চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধুর প্রতি শোকাঞ্জলি

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বিগত দিনগুলিতে ‍যিনি অকৃত্রিম বন্ধু হয়ে পাশে দাঁড়াতেন তিনি ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে বাঙালির অনেক মহান রাজনৈতিক নেতা থাকা স্বত্ত্বেও ভারতের মূলধারার রাজনীতিতে যে কজন তাদের গ্রহণযোগ্যতা তুলে ধরতে পেরেছিলেন প্রণব মুখার্জি তাদের অন্যতম। তিনি ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি।
ভারতের স্বাধীনতা পূর্ব রাজনীতিতে বাঙালি সুভাষ চন্দ্র বসু আজও কিংবদন্তি হয়ে বেঁচে আছেন ভারতীয় জনগণের হৃদয় মাঝে। এরপর সর্বভারতীয় রাজনীতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছেন প্রণব মুখার্জি।
পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের কীর্ণাহারের কাছেই মিরাটি গ্রামে ১৯৩৫ সালের ১১ ‍ডিসেম্বর প্রণব মুখোপাধ্যায় জন্ম গ্রহণ করেন। বাড়ির আদি পুরুষ কামদাকিঙ্কর মুখোপাধ্যায় বহু বছর স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য লড়েছেন। জেলবন্দি ছিলেন দশ বছর। সেই কামদাকিঙ্করের ছেলেই প্রণব মুখোপাধ্যায়। বীরভূমের সিউড়ির বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্র ছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস ও আইন শাস্ত্র ছিল তাঁর বিষয়। স্নাতোকোত্তর পাশ করার পর তিনি বিদ্যাসাগর কলেজে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এক কালে সাংবাদিকতাও করেছেন। ‘দেশের ডাক’ নামক সংবাদপত্রে তিনি কয়েক বছর কাজ করেন।

বিজ্ঞাপন

রাজনৈতিক পরিবারে ছোট থেকে মানুষ প্রণব মুখোপাধ্যায় ভারতীয় রাজনীতির প্রতিটি উত্থানপতনে নিজেকে সজাগ রেখেছেন। কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ পরিবার সূত্রে। ১৯৬৯ সালে তিনি প্রথমবার কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসেবে রাজ্যসভায় যোগ দেন। তারপর ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন। ১৯৭৩ সালে কেন্দ্রীয় শিল্পোন্নয়ন মন্ত্রী হিসেবে তিনি জাতীয় কংগ্রেসের অপরিহার্য নেতা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেন। ইতিহাস, আইন আর রাষ্ট্রবিজ্ঞনের ছাত্র প্রণব মুখোপাধ্যায় বহু বছর ভারতের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলেছেন, দক্ষতায়। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ সাল এই দায়িত্ব তাঁকে বহু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দিয়েছিল। সেই সময় বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ৫ অর্থমন্ত্রীর তালিকায় ছিলেন তিনি।বাঙালিকে যে গর্ব আগে কেউ দিতে পারেননি, তাই দিয়েছেন প্রণব মুখার্জি দেশের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিতেই তিনি প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গ ইতিহাসেও জায়গা করে নেন। কীর্ণাহারের মিরাটি গ্রামের বাঙালি ঘরের সন্তান প্রবেশ করেন ভারতের রাষ্ট্রপতির রাজভবনে। আজীবন দেশ বিদেশ থেকে বহু সম্মাননা প্রণব পেয়েছেন তিনি। সম্মানিত হয়েছেন পদ্মবিভূষণে। সম্মান পেয়েছেন ভারতরত্ন’র। দুই সন্তান শর্মিষ্ঠা ও অভিজিৎকে সঙ্গে নিয়ে প্রণব মুখার্জির স্ত্রী শুভ্রা মুখোপাধ্যায়ের জীবন আগাগোড়াই ছিল সক্রিয়। তিনি ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পযন্ত ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ভারতের ১৩তম রাষ্ট্রপতি। সোমবার বিকেলে ২১ দিনের লড়াই শেষে, তিনি দিল্লীর সেনা হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। মঙ্গলবার দিল্লীতে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে শেষ বিদায় জানায় ভারত সরকার।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্বাসিত রাজনৈতিক জীবনে প্রণব মুখার্জি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার খুব কাছের একজন শুভাকাঙ্খী ছিলেন। ভারত বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রণব মুখার্জি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বর্হিবিশ্বে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন নিরলসভাবে। বাংলাদেশের অকৃত্রিম এই বন্ধুকে শ্রদ্ধা জানাতে ২ সেপ্টেম্বর বুধবার বাংলাদেশ সরকার শোক দিবস পালন করবে। বুধবার বাংলাদেশের সকল সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সকল সরকারি ও বেসরকারি ভবন এবং বিদেশস্থ বাংলাদেশ মিশনসমূহে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। এছাড়াও সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হবে।
আমরা বাংলাদেশের এই অকৃত্রিম বন্ধু ও বাঙালির গর্ব প্রণব মুখার্জিকে অতল শ্রদ্ধা জানাই।