চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বহু সংস্কৃতির শহর মেলবোর্নে, ‘কৃষ্ণা কুটির’ এর জমকালো দুর্গোৎসব

দশবছর আগে যখন সুদূর অস্ট্রেলিয়ায় এসে মেলবোর্ন শহরের বাসিন্দা হয়েছি, তখন এখানকার এক পূজামণ্ডপকে একটি সাজানো পুতুলঘরের বেশি ভাবতে পারিনি। সেদিনের সে পূজামণ্ডপে উৎসাহী ঢাকবাদকের দেখা পাইনি। মঞ্চে বাতির যথেষ্ট ঝলক থাকলেও, প্রাণখোলা হাসির সে দমক দেখিনি! অফুরন্ত পুজোর প্রসাদ হিসেবে সেই সন্দেশ-নাড়ু-মুড়ি-মুড়কিই বা কই? ‘ফেলো কড়ি, মাখো তেল’ মেনে নিয়ে কিছু পোলাউ কোর্মা খেয়ে বিরস বদনে বিদায় নেই সে যাত্রায়! তবে হতাশাময় সে অভিজ্ঞতা আজ নিতান্তই অতীত। বাংলাদেশী’র সংখ্যা ইদানিং বেড়েছে; তারা এখন তাদের মতো করে মেলবোর্নের বিভিন্ন দিকে চমৎকার সব পুজোর আয়োজন করছে। সম্পূর্ণ বাঙালি কায়দায়! আর এ সকল পুজোর মাঝে হৈচৈ ফেলেছে যে পুজোটি তা নিতান্তই এক ঘরোয়া আয়োজনের পুজো। ‘কৃষ্ণা কুটির’ এর ঘরোয়া সে আয়োজনে কমসে কম তিন-চারশো লোক হয় ফি বছর।

গত তিনবছর এটি ছিল মেল্টনে। এবার হলো মেলবোর্ন থেকে আরো একটু দুরে, ব্যাকাস মার্সে। মেলবোর্নের জাত-পাত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই অপেক্ষায় থাকেন সানি’দাদের এ পূজোর জন্য। কৃষ্ণা কুটিরের পুজোর জন্য। কেউবা এটিকে অভিহিত করেন ‘মাসির বাড়ির পূজো’ হিসেবেও।
যে যে নামেই ভাবুক না কেন; মাসিমা ও তাঁর পুত্র সানিদা সহ কৃষ্ণা কুটিরের সকলের অমায়িক আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়েই দূর দূরান্ত থেকে মানুষের ঢল নামে এখানে। মেলবোর্ন এর ‘কৃষ্ণা কুটির’ রূপান্তরিত হয় ‘ছোট্ট এক বাংলাদেশ’-এ।

তাদের এ ‘বাড়ির পুজো’ সম্পর্কে জানতে চাই সানিদা’র কাছে। সঞ্জয় চক্রবর্তী সানিদা বললেন “অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়াতে উদযাপিত এটিই একমাত্র পুজা যেটি বাংলাদেশের পঞ্জিকা অনুযায়ী দিনক্ষণ তিথি নক্ষত্র মেনে সম্পূর্ণ সাত্ত্বিকভাবে পরিচালিত এবং উদযাপিত একটি পুজ।
৫দিন ব্যাপি পরিচালিত এই পুজা করতে বাংলাদেশ থেকে পুরোহিত আনা হয়| প্রতিদিনই পুজার প্রসাদ বিতরন করা হয় আগত অতিথিদের মাঝে। রোজ সন্ধ্যায় ঢাক ঢোল বাজিয়ে ধুনুচি নাচের সাথে করা হয় সন্ধ্যা আরতি। জাতি ধর্ম বর্ন নির্বিশেষে সবার জন্যে উন্মুক্ত এই পুজা।” পাশে দাঁড়ানো সানিদা’র ভগ্নি ও ভগ্নিপতি ইতুদি-চন্দন’দাও আরো জানালেন, “শুধুমাত্র স্বেচ্ছায় আনীত অর্থাৎ প্রতিমাকে উদ্দেশ্য করে পূজার নৈবদ্য সামগ্রী ফলমূল ফুল মিস্টি আর পুরোহিতকে কে দান করা নিজ পুজার দক্ষিনা ব্যতীত আর কোন ধরনের চাঁদা বা ডোনেশন নেয়া হয় না পুজায় আগত কারো কাছ থেকেই। পুজা উপলক্ষে মাস ব্যাপি আয়োজন চলে কঁচিকাঁচাদের অনুশীলন।ভবিভিন্ন রকমের গান নাচ ইত্যাদি’র এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্যে।”

পাঁচ পাঁচটি দিনের এ বিশাল যজ্ঞের পর, যখন দশমিতেও মাসিমা’র পান খাওয়া টুকুটুকে ঠোঁটের হাস্যোচ্ছ্বলতায় আপ্যায়িত হলাম; তখন জিজ্ঞেস করেই ফেললাম- ‘কেমন করে পারেন মাসিমা? … এত এত মানুষ, টানা পাঁচদিন সকাল বিকাল সামলানো সে কি চাট্টিখানি কথা?’ মাসিমা’র হাসি যেন আরো একগাল বিস্তৃত হলো; বললেন, “মায়েরা সব পারে রে মা, সন্তানের জন্য… জানো না? এই যে তোমরা আসো, আনন্দ করো এটুকু দেখেই তো ফি বারের পুজোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়ে যায়! তোমাদের ভালোবাসার টানেই তো মেল্টন ছেড়ে এতদূরে এসেও ‘বাড়ির পুজো’ ছাড়তে পারলাম না!”

বিজ্ঞাপন

আগত অতিথিদের মাঝে আইরিন নাদিয়া’র কাছে জানতে চাইলাম- ‘কেমন লাগছে?’ খুব উচ্ছসিত হয়ে তিনি জানালেন “গত কয়েক বছর অনেক শুনেছি এই ‘বাড়ির পুজো’র কথা। কিন্তু এবারই প্রথম এসেছি। বর,পুত্র,কন্যা সহ দারুন এনজয় করছি। মনে হচ্ছে যেন সেই ছেলেবেলার পুজোর গন্ধ পাচ্ছি।”

বাংলাদেশী ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা তো আছেনই; আছেন অস্ট্রেলিয়ান, ইউরোপিয়ান, ইন্ডিয়ান কমিউনিটি’র কিছু মানুষও। সাংস্কৃতিক এ আদানপ্রদান ‘বহু সংস্কৃতির দেশ অস্ট্রেলিয়া’য় ভীষণভাবে সমাদৃত।

দশমীর রাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এর পর নৈশভোজ সেরে বাড়ি ফিরলাম। ফিরলাম এক বুক ‘শৈশবের বাংলাদেশ’ হৃদয়ে নিয়ে।

শুভেচ্ছা ও শুভকামনা রইলো কৃষ্ণকুটির এর সকলের জন্যে… ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সকলের’ এ সত্য প্রমাণিত হোক বছরে বছরে!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)।

বিজ্ঞাপন