চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বর্ষার হাত ধরে বিপদ কিন্তু আরও আসছে

কথায় আছে, বিপদ কখনও একা আসে না। আমাদেরও এখন ত্রিশঙ্কু অবস্থা। করোনাভাইরাস যে সঙ্কটসাগরে ফেলেছে, তার কূল দেখা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে বেজে উঠছে আরেক বিপদসঙ্কেত- আসছে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, বৈশাখের বর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে। অজানা মহামারীর সঙ্গে পরিচিত মহামারী যোগ হলে কী হতে পারে, ভাবলেও শিউরে উঠতে হয়। অথচ তাই নাকি ঘটতে চলেছে, বলছেন বিশেষজ্ঞেরা। ডেঙ্গু কতটা বিস্তার লাভ করতে পারে, কী রকম মারণরূপ নিতে পারে, তা আমরা গত বছর দেখেছি।

তথ্যানুযায়ী গত বছর ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছিলো মোট ১ লক্ষ ৩৫৪ জন যার মধ্যে প্রাণ হারিয়েছিলো ১৭৯ জন। এবছর যদি বৃষ্টি বেশি হয় তাহলে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, বছরের শুরু থেকে প্রতিদিনই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী কোনো না কোনো হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। চলতি বছরের পহেলা জানুয়ারি থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৯৫ জন।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন গত বছরের তুলনায় এবছর এডিস মশার লার্ভার পরিমাণ বেশি। আর তাই আগে থেকেই সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। কিছুদিন আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এডিস মশার লার্ভা শনাক্তকরণ জরিপে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৫, ৬, ১১, ১৭, ৩৭ এবং ৪২ নং ওয়ার্ডে সব চেয়ে বেশি এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। কিন্তু উল্লিখিত ওয়ার্ডগুলোর এই লার্ভা ধ্বংসকরণে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা শোনা যায়নি।

বিজ্ঞাপন

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এখন চলছে কাল বৈশাখীর মৌসুম। বৃষ্টিপাত চলবে আরো কয়েক দিন। আর কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, এডিস মশার ডিম বৃষ্টির পরপরই ফুটে লার্ভা বের হবে। লার্ভা ১০ দিনের জীবন চক্র শেষ করবে। এক্ষেত্রে বৃষ্টির পর একই জায়গায় ১০ দিন পানি জমাট থাকলে সেখান থেকে এডিস মশা তৈরি হতে পারে, যদি সেখানে আগে থেকে এডিস মশার ডিম থাকে।

চিকিৎসকরদের তথ্য মতে গত বছর ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্তের ধরন ভিন্ন ছিল। আগে ডেঙ্গু হলে প্রথমে উচ্চমাত্রার জ্বর, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা ও গায়ে র‌্যাশ বা ফুসকুড়ি হতো। এর চার থেকে সাতদিনের মাথায় ডেঙ্গু হেমোরেজিকের নানা লক্ষণ যেমন, প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকা কমে যাওয়া, দাঁতের মাড়ি, নাক, মুখ ও পায়ুপথে রক্তপাত হওয়ার মতো ঘটনাগুলো ঘটতো। কিন্তু সেসব লক্ষণের ব্যতিক্রম হতে দেখা গেছে। আক্রান্ত রোগীর দুই থেকে একদিনের মধ্যে ডেঙ্গু হেমোরেজিকের লক্ষণসহ রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে। এমনকি স্বল্প সময়ে রোগী ‘শক সিনড্রোমে’ আক্রান্ত হয়ে হার্ট, কিডনি, লাংসহ বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যেতে দেখা গেছে। চরম অবনতির পর রোগীকে আইসিইউতে নেয়ার পরেও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

২০১৮ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গু ছড়িয়েছে শুধু ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে। কিন্তু ২০১৯ সালে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত। ডেঙ্গু বিষয়ে গত বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতা ও ডেঙ্গুর লক্ষণ ভিন্ন ও আক্রান্তের সংখ্যা সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ায় চলতি বছর এবিষয়ে আমদের প্রস্তুতি, করণীয় ও সচেতনামূলক কার্যক্রম কি হতে পারে তা নিয়ে ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের লার্ভা এখনও বিভিন্ন জায়গায় সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে যা বৃষ্টির জমা পানিতে সক্রিয় হয়ে উঠার সম্ভাবনা রয়েছে, এ বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এখনই পদক্ষেপ নেয়া দরকার।

বিজ্ঞাপন

স্বীকার করতে হবে যে, বর্ষার সঙ্গে পতঙ্গবাহিত রোগগুলির আবির্ভাব এবং তার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত হওয়ার পরেও এ আমাদের প্রচলিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা তার মোকাবেলায় যথেষ্ট সাফল্য লাভ করেনি। মশা বংশবৃদ্ধি করেছে, রোগের প্রকোপে হাসপাতালে রোগী উপচে পড়েছে, অতি-আক্রান্ত এলাকা থেকে মানুষ ঘর ছেড়েছে, মৃত্যুর সংখ্যাও কম নয়। প্রত্যেক বছরই এই সঙ্কটের সামনে দাঁড়িয়ে অঙ্গীকার করা হয়েছে যে, পরের বার আরও আটঘাট বেঁধে মশকনিয়ন্ত্রণ করা হবে। এ বছর করোনাভাইরাস সেই আগাম প্রস্তুতির পরিকল্পনায় আঘাত করেছে। সিটি করপোরেশন কর্মহীন, গৃহহীন মানুষদের খাদ্য যোগানের কাজে ব্যস্ত। স্বাস্থ্যকর্মীরা করোনা-জ্বরে আক্রান্তদের নিয়ে ব্যস্ত। মশা মারার কাজটি রুটিনওয়ার্কে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা, অলি-গলি-ঘুঁপচি সবখানে একযোগে ওষুধ ছিটানোর কাজটা করা হচ্ছে না। এই অবসরে মশারা বংশবৃদ্ধি করছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে গত শীতে এডিস মশারা যে সকল ডিম পেড়েছিল, সেগুলিতেও অকালবর্ষণের জলের স্পর্শে প্রাণের স্পন্দন পাবে এবং সেই সকল নতুন মশা ডেঙ্গুবাহী হতে পারে। অতএব অপেক্ষার অবকাশ নাই। করোনার মহামারী চলতে চলতেই ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের কাজে নামতে হবে। করোনা মহামারীর বিপদ দেখে ডেঙ্গুবাহী মশারা কিন্তু বসে থাকবে না।ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্তারা বাংলাদেশসহ ম্যালেরিয়াপ্রবণ দেশগুলিকে বহু পূর্বেই সতর্ক করেছেন যে, করোনার অতিমারী চলতে চলতেই ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের কাজ চালাতে হবে। তা না হলে ফল হবে ভয়ঙ্কর। করোনা-আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্পূর্ণ নিয়োজিত, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজেরা আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ দিন কর্মক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন থাকছেন। এই সময়ে অপরাপর রোগ প্রবল হয়ে উঠলে সেই সকল রোগীর চিকিৎসা ও পরিচর্যা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। অতিমারী এড়াবার জন্য যে লকডাউন চলছে, তাও ঔষধ প্রভৃতি পৌঁছাবার কাজ দুরূহ করে তুলতে পারে। পতঙ্গবাহিত রোগগুলি সকল বয়সের মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে। অতএব মশা নিয়ন্ত্রণ, সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ডগুলিতে রক্তপরীক্ষার আয়োজন, সকল ব্যবস্থা জরুরি ভিত্তিতে আগাম প্রস্তুত করতে হবে। রোগের প্রাদুর্ভাব পর্যন্ত অপেক্ষা করলে তার পরিণাম হবে মারাত্মক।

ইতিমধ্যে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে গোটা দেশের সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে খবর অনুযায়ী, করোনা-আক্রান্ত নয়, নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা পাওয়া এখন অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ওদিকে ক্রমাগত চিকিৎসক, নার্স, ও স্বাস্থ্যকর্মীদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় তাদের আইসোলেশনে যেতে হচ্ছে। ফলে অনেক হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা সেবা প্রদান প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সব মিলিয়ে স্বাভাবিক দৈনন্দিন চিকিৎসা কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে করোনার প্রকোপ বৃদ্ধির সমান্তরালে যদি ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসাব্যবস্থার জন্য সেটা হবে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’।

আমরা যেন সেই অবস্থায় পড়ে না যাই, সে জন্য এখন থেকেই ডেঙ্গু প্রতিরোধের লক্ষ্যে মশকনিধন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমসহ অন্যান্য কাজ ব্যাপকভাবে শুরু করা দরকার। বস্তুত ডেঙ্গুর প্রাক্-মৌসুম হিসেবে মার্চ মাস থেকেই যেসব কর্মসূচি পালন করার কথা, এ বছর সেগুলোর অধিকাংশই করা হয়নি। এ ব্যপারে আর কালক্ষেপণ করার সুযোগ নেই, এখনই ডেঙ্গু প্রতিরোধের ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু করা প্রয়োজন। মহানগরের বিভিন্ন স্থান জীবাণুমুক্ত করার পাশাপাশি মশকনিধনের কার্যক্রমও জোরদার করা হোক। দুই সিটি করপোরেশনকে এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে, সেই সঙ্গে পাড়া-মহল্লার মানুষ, নাগরিক সমাজকে নিয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

সিটি করপোরেশন ও ওয়ার্ডপর্যায়ে যথেষ্ট জনস্বাস্থ্যকর্মী প্রয়োজন, তাদের প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম প্রয়োজন, সকল সংশ্লিষ্ট বিভাগের মধ্যে যথেষ্ট সমন্বয়ও প্রয়োজন।

আরেকটি কথা, নিত্যনতুন সঙ্কটের মোকাবিলায় এক একটি চটজলদি ব্যবস্থা খাড়া না করে, একটি সুসংহত ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এমন পরামর্শই দিয়ে থাকেন। কথাটি শুনবার সময় এসেছে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)