চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দেশের প্রেক্ষাগৃহে হিন্দি সিনেমা: শিল্পীরা কী ভাবছেন?

বাংলাদেশের সিনেমা হলগুলোতে হিন্দি ছবি চালানোর প্রস্তাব করেছেন হল মালিকরা। এমন খবরই শিরোনাম হচ্ছে ক’দিন ধরে। হিন্দি ছবি আমদানি বিষয়ে তারা বলছেন, করোনাকালে দর্শক সংকট কাটাতে বাধ্য হয়ে এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তারা। বলছেন, সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া ঠেকাতে হিন্দি ছবি আমদানির বিকল্প নেই।

যদিও হিন্দি সিনেমা চালানোর ব্যাপারে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি তথ্যমন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ হল মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সাথে এক বৈঠকে বলিউডের দশটি সিনেমা চালানোর প্রস্তাব দিয়েছেন তারা৷ তথ্যমন্ত্রী হল মালিক সমিতিকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একটি লিখিত প্রস্তাব দিতে বলেছেন৷ লিখিত পাওয়ার পর মন্ত্রণালয় থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে বলে জানা গেছে৷

মন্ত্রণালয়ের ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পেলে দেশের প্রেক্ষাগৃহে নতুন নাকি পুরনো হিন্দি সিনেমা চলবে, সে বিষয়সহ সিনেমা চালুর দিন তারিখও নির্ধারিত হবে বলে জানান হল মালিক নেতারা। এই প্রেক্ষিতে কী ভাবছেন দেশের চলচ্চিত্র শিল্পীরা?

দেশের প্রেক্ষাগৃহে হিন্দি সিনেমা চালানোর বিষয়টি নিয়ে অতীতে জলঘোলা কম হয়নি। ২০১৫ সালে সাফটা চুক্তির ভিত্তিতে হিন্দি সিনেমা ‘ওয়ান্টেড’ মুক্তি ঠেকাতে রাস্তায় পর্যন্ত নামতে দেখা যায় দেশীয় শিল্পী-কলাকুশলীদের।

সেই পুরনো স্মৃতি ভুলে যাননি কেউই। তাই নতুন করে দেশের প্রেক্ষাগৃহে হিন্দি সিনেমা মুক্তির বিষয়টিকে ‘আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত’ হিসেবে দেখছেন দেশীয় সিনেমার অধিকাংশ শিল্পীরা। চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন বেশ কয়েকজন অভিনেতা:

এ বিষয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের সিনিয়র অভিনেতা সোহেল রানা বলেন, করোনার কারণে সিনেমা হলের প্রতি মানুষের যে অনীহা তৈরী হয়েছে, আমারতো মনে হয় না পৃথিবীর যে কোনো ভাষার সিনেমা এলে সেখানে লোকে দেখতে আসবে? আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আগে হলগুলো চলার মতো অবস্থা তৈরী করতে হবে। সিকিউরড একটা পরিবেশ তৈরী করতে হবে। আর সেটাও করা উচিত কোভিড পরিস্থিতি শেষ হওয়ার পর। এটা এজন্য বলছি, কোভিড পরিস্থিতি যতোদিন পৃথিবীতে থাকবে সিনেমা হলে অন্তত মানুষ আসবে না।

বিজ্ঞাপন

দর্শক টানতে হিন্দি সিনেমা চালানোর যে সিদ্ধান্ত এই সময়ে হল মালিকরা নিয়েছেন, সেটা ভুল পদক্ষেপ বলেও মন্তব্য করেন সোহেল রানা। তিনি বলেন, এখনতো এমনিতেই খারাপ সময়, যখন স্বাভাবিক সময় ছিলো তখনওতো হল মালিকরা ভারতীয় ছবি এনে চালিয়েছেন, কই দর্শক কি হুমড়ি খেয়ে পড়েছে? করোনাকালে দর্শক সংকট কাটাতে হিন্দি সিনেমা এনে প্রেক্ষাগৃহ চালু রাখা আমার কাছে কোনো সুন্দর সমাধান মনে হয় না। তিনি আরো বলেন, দেশ আগে কোভিড মুক্ত হোক। তারপর সবাই বসে দেশের সিনেমা কী সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হবে, শিল্পী-কলাকুশলীরা বাঁচতে পারবে, সিনেমা হল মালিকদের ভালো হবে- সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলেই ভালো হয়। অনেক দিক বিবেচনা করে একটা সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার।

চিত্রনায়ক আলমগীর বলেন, হিন্দি সিনেমা বন্ধ করে গেছেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর এখন দেশ পরিচালনা করছেন তাঁরই সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমার মনে হয় তিনি সব বুঝে শুনেই সিদ্ধান্ত দিবেন। আমি হল মালিকদের পক্ষে বা বিপক্ষে কথা বলছি না, কারণ হিন্দি ছবি নিয়ে সিদ্ধান্ত দিয়ে গেছেন শেখ মুজিবুর রহমান।

সার্বিকভাবে যদি আমি বলি, হলতো এমনিতেই চলছে না। হিন্দি সিনেমা আনলে কি হল চলবে? ইন্ডিয়াতেও তো হিন্দি ছবি চলছে না। এখন একটা অজুহাতে হিন্দি ছবি নিয়ে আসবে, এটা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না! তবে এই সিদ্ধান্তটা সরকারিভাবে নিলেই বেটার। হল মালিক বা আমরা প্রযোজক যারা আছি, তারা তো অনেক কিছুই চাই, সেটা সরকার এখন বিবেচনা করুক। সেটাই আমার ভালো মনে হয়।

তবে এই বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলতে রাজি না হলেও কিংবদন্তী অভিনেত্রী ববিতা বলেন, ‘এখন সময় খারাপ। চারদিকে আপনজনদের অসুস্থতার খবর শুনছি। এরমধ্যে চলচ্চিত্র নিয়ে এমন খবর ভালো লাগে না। আমি মনে করি, সবাই আগে এই খারাপ সময়টাকে মোকাবিলা করুক। সুস্থ থাকলে এসব বিষয়ে ভাবা যাবে।’

২০১৫ সালেও হিন্দি সিনেমার মুক্তি ঠেকাতে রাস্তায় ছিলেন অভিনেতা অমিত হাসান। এবারও হিন্দি সিনেমার মুক্তি নিয়ে সোচ্চার এই শিল্পী। বললেন, দেশীয় চলচ্চিত্রের জন্য হিন্দি সিনেমা ইতিবাচক কিছু বয়ে আনবে না। এমন সিদ্ধান্তে হয়তো হল বাঁচবে, কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্র বাঁচবে কিনা এটা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে!

‘শেষ ঠিকানা’ খ্যাত এই অভিনেতা আরো বলেন, হিন্দি সিনেমার আমদানির বিষয়টি শিল্পী হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে অপছন্দের। তবে চলচ্চিত্রের বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা আছেন, প্রযোজক সমিতির নেতারা আছেন- আশা করছি তারা এ বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিবেন।

হিন্দি সিনেমার মুক্তি ঠেকাতে তৎপর ছিলেন অভিনেতা ডিপজল। হিন্দি সিনেমাকে ‘সংস্কৃতি বিরোধী’ আখ্যা দিয়ে এই অভিনেতা বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশি মানুষ, আমাদের সিনেমা হলে বাংলা সিনেমা চলবে। এটাই আমাদের দাবী। হিন্দি ইংরেজি ছবি আমাদের কেন চালাইতে হবে? হিন্দি সংস্কৃতির সাথে বাংলা সংস্কৃতি কি মিলে? হিন্দিতো আমাদের সংস্কৃতি বিরোধী। আমরা চাই না, হিন্দি ছবি আমাদের সিনেমা হলে চলুক। এতে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। শেষ পর্যন্ত এমন সিদ্ধান্ত যদি হয় ই, তাহলে সেটা অন্যায় হবে।

হিন্দি ছবির মুক্তি ঠেকাতে সর্বশেষ ২০১৫ সালে শিল্পী সমিতির সভাপতি শাকিব খানের নেতৃত্বে বিক্ষোভসহ নানা কর্মসূচি পালন করে শিল্পী সমিতির অন্তর্ভূক্ত অভিনেতা অভিনেত্রীরা। দেশে আবারও হিন্দি সিনেমা মুক্তির প্রস্তুতিকে কীভাবে দেখছে বর্তমান শিল্পী সমিতি? জানতে যোগাযোগ করা হয় শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খানের সঙ্গে। সেই সময় তিনিও আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন।

এ বিষয়ে শিল্পী সমিতির এই নেতা বলেন, শিল্পী সমিতির প্রতিনিধি হিসেবে যদি বলি তাহলে বলতে হয় দেশের প্রেক্ষাগৃহে হিন্দি ছবি চালানোর বিষয়ে আমাদেরকে কেউ লিখিতভাবে কিছু জানায়নি। আমরা সংবাদ মাধ্যমে বিক্ষিপ্তভাবে শুনছি। যেহেতু সাংগঠনিকভাবে লিখিত বা মৌখিকভাবেও কেউ আমাদের কিছু জানায়নি, তাই আমরাও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারছি না। তবে এ নিয়ে কোনো প্রস্তাব যদি আমাদের কাছে আসে, তখন কার্যনির্বাহী কমিটি বসে যে মত দেয় সেটা জানিয়ে দিবো।

ব্যক্তিগতভাবে এই অভিনেতার কাছে দেশে হিন্দি সিনেমা মুক্তির প্রস্তুতি কীভাবে দেখেন? জানতে চাইলে বলেন, শিল্পী হিসেবে বলবো, আমি অবশ্যই আমার দেশের হলে আমার দেশের সিনেমাই দেখতে চাই। ভিনদেশি সিনেমা দেখতে চাই না। আবার হল বন্ধ হয়ে যাক- এটাও আমরা চাই না। এরজন্য গড়পরতা সিনেমা না বানিয়ে ভালো সিনেমা বানাতে হবে। তাহলে দেশের শিল্পী, কলাকুশলীদের হুমকির মুখে পড়তে হবে না।