চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বাংলাদেশ কখনও জঙ্গিবাদকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বাংলাদেশ কখনও জঙ্গিবাদকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় না উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, আমরা কখনও বলি না যে জঙ্গিবাদকে মূলোৎপাটন করেছি। জঙ্গিবাদকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি।

মন্ত্রী বলেন, আমি অনেক দেশেই গিয়েছি। অনেকে প্রশ্ন করে যে, তোমরা কীভাবে জঙ্গিবাদকে মোকাবিলা করছ? বলেছি, বাংলাদেশের জনগণ কখনও জঙ্গিবাদকে সমর্থন করে না বলেই আমরা জঙ্গিবাদকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার র‍্যাব সদর দপ্তরের শহীদ লেফটেন্যান্ট কর্নেল আজাদ মেমোরিয়াল হলে জঙ্গি আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান ‘নব দিগন্তের পথে’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ফুল দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন ৯ জন জঙ্গি সদস্য। তারা এ সময় সন্ত্রাসের জীবন পরিত্যাগ করে সমাজের মূলধারায় ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

নয় জঙ্গির মধ্যে ছয়জন জেএমবি এবং তিনজন আনসার আল ইসলামের সদস্য।এদের মধ্যে চিকিৎসক দম্পতি ও আইটি বিশেষজ্ঞও রয়েছেন।

এরা হলেন, সিলেটের শাওন মুনতাহা ইবনে শওকত (৩৪), ডা. নুসরাত আলী জুহি (২৯), কুমিল্লার আবিদা জান্নাত আসমা ওরফে তারাদ ওরফে রামিসা (১৮), আবদুর রহমান সোহেল (২৮), চাঁদপুরের মোহাম্মদ হোসেন ওরফে হাসান গাজী (২৩), মো. সাইফুল্লাহ (৩৭), ঝিনাইদহের মো. সাইফুল ইসলাম (৩১), চুয়াডাঙ্গার মো. আবদুল্লাহ আল মামুন (২৬) ও মো. সাইদুর রহমান (২২)।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দীন, পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, একের পর এক যখন জঙ্গিরা উত্থাপন ঘটাচ্ছিল তখন আমরা সবাই চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। তখন প্রধানমন্ত্রী দলমত, ধর্ম নির্বিশেষে সবাইকে ডাক দিয়েছিলেন ঘুরে দাঁড়াতে। সবাই সোচ্চার হয়েছে, মানববন্ধন হয়েছে, সমাবেশ হয়েছে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে। স্কুলের ছাত্রটিও বলেছিল জঙ্গিবাদকে সমর্থন করি না।

মন্ত্রী বলেন, সেই থেকে জনগণ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ফরিদ উদ্দিন মাসুদ জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ফতোয়া দিয়েছিলেন, যা দেশে-বিদেশে সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। সব ধর্মের গুরুদের নিয়ে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলেছি।

মন্ত্রী আরও বলেন, পঞ্চগড়ে হিন্দু ইস্কন মন্দিরে পুরোহিতকে হত্যা, বৌদ্ধ পুরোহিতকে হত্যা, শিয়া মসজিদে নামাজরত অবস্থায় ইমামকে গুলির দৃশ্য দেখেছিলাম। এখন সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। বিশেষ করে র‍্যাব এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। আজ তারই প্রতিফলন এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান।

মন্ত্রী বলেন, যারা বিভ্রান্ত হয়েছিল, পথ হারিয়েছিল, যারা ভুল পথে ভুল আদর্শ বুকে নিয়েছিল, তারা আজ বাবা-মার কাছে ফিরেছেন, বাবা-মার মুখে হাসি ফুটিয়েছেন, যা অনেক দিন পর দেখছি। ক্যামেরাবন্দী এ দৃশ্য দেখবে দেশের মানুষ। এজন্য র‍্যাবকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি, এ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

র‍্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরোয়ার বলেন, ‘আমরা যাদের সন্ত্রাসী বলি, সবাই সন্ত্রাসী নয়। কারো মনে সামান্য সহানুভূতি থাকে। এক পর্যায়ে সাপোর্টার হয়ে যায়। এরপর অ্যাকটিভিস্ট হয়, সে তখনও সন্ত্রাসী বা জঙ্গি হয়ে যায় না। এরপরের ধাপে এক্সট্রিমিস্ট হয়। এই পর্যায়ে সে অন্য কারো মতাদর্শকে মানতে চায় না। এক্সট্রিমিস্ট হওয়ার পর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। তখন সবাইকে শত্রু মনে করতে থাকে।’

‘তার ভ্রান্ত ধারণাকে অবহেলা করা যাবে না। কারণ এটা সে বিশ্বাস করে। তার ধারণায় আঘাত করতে হবে। যেটা শুধুমাত্র বন্দুক দিয়ে সম্ভব নয়। দরকার হয় ডি-রেডিকালাইজেশন। এক্সট্রিমিস্ট থেকে টেররিস্ট হয় একজন ব্যক্তি। তখন কোনো একটি নাশকতামূলক কাজের জন্য রওনা দেয়’।

ডি-রেডিকালাইজেশনের কয়েকটি ধাপ উল্লেখ করে কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরোয়ার বলেন, ‘প্রথমে এই রেডিকালাইজড হওয়া ব্যক্তিদের স্বাচ্ছন্দ্য নষ্ট করতে হবে। তাদের সক্ষমতা নষ্ট করতে হবে। তার গ্রুপের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে অর্থাৎ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে তাকে ধরে আনতে হবে।তাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাকে বিচারের মুখোমুখি না ডি-রেডিকালাইজেশনে সম্পৃক্ত করতে হবে, তা নিয়ে রিস্ক ম্যানেজমেন্ট করতে হবে। সে অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যারা ডি-রেডিকালাইজেশনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে তাদের মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক সাপোর্ট দিতে হবে।’

র‍্যাব মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে জঙ্গি আত্মসমর্পণের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আলোচনা করেন র‍্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরোয়ার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রফেসার ও সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের পরিচালক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ, এফবিসিসিআইয়ের শেখ ফজলে রহিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের প্রধান খন্দকার ফারজানা রহমান, ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও সাংবাদিক আবুল খায়ের।

বিজ্ঞাপন