয়ে যেভাবে জিহাদি নেশায় মত্ত হয় বলে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বেরিয়েছে সেই বিষয়ে আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দ নিশ্চুপ হয়ে আছে। এটি একটি বড় প্রশ্ন। আবার পাকিস্তানে কারা তালেবান সৃষ্টি করেছিল সেটিও এখন খুঁজে বের করতে হবে। আইএসের সঙ্গে মোসাদের কী সম্পর্ক সেটিও বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে খুঁজে বের করতে হবে।

জঙ্গিদের মুখপত্র হিসাবে কাজ করে সাইট ইন্টেলিজেন্ট এবং এটি বন্ধ করার বিষয়ে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে ঐক্যমতে পৌঁছতে হবে। বৈশ্বিক এই সমস্যাটি এখন বাংলাদেশে সমস্যা সৃষ্টি করছে এবং বাংলাদেশের উন্নয়নকে খতিগ্রস্ত করছে।

যারা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত শিক্ষক হোক, চিকিৎসক হোক, আমলা হোক, রাজনীতিবিদ হোক, ব্যাংকার হোক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য হোক যদি এদেশে কেউ জঙ্গিবাদের সাথে জড়িত থাকে তাহলে অবশ্যই প্রমাণ সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আমাদের দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করলে তুরস্ক ও পাকিস্তানের ন্যায় যারা বিরুদ্ধাচরণ করে তারাও কিন্তু জঙ্গি হামলার স্বীকার হয়েছে। তার মানে এটি প্রামাণ করে যে তুরস্ক ফ্র্যাংকেনস্টাইনের শিকার হয়েছে। বিশ্বকে একটি সুন্দর জঙ্গিমুক্ত রাষ্ট্র দেয়ার দায়িত্ব বিশ্ব নেতৃবৃন্দের। কিন্তু কোনো কোনো দেশ এ ধরনের দায়িত্ব নেয়ার বদলে তারা অস্ত্র বিক্রি ও ঘাঁটি করাসহ বিভিন্ন ধরনের নেশায় মত্ত। এরা অনেকটা সাপ হয়ে দংশন করে ওঝা হয়ে ঝাড়ে। এদেরকে আসলে বিশ্ব আদালতে হাজির করা দরকার।এরা মানবতার শত্রু অথচ তারা মানবাধিকারেরও কথা বলে।

আমরা বিশ্বাস করি বর্তমান বাংলাদেশ সরকার সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে বিশ্বাসী। তাই কোনো ধরনের কালিমা, অন্ধকার কিংবা বিভ্রান্তকারীদের অথবা ঘাপটি মেরে বসে থাকা বর্ণচোরাদের হাত থেকে দেশ ও জাতিকে সম্মুখপানে এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে। একই সাথে আমি আশা করবো, সমাজ বিজ্ঞানিরা উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়ে যুবক-যুবতীদের একটি সঠিক পথ নির্দেশনা দিবেন। যাতে তারা বিভ্রান্ত না হন।

গুলশানে কোনো ধরনের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা থাকতে পারে না। থাকলে অনতি বিলম্বে দীর্ঘ মেয়াদী ছুটি দিয়ে অনত্র স্থানান্তর করতে হবে। কূটনৈতিক পাড়ায় কোনো স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থাকা যাবে না।

আমরা মনে করি, আমাদেরকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। ধর্মীয় ব্যবসায়ী, নারী নির্যাতনকারী, নারী ও শিশু পাচারকারী মাদক চোরাচালান এবং ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করে- কালো অর্থনীতির সাথে জড়িয়ে আছে জঙ্গি সন্ত্রাস ও অস্ত্রব্যবসায়ী। এদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সামাজিক প্রতিরোধ জোরদার কারতে হবে। রাজধানী কিংবা শহরের মধ্যে আন্দোলনটি সীমাবদ্ধ না রেখে গ্রাম, ইউনিয়ন, থানা, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে।

বাংলার মাটিতে জঙ্গিদের কোনো স্থান নেই, থাকতে পারে না। মানুষ নয়, যারা নরপিচাস তাদের মধ্যে পাশবিকতা উন্মেষ ঘটেছে তা সমূলে উৎপাটন করাই হচ্ছে একমাত্র আগামী দীনের প্রত্যাশা। আশা করি জননেত্রী শেখ হাসিনা তার বিজ্ঞোচিত নেতৃত্বগুণে এ সমস্যার সমাধান করবেন। একটি ধর্ম নিরপেক্ষ মুক্তিযুদ্ধ চেতনায় সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হয়ে উঠুক বিশ্ব দরবারে শান্তি-শৃঙ্খলার রোল মডেল। আমরা শুনতে চাই না, পাশ্চাত্যের তোষণকারী কোনো চাটুকারের কাছ থেকে কোনো উপদেশ। এদেশটি আমাদের সবার গর্বের। আমাদের মাথা ভবিষতে যেন আর না হেট না হয় এ ধরনের কোনো ঘটনায়। আমাদের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রের কিংবা এদেশের নাগরিকদের হত্যালিলার  নৃশংস ও বর্বরোচিত মাধ্যমে। রাষ্ট্রটি সবার জন্য সুখকর হোক, বাস যোগ্য হোক এবং মানব প্রত্যয়ে উজ্জ্বল হোক।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন