চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘বাংলাদেশকে আবারও পাকিস্তানের প্রদেশ করতে চেয়েছিল মোশতাক’

ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ-এর সাবেক দক্ষিণ এশীয় প্রতিনিধি লরেন্স লিফশুজ বলেছেন: ১৯৭১ সালে মোশতাক গ্রুপের পরিকল্পনা ছিল জাতিসংঘের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ থামিয়ে বাংলাদেশকে আবারও পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশ করা এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্ত করা। এজন্য ১৯৭১ সালের অক্টোবরে মোশতাক যুক্তরাষ্ট্রে যায়।

সিআরআই আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ১৯৭৫: সেটিং দ্য ক্লক ব্যাক’ শীর্ষক ভার্চুয়াল আলোচনায় অংশ নিয়েছেন পঁচাত্তরে ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউয়ের দক্ষিণ এশিয়া প্রতিনিধি লিফশুজ।

বিজ্ঞাপন

১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ঘটনায় যে অল্প ক’জন বিদেশি সাংবাদিক রিপোর্ট করেছিলেন, লরেন্স লিফশুলজ তাদের অন্যতম। আগস্টের বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং তৎপরবর্তী সংঘাতময় নভেম্বর মাসের ঘটনাবলি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন প্রখ্যাত এই মার্কিন অনুসন্ধানী সাংবাদিক।

১৯৭৪ ও ৭৫ সাল জুড়ে তার কর্মক্ষেত্র ছিল দক্ষিণ এশিয়া। ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ-এর সাবেক এই দক্ষিণ এশীয় প্রতিনিধি ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান ও হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত অজানা অধ্যায়ের নতুন দরোজা উন্মোচন করেছেন।

লরেন্স লিফশুলজ বলেন, ১৯৭৫ সালে ভারত সরকারসহ বাংলাদেশের বেশ কিছু কমিউনিস্ট পার্টি অভিযোগ করে যে মার্কিন সরকারের ইন্ধনে ১৫ আগস্টের ক্যু হয়েছে। মুজিব হত্যাকাণ্ডে বিশ্বের যে সব দেশ সংশ্লিষ্ট তাদের যুক্তরাষ্ট্রের জড়িতে থাকার অভিযোগ আনা হয়। তখন আমি ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ ম্যাগাজিনের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক প্রতিনিধি। ওই ক্যু-এর ঘটনা সংশ্লিষ্ট অনেক অভিযোগই আমার কাছে আসছিল। তবে এই ঘটনায় মার্কিন সংশ্লিষ্টতা তখন আমার কাছে বিশ্বাস হচ্ছিল না। আমার মনে হচ্ছিল এটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির থেকে অনেক দূরের একটি বিষয়।

১৯৭৪ সালে ফ্র্যাঙ্ক চার্চের নেতৃত্বে চার্চ কমিটি ক্যু এবং অন্যান্য হস্তক্ষেপের সঙ্গে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার জড়িত থাকার ইতিহাস নিয়ে একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ করে। তখন সংস্থাটির কাজ এবং জবাবদিহিতার জন্য গুরুতর সংস্কার দাবিও করা হয়েছিল। আমি ১৯৭৫ সালে ওই প্রতিবেদনে দেখি। সিআইএ নিয়ে ওই প্রতিবেদন এবং মার্কিন কংগ্রেসে এ নিয়ে তদন্ত অনুযায়ী আমার কাছে তখন এটি অসম্ভব মনে হয়েছিলো। ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি আমি ঢাকায় আসি। তখন আমার এক পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে আমার কথা হয়। তবে ওই ব্যক্তির নাম আমি কখনো প্রকাশ করিনি।

তিনি আমাকে জানান যে, শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার উত্তেজনা চলছিল। তবুও শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডে তাকে বিচলিত দেখা যায়। তিনি আমাকে আরও জানান, পরিকল্পতিভাবে আগস্টে ক্যু করা হয়েছিল বাংলাদেশ।

তখন তিনি আমাকে বলেন, তোমার জানতে হবে ১৯৭১ সালে খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে কলকাতায় কী হয়েছিলো। সেই প্রথম ব্যক্তি যিনি আমাকে জানান, ১৯৭১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হেনরি কিসিঞ্জার তার বিশেষ দূত জর্জ গ্রিফিনকে কলকাতায় পাঠিয়েছিলেন। তখন গ্রিফিন মোশতাক, মাহবুবুল আলম চাষি, তাহেরউদ্দিন ঠাকুরের সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে এটি তখন বাংলাদেশের তৎকালীন তাজউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন সরকার জানতো না। ১৯৭১ সালের অক্টোবর মোশতাক যুক্তরাষ্ট্রে যায়। মোশতাক গ্রুপের পরিকল্পনা ছিল জাতিসংঘের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ থামিয়ে বাংলাদেশকে আবারো পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশ করা এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্ত করা।

বিজ্ঞাপন

তবে এই পরিকল্পনার বিষয়ে তৎকালীন তাজউদ্দিন সরকার কিছু জানতে পারলে রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায়ে খন্দকার মোশতাককে গৃহবন্দী রাখা হতো। এই কথোপকথনের মধ্যে আমাকে বলা হয়, যারা ১৯৭১ সালে ওই পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন তারাই শেখ মুজিবুরকে হত্যা করেছে এবং মোশতাককে সেনা অভিযানের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসিয়েছেন। এরপর থেকেই আমার মূলত সন্দেহ বাড়তে থাকে। জানতে পারি যে, ক্যু-এর ঘটনার কিছুদিন আগে মার্কিন দূতাবাসের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন জিয়াউর রহমান। সেখানে সিআইএ’র পক্ষ থেকে তাকে গোপন বার্তা দেওয়া হয়। তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিস ইউজেন বোস্টার এই ক্যু-এর পরিকল্পনায় খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন। তখন তিনি মার্কিন দূতাবাসের কর্মীদের এই পরিকল্পনা প্রকাশ না করার নির্দেশ দেন। ক্যু-এর ঘটনার ছয় মাস আগে ওই পরিকল্পনা হয়। ক্যু-এর আগে বাংলাদেশের একজন ব্যবসায়ীর বাড়িতে ডিনারের আয়োজনে জিয়া সিআইএ সদস্যের সঙ্গে বৈঠক করেন। জিয়াউর রহমান এই ক্যু-এর অন্যতম নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন। তার প্রমাণ পাওয়া যায় তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লার লেখাতেও।

শফিউল্লাহ লেখেন, সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ হিসেবে জিয়া সেনাদের ৩২ নম্বরে যাওয়া ঠেকাতে পারতেন। এছাড়া ক্যু নিয়ে জিয়ার কর্নেল ফারুক এবং কর্নেল রশিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। জিয়া তাদের আশ্বস্ত করেন যে তাদের পরিকল্পনায় সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করবে না। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন। তখন বাংলাদেশের যেসব সেনা সদস্যরা ১৫ আগস্টের ঘটনার জন্য জিয়াকে দায়ী করতেন তাদেরকে আটক করা হয়। ওই সময় প্রায় ৩ হাজার সেনা সদস্যের বিনাবিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। জেনারেল শাখওয়াত আলী এবং মঈন চৌধুরী তাদের বইতে এমনটি বলেছেন। আমার মতে জিয়াউর রহমান মানসিক বিকারগ্রস্ত একজন ব্যক্তি ছিলেন। কারণ সে অরাজকতার মাধ্যমে অনেকের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন।

লরেন্স লিফশুলজ বলেন, জিয়ার সমর্থন ছাড়া এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো সম্ভব না। আবার যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়াও জিয়াউর রহমান এমন কাজ করতে পারেননি। ভারতীয় ইতিহাসবিদ সলিল ত্রিপাঠি ১৯৮৮ সালে তরুণ প্রতিবেদক হিসেবে এসেছিলেন বাংলাদেশ। তখন তিনি শেখ মুজিবের আত্মস্বীকৃত খুনি কর্নেল ফারুকের সাক্ষাতকার নিয়েছিলেন। তিনি জানান যে, বাংলাদেশের যুদ্ধের সময় তার মাত্র ৯ বছর বয়স ছিল।

সলিল বলেন, ১৯৮৬ সালে আমি যুক্তরাষ্ট্রে স্নাতক শেষ করে এবং ভারতে ফিরি। পরে বাংলাদেশে আসার সিদ্ধান্ত নেই এটা জানার জন্য যে কী হয়েছিল সেখানে। যে দেশটি গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং উদারপন্থার পথচলা শুরু করেছিল, কেন সেখানে শেখ মুজিবকে হত্যা, জেল হত্যা, অভ্যুত্থান এবং পাল্টা অভ্যুত্থানের দিকে পর একনায়কতন্ত্র শাসন চালু হলো। আমি ভারতেও এই ঘটনা শুনেই বড় হয়েছি ।

সলিল জানান, ঢাকায় এসে তিনি শেখ মুজিবের আত্মস্বীকৃত খুনি কর্নেল ফারুকের সাক্ষাতকারের সুযোগ পান। তখন কর্নেল ফারুক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন/সুতরাং আমি তার বিষয়ে কৌতূহলী ছিলাম এবং যখন আমি তাকে জানাই যে আমি ঢাকায় তখন সে আমাকে বলে সাক্ষাতকার দিতে প্রস্তুত। কর্নেল ফারুক আমাকে জানায়, সে লিবিয়া ছিল। আশ্চর্যজনকভাবে সে তখন অনেক আত্মবিশ্বাসী ছিল। তখন আমি বুঝতে পেরেছি, গুরুত্বপূর্ণ কেউ তাকে সমর্থন দিচ্ছে। কারণ সে যা করেছে তারপর কারো সমর্থন ছাড়া কেউ এমন আচরণ করতে পারেন না। তার বাড়িতে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। আমি এখনো তার গলার সেই স্বর স্পষ্টভাবে স্মরণ করতে পারি।

আমি যখন তাকে প্রশ্ন করি, কেন রাসেলকে হত্যা করা হলো, ১০ বছরের একটি শিশুকে হত্যা করা কি খুব প্রয়োজন ছিল? তখন ফারুক আমাকে বলে, তাকে এমনটি করতে হয়েছে কারণ সে বেঁচে থাকলে এই রাজবংশীয় ধারা চলতে থাকতো। আমরা এর শেষ করতে চেয়েছিলাম। বাংলাদেশকে বাঁচানোর জন্য আমরা সবকিছু করতে পারি। কারণ আমরাই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা এবং আমাদের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। এখানে ভারতের শাসন চলতো।

কর্নেল ফারুক আরো বলেন, কিছু ব্যক্তি ছিলেন যারা রাজনীতির নাম করে কলকাতায় বসে ছিলেন। তারাও নিজেদেরকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে। কিন্তু আসলে তারা কিছুই করেননি। আমরাই যুদ্ধ করেছিলাম। এমনভাবেই কর্নেল ফারুক নিজেকে উপস্থাপন করেছিলেন আমার সামনে।

শেখ মুজিব হত্যার পরে ইন্ডিমিনেটি অধ্যাদেশ জারি করে খুনিদের পুরস্কৃত করার সমালোচনা করেন সলিল ত্রিপাঠি।

তিনি বলেন, মানবতা বিরোধী অপরাধীদের বিচার হতেই হবে। সহিংসতার স্থান কোনো সমাজেই নেই।