চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের নাজুকতা

আগেও জানা ছিল, কিন্তু এতো সুতীক্ষ্মভাবে সঙ্কটটি হয়তো দৃশ্যমান ছিল না। কিন্তু করোনা সে সঙ্কটটিকে অত্যন্ত নগ্নভাবে আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছে। সঙ্কটটি হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের ভঙ্গুরতা ও আমাদের স্বাস্থ্যসেবার নাজুকতা। এ ভঙ্গুরতা ও নাজুকতার তিনটে মাত্রিকতা খুব সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান – আর্থিক ভঙ্গুরতা, কাঠামোগত নাজুকতা ও মানসিক সঙ্কট। এ সব সঙ্কট, ভঙ্গুরতা নাজুকতার যার কিছু কিছু উপাদান আগে থেকেই ছিল, কিন্তু কিছু কিছু নতুনভাবে তৈরী হয়েছে।

আর্থিক ভঙ্গুরতার কথা দিয়েই শুরু করা যাক। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় হচ্ছে জাতীয় আয়ের ০.৯ শতাংশ এবং মোট বাজেটের ৫ শতাংশ। উন্নত বিশ্বের কথা বাদই দিলাম, যদি কাছাকাছি ভিয়েতনামের সঙ্গে তুলনা করি, তা’হলে সে দেশে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ হচ্ছে জাতীয় আয়ের প্রায় ৮ শতাংশ এবং জাতীয় বাজেটের ১৭ শতাংশ। বলার প্রয়োজন হয় না, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের অপ্রতুলতা এ খাতকে একটি ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে, যেখানে স্বাস্থ্যখাতে প্রথাগত প্রয়োজনই মেটানো যায় না, একটি মহামারী সঙ্কট মোকাবেলা তো দূরের কথা।

বিজ্ঞাপন

শুনতে পাই, ২০৩২ নাগাদ আমাদের স্বাস্থ্যখাত বরাদ্দ বাজেটের ১৫ শতাংশ হবে। ২০৩২ তো বহুদূর। করোনা আমাদের সতর্ক করেছে, সময় আমাদের পক্ষে নয়। ২০২০ সালের আসন্ন বাজেট স্বাস্থ্যখাতের এ অপ্রতুলতা মেটানোর একটি তাৎক্ষণিক সুযোগ। মধ্যমেয়াদে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও এটা সুনিশ্চিত করা যায়। বিশেষ বিশেষ মর্যাদা প্রকল্প, অনুৎপাদনমূলক খাতের ব্যয় হ্রাস, ব্যয় দক্ষতা বৃদ্ধি ও দূর্নীতি হ্রাস করার মাধ্যমে বাড়তি অর্থায়ন সম্ভব।

স্বাস্থ্যখাতের দ্বিতীয় নাজুকতা হচ্ছে এ খাতের কাঠামোগত ভঙ্গুরতা। মনে রাখা দরকার, বাড়তি অর্থ বরাদ্দ স্বাস্থ্যখাতের সঙ্কট মেটানোর জন্যে প্রয়োজনীয় শর্ত, কিন্তু পর্যাপ্ত শর্ত নয়। এ সঙ্কট মেটানোর জন্যে এ খাতের কাঠামোগত নাজুকতার সমাধানও প্রয়োজন। এ নাজুকতার নানান মাত্রিকতা আছে।

এক, বাংলাদেশে ত্রিধারা স্বাস্থ্যসেবা বিদ্যমান – সরকারী, বেসরকারী ও বিদেশে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ। সেবার এই অসমতা বিত্ত ও ক্ষমতা-বান্ধব একটি ব্যবস্থার সৃষ্টি করেছে। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যে সরকারী ব্যবস্হায় যাচ্ছেন, তার সার্বিক ভেঙ্গে পড়ার অবস্হার কথা সর্বজনবিদিত।

দুই, বেসরকারী খাত মানেই উন্নত চিকিৎসা, ত নয়, এর মানে উচ্চতর মুনাফা। বাংলাদেশে সর্বত্র ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠাগুলোর কথা সর্বজনবিদিত।

তিন, বেসরকারী খাতের বর্ধিষ্ণু অবস্হার কারনে সরকারী স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো দিনের পর দিন উপেক্ষিত হয়েছে। সরকারী চিকিৎসকেরা বিরাট সময় কাটাচ্ছেন বেসরকারী হাসপাতালগুলোতে, নতুন চিকিৎসকেরা গ্রামের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যেতে চান না। বিষযগুলো জটিল নি:সন্দেহে, কিন্তু এর সমাধান প্রয়োজন।

চার, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সুন্দর সুন্দর ভৌতিক অবকাঠামোর যত বিস্তার ঘটেছে, মানব সম্পদের তত উন্নতি হয় নি। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও ব্যবস্থাদি ছাড়া জেলায় জেলায় চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। ফলে আমরা সুদক্ষ চিকিৎসকগোষ্ঠী গড়ে তুলতে পারি নি। উপেক্ষা করেছি সেবিকা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। বহু সুচিকিৎসক উন্নতর জীবনের আশায় এবং দেশের কাঠামোর ওপরে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে দেশের বাইরে চলে গিয়েছেন। এতে আমাদের স্বাস্থ্যসেবার কাঠামো-ভঙ্গুরতা আরো বেড়েছে।

বিজ্ঞাপন

পাঁচ, অন্যান্য পেশাজীবি খাতের মতো চিকিৎসা খাতের ও চরম রাজনীতিকরণ হয়েছে আমাদের দেশে। ফলে পেশাজীবি দক্ষতা, মেধাভিত্তিক পদোন্নতি সবকিছুই বিঘ্নিত হয়েছে।

মানসিক ভঙ্গুরতা বিষয়ে আসা যাক। প্রথমেই বল নেয়া ভালো, কর্ম-প্রকৃতির কারনেই চিকিৎসক-সেবিকাদের একটি বিশেষ সংবেদনশীলতা প্রত্যাশিত। কারণ, মানুষের জীবন-মরণ নিয়ে তাদের কর্মকান্ড। তা’ছাডা ‘হিপোক্রেটিজ’ প্রতিজ্ঞা তো তাদের রয়েছেই। মানুষকে সেবাদানকেই তারা তাদের লক্ষ্য বলে মনে করেন। আমাদের ছোটবেলায় সেটাই আমরা দেখেছি আমাদের সমাজে।

পরবর্তী সময়ে চিকিৎসা কর্মকান্ডে বানিজ্যীকরণ, মুনাফা সর্বোচ্চকরণ, ত্রিধারা স্বাস্থ্যসেবার ইত্যাদি কারনে সেই ঐতিহ্যগত সংবেদনশীলতা ক্ষয়িষ্ণু হতে শুরু করে। ফলে, রোগী ও চিকিসকের মধ্যে একটি দূরত্বের সৃষ্টি হয় এবং সম্পর্কটি বাণিজ্যিক হতে শুরু করে এবং রোগীদের প্রতি অবহেলা এবং ঔদ্যাসীন্যের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু এটা অত্যন্ত জোরের সঙ্গে বলা প্রয়োজন যে এ প্রবণতার বিপরীতে বহু ব্যতিক্রম রয়েছে, যাদের প্রতি আমরা নমিত হই।

একই কারণে রোগী বা তাদের আত্মীয়েরাও সেবা প্রতিষ্ঠানের ও চিকিৎসকদের প্রতি অসহনশীল, অসহিষ্ণু ও অন্যায্য ব্যবহার করেছেন। চিকিৎসকদর প্রাণান্তকর চেষ্টা সত্ত্বেও রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তবুও তাদেরকেই দায়ী করা হয়েছে, তারা প্রহৃত হয়েছেন, ভাংচুর হয়েছে।

এই মানসিক নাজুকতার চরম প্রকাশ ঘটেছে করোনাকালে উভয়পক্ষেই। এবং এর মূলে রয়েছে করোনা ব্যপারে অবৈজ্ঞানিক আতঙ্ক, অগ্রহণযোগ্য আত্ম-কেন্দ্রিকতা এবং অমানবিক মানসিকতা। এই কারনেই অন্য রোগে আক্রান্ত হয়ে রোগী যখন হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, তখন করোনা সন্দেহে তিনি প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে। এর ফলে, প্রাণহানি ঘটেছে বহুজনের। অন্যদিকে, চিকিৎসক বা সেবিকা বিধায় এমন বহু পেশাজীবিই ‘সামাজিক অস্পৃশ্য’তে পরিণত হয়েছেন। তাদেরকে বাড়ী থেকে উৎখাত করা হচ্ছে, কোন আক্রান্তস্থানে সেবা দিতে গেলে তাদেরকে ধাওয়া করে তাড়ানো হচ্ছে। এ মানসিকতার তুলনা কোথায়?

এ জাতীয় মানসিকতা দূরের জন্য শিক্ষা ও সচেতনা বৃদ্ধির প্রয়োজন। সেজন্যে প্রয়োজনীয় কাঠামো, আইন ও নীতিমালা দেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। অসমতা, বৈষম্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘন যে কোন স্বাস্হ্যসেবা কাঠামোয় অভিপ্রেত হতে পারে না।

ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ‘গণস্বাস্থ্য’ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে যে স্বল্পমূল্য করোনা ‘পরীক্ষা উপকরণ’ বের করেছেন, তাও গৃহীত বা ব্যবহৃত হয় নি। এরও কোন সদুত্তর নেই।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত ও স্বাস্থ্যসেবার কাঙ্খিত উত্তরণের জন্যে এই সব ভঙ্গুরতা ও নাজুকতার মোকাবেলা একান্ত প্রয়োজন এবং সেটা করার ‘এখনই সময়’! ‘এই দায়ভাগে আমরা সবাই সমান অংশীদার’ এবং ‘অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকে না’।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)