চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বরিশালের ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত কেন দরকার?

বরিশাল সদর ইউএনওর সরকারি বাসভবনে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার ফুটেজ দেখে আমরা অনেকে এর নিন্দা জানিয়ে লিখেছি। কারণ একটি বাসা বা বাড়িতে বাবা-মা, বাচ্চা, স্ত্রী থাকতে পারে। আমাদের ধারণা, সম্ভবত বাসভবনের অভ্যন্তরের ফুটেজ দেখে এর স্পর্শকাতরতা বিবেচনা করেই বঙ্গবন্ধুকন্যা, মানবতাবাদী রাজনীতিবিদ, ৭৫-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার শক্ত ব্যবস্থা নিতে উদ্যোগী হয়েছে। ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের গ্রেফতারের নির্দেশ এসেছে। পুলিশের পাশাপাশি বিজিবিও তৎপর শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার শক্তিতেই এত দ্রুত ও শক্ত সিদ্ধান্ত নেয়া গেল।

মেয়র সাহেবকে প্রধান আসামী করে মামলা দেয়া হয়েছে। রাতভর অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ইউএনওর বাসায় হামলার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে পরিচিত-অপরিচিত ফেসবুকে অনেকের আবেগ-প্রসূত আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে আমাদের অনেককে। কারণ মেয়র সাহেব খুবই জনপ্রিয়, বিশেষ করে তরুণ সমাজের মধ্যে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

একজন রাজনীতিবিদ শেখ হাসিনার শক্ত অবস্থানের জন্যই কিন্তু ন্যায়বিচারের পথ সুগম হল। রাজনৈতিক নেতৃত্ব না চাইলে এত বড় সাপোর্ট বরিশালের প্রশাসন পেত না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও উদারতার সুযোগে সৃষ্ট ‘সাহসী’ বাতাবরণের মধ্যে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কবির বিন আনোয়ার স্বাক্ষরিত একটি বিবৃতি এখন আলোচনার বিষয়। এই আলোচনায় বরিশালের আরেকটি ঘটনা নিশ্চয় প্রাসঙ্গিক হবে। বছর কয়েক আগে বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ ওবায়েদুল্লাহ সাজু আগৈলঝাড়ার তৎকালীন ইউএনও গাজী তারিক সালমানের বিরুদ্ধে বরিশাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৫ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ চেয়ে একটি মামলা দায়ের করেন।

সেই মামলায় ইউএনও সালমানকে কারাগারে প্রেরণ করেন আদালত। বঙ্গবন্ধুর ছবি সংক্রান্ত একটি মামলা ছিল। সে ঘটনায়ও আমরা সেই ইএউনওর পক্ষে লেখালেখি করেছি। একজন ইউএনওকে পুলিশ কর্তৃক সাধারণ আসামির মত হাতকড়া দিয়ে বেধে কোর্টে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে আমরা প্রতিবাদী হয়েছিলাম। তখনো রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রনেতা শেখ হাসিনা রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রজ্ঞায় তারিক সালমানের প্রতি সুবিচার নিশ্চিত করার জন্য তৎপর হয়েছিলেন।

২০২০ সালে মে মাসের আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করা প্রয়োজন। ত্রাণের চাল কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার তৎকালীন নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈকা সাহাদাতের বদলি আদেশ দেয় খোদ সংশ্লিষ্ট দপ্তর। ঘটনার ধরণ দেখে আমার সন্দেহ হয়েছিল যে এটা সাজানো। আমি প্রতিবাদ করি এবং মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে সিদ্ধান্ত সঠিক হয়েছে কিনা পুনঃচিন্তা করার অনুরোধ করি। বদলির আদেশ স্থগিত হয়ে যায়। এমন প্রায় প্রতিটি বিষয়ে আমাদের একটা প্রতিবাদী অবস্থান থাকে।

বরিশাল সদরের নির্বাহী কর্মকর্তা মুনিবুর রহমান শোভন বিরোধীদলে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন। ফলে সাবেক এবং বর্তমান অনেক ছাত্রলীগ নেতা বরিশালের ইউএনওর বাসায় হামলার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন। সে তারাই এখন এই সার্ভিস এসোসিয়েশনের বিবৃতি দেখে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ, হতাশ। কেন? এসোসিয়েশনের সভাপতি কবির বিন আনোয়ার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। নিজেও ছাত্র রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং উনার পরিবার আওয়ামী লীগের ইতিহাসের গৌরবময় অংশ। কিন্তু বিবৃতির শব্দচয়ন দেখে মনে হচ্ছে, এসোসিয়েশনের নেতা হিসেবে তার যথেষ্ট মনোযোগের অভাব ছিল। শব্দ যেন শব্দবোমার কাজ করেছে। বিবৃতি নিয়ে কেন এই প্রতিক্রিয়া?

মেয়র সাহেবের পরিবারের আত্মত্যাগ সবাই জানে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যারা শহীদ হয়েছেন তাদের উত্তরাধিকার বর্তমান বরিশালের মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ। তার পিতা আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ বাংলাদেশের ইতিহাসের বিশিষ্ট ‘রাজনৈতিক নেতৃত্ব’। তার পিতা, অর্থাৎ বরিশালের মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর দাদাভাই, প্রাক্তন আওয়ামী লীগ নেতা ও পানিসম্পদ মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাতকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে হত্যা করেছিল জিয়া-মোশতাক গং এর খুনিরা।

আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহর মা, সহোদর এবং জ্যেষ্ঠ সন্তানকেও হত্যা করেছিল ঘাতকরা। আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই এবং জাতির পিতার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে। আর তার ছেলে সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ বর্তমানে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র।

বঙ্গবন্ধুর পরিবারের অংশ হতে পারা খুবই গৌরবের। কারণ বঙ্গবন্ধুর পরিবারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের শক্তিতে বাঙালির একমাত্র স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ আমরা পেয়েছি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসের প্রধান চরিত্র বঙ্গবন্ধুর আহবানে, ঘোষণায়, নেতৃত্বে মুজিবনগর সরকারে দক্ষ পরিচালনায় মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বে, রাশিয়া ও ভারতের সহযোগিতায় বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। ফলে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সাথে যাদের দূরতম যোগাযোগ আছে তাদেরকেও আমরা মন থেকে ভালবাসি, শ্রদ্ধা করি।

এত কিছুর পরেও বরিশালের ইউএনওর বাসায় যখন হামলা হল তখন বিরোধী দলে ছাত্রলীগ করা, বর্তমানে বিভিন্ন বড় দায়িত্বে আছেন এমন অনেকে প্রতিবাদ করেছে। এতে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ আছে, অনেক রাজনৈতিক ঝুঁকিও আছে। এরপরেও অনেকেই লিখেছে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকরা এমনই হয়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করে। সেই তারাই আবার যখন প্রশাসনিক সার্ভিস এসোসিয়েশনের বিবৃতি নিয়ে হতাশ হয়, ক্ষুব্ধ হয়ে তখন নিশ্চয় ভাবতে হবে সবাইকে। বিবৃতির কোথায় ভুল হয়েছে? কী ভুল হয়েছে? এত সমালোচনা হচ্ছে কেন? যারা ইউএনওর পক্ষে লিখছিলেন তারাই সবচেয়ে বেশি হতাশ হয়েছেন কেন? এটা ভেবে দেখার খুব দরকার। না হলে ভয়াবহ সংকট অপেক্ষা করছে।

বিজ্ঞাপন

এই বিবৃতি পড়ে আমার মনে হয়েছে, ‘রাজনৈতিক নেতৃত্বের’ বিশালত্বকে অনুধাবন করার মত শব্দ, ভাষা এখানে অনুপস্থিত। যথেষ্ট সঠিক শব্দের এই অনুপস্থিতি কি ইচ্ছাকৃত কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত? নাকি অসাবধানতায়? বলা যেত যে, ‘ইউএনওর বাসায় হামলা চালানো দুর্বৃত্তদের দমনে আইন তার নিজের গতিতে চলবে’। এটুকু বললেই কি যথেষ্ট হত না? ফুটেজ দেখে হামলাকারিদের গ্রেফতার করতে বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দপ্তরেও বড় বড় আমলারা আছেন। তাহলে বিবৃতির ভাষা কি তারা দেখেননি? দেখে থাকলে বিবৃতির ভাষা কি পরিবর্তিত হত? ‘রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত’ শব্দযুগল বিবৃতিতে ঠাঁই পেয়ে প্রকাশ পেল কিভাবে? কে ঢুকালো? এসোসিয়েশনের সভাপতি মহোদয় কি ভালো করে পড়ে সাইন করেছিলেন? ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত যাই হোক না কেন, ‘রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত’ শব্দযুগল ব্যবহারের মধ্য দিয়ে রাজনীতি, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এবং রাজনীতিবিদদের প্রতি এক ধরনের অনাস্থা, চরম আক্রোশ, চরমবিরোধী অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে।

একজন ইউএনওর বাসায় যখন ৫০ লাখ টাকা পাওয়া গেল, সারাদেশে যখন গৃহনির্মাণ কর্মসূচির অধীনে নির্মিত বেশ কিছু সংখ্যক গৃহ দুর্বল বৃষ্টিতেই ভেঙ্গে পড়ে গেল এবং মুজিব শতবর্ষে প্রধানমন্ত্রীর এত আগ্রহের একটি প্রকল্প নিয়ে যখন বিরোধীরা অপপ্রচারের সুযোগ পেল, জামালপুরের ডিসি কবির যখন মুখ দেখানোরও যোগ্যতা হারালেন, একজন ডিসি যখন সাংবাদিককে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করলেন তখন কিন্তু প্রশাসনিক সার্ভিস এসোসিয়েশন আত্মসমালোচনা করে এত কঠিন বিবৃতি দেয়নি। আদৌ বিবৃতি দিয়েছিল কি না মনে করতে পারছিনা। এখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি মিটিং করে বলে ‘আমলাতান্ত্রিক দুর্বৃত্ত’ তখন আপনারা যাবেন কোথায়? প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করে পুলিশ, আর্মি; রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ন্ত্রণ করেন রাষ্ট্র, পাবলিক। পুরো পাকিস্তান আর্মি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আশীর্বাদ পেয়েও বঙ্গবন্ধুর মত একজন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে পেরে উঠেনি।

আমরা কখনোই বলি না, কোনোদিন বলব না যে সব ইউএনও, ডিসি খারাপ। কারণ এটা বললে একটি বিশেষ পেশার মানুষের প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ পায়। এটা অসম্ভব। বরং অধিকাংশ ইউএনও, ডিসি দিনরাত পরিশ্রম করেন, পরিবারকে বঞ্চিত করে কাজ করেন। রাষ্ট্রীয় সুবিধা হয়ত বেশি পান, এটা নিয়ে আমরা অনেকে যৌক্তিক কারণে সোচ্চার। জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা কাজও অনেক করেন, অনেক চাপের মধ্যে কাজ করেন। প্রশাসনের অনেকেই করোনায় অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছেন। যদিও সব পেশার লোকেরাই কাজ করেন। আমরা তাদের কাজের প্রশংসা করে লেখালেখি করি।

কিন্তু দুর্নীতির বিষয় যখন আসে তখন একদম চুপ আর ন্যায়বিচারের প্রশ্ন আসলে অতিরিক্ত একাট্টা হয়ে অনিয়ন্ত্রিত ভাষায়, ‘রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত’-জাতীয় আত্মঘাতী শব্দের প্রয়োগ দেখে আমরা শঙ্কিত হই। রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাত ধরে, তাদের সাংগঠনিক তৎপরতায়, তাদের আত্মত্যাগেই বাংলাদেশ পেয়েছি আমরা। স্বাধীনতার পক্ষের প্রশাসনিক শীর্ষ কর্মকর্তা খুব বেশি ছিল কি? মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে শীর্ষ কর্মকর্তারা কয়জন মুক্তিযুদ্ধে গেছেন এটা বের করা খুব কঠিন কাজ নয় গবেষকদের জন্য। সরকারি সিংহভাগ শীর্ষ আমলা পাকিস্তান সরকারের প্রতি অনুগত থেকে দায়িত্ব পালন করেছে সেসময়।বাংলদেশের গৌরব, আমলাতন্ত্রের গৌরব, সর্বজন শ্রদ্ধেয় আকবর আলি খান এর একটি বক্তব্য এই প্রসঙ্গে খুব প্রাসঙ্গিক। দৈনিক সমকাল পত্রিকায় এপ্রিল ১৭, ২০২১ তারিখে প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন- “মুজিবনগর সরকারের আমলাতন্ত্রের সেই স্পিরিট স্বাধীন বাংলাদেশে ধরে রাখা গেল না কেন? আকবর আলি খান জবাব দিয়েছিলেন, “না পারার অনেক কারণ আছে। খুব কমসংখ্যক বাঙালি আমলাই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। ৮০ শতাংশ আমলা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের যখন আত্তীকরণ করা হলো, তারা স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য সংগ্রামের উত্তরাধিকার বহন করত না। এর ওপর ছিল ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে না পারা’।

বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতৃত্ব জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী স্টাইলে চলা আমলাতন্ত্রের ভূত তাড়াতে চেয়েছিলেন। এর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সরকারের আমলাদের একটা অংশ ভয়াবহ লবন সংকট সৃষ্টি করেছিল। এ বিষয়ে বিশিষ্ট সাংবাদিক আবেদ খানের একটি লেখা থেকে আমি উদ্ধৃতি দিচ্ছি। বাংলা ট্রিবিউন পত্রিকায় ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে লিখেছেন, “দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মহৎপ্রাণ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ সরকারের প্রতিটি দপ্তরে বহাল রেখেছিলেন পাকিস্তান সরকারের আমলাদের। সেই তাদের একাংশ চক্রান্তকারীদের সঙ্গে মিলিত হয়ে সরকারের অনেক কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিলম্বিত করে। ফলে সরকারের ভাবমূর্তি জনগণের কাছে কলঙ্কিত হয়। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ১৯৭৪ সালের লবণ সংকট। বঙ্গবন্ধু এ ব্যাপারে তদন্ত করতে গিয়ে জানতে পারলেন, রেল ওয়াগনের অভাবের অজুহাতে আমলারা চট্টগ্রাম থেকে লবণ আনতেন না, তাই লবণের দাম আকাশছোঁয়া। বঙ্গবন্ধু আমলাদের ওপর ভরসা না রেখে নিজ উদ্যোগে চট্টগ্রাম থেকে লবণ আনার ব্যবস্থা করেন। তিনি ওই লবণ আনার জন্য রেলের সব ওয়াগন রিকুইজিশন করেন। চট্টগ্রামের গুমাদজাত লবণ কয়েক দিনের মধ্যেই সারা দেশে সরবরাহের ব্যবস্থা করেন। ফলে লবণের দাম কমে যায়। কিন্তু এর আগেই যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। চক্রান্তকারীরা লবণের দুর্ভিক্ষকে তাদের কাজে লাগিয়ে নিয়েছে”।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান এক শ্রেণির দেশীয় আমলা, দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, সামরিক কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান, বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মোশতাক, জাসদ, জামাত, চৈনিক বামেরা মিলে দেশে ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি করলে জাতির পিতার খুনিরা পূর্ব-পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে ইতিহাসের জঘন্যতম রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটায়। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পরে আমলারা মোশতাক, জিয়া, এরশাদ, খালেদা সব সরকারের আমলে খুবই ‘পেশাদারিত্বের’ ভিত্তিতে ‘দায়িত্ব’ পালন করেছেন।

১/১১ এ যখন উর্দি পরিহিত কর্মকর্তারা প্রাধান্য বিস্তার করলেন তখনো তারা চুপচাপ দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব তথা শেখ হাসিনাসহ অনেক রাজনীতিবিদ, ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ, যুবলীগের অনেকের আত্মত্যাগের পথ বেয়েই বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রশাসনিক শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের কাছে আমার প্রশ্ন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়া কি আপনারা আজকে ডিসি, এসপি হতে পারতেন? এত শান শওকত হত? যে ছেলে বা মেয়েটি বিরোধীদলে রাজনীতি করেছে তাদের সবাইকি আপনাদের মত ভালো আছে? অথচ সম্পূর্ণ বিপরীত আদর্শের অনেকেই খুব ভালো আছেন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়া কি বাংলাদেশের উন্নয়ন বা অস্তিত্ব ধরে রাখা সম্ভব? দেশের একটি বিভাগীয় শহরের মেয়য়ের প্রতি অনুরক্ত একদল হামলাকারী কর্তৃক সংঘটিত একটা বিপদজনক অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এভাবে সরলীকৃত শব্দযুগল ‘রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত’ ব্যবহার করা সঠিক হয়েছে কি? বিরোধী দলে ছাত্রলীগ করেছেন বলে একটা বাড়তি সম্মান অনেক আমলা পান। আবার সরাসরি শিবির করা অনেকেই যে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন সে বিষয়টাও তো মাথায় রাখতে হবে। এটাও মাথায় রাখতে হবে যে, ছাত্রলীগ করা অনেকে পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কুশিলব হয়েছেন। সিরাজুল আলম খান, আ স ম আব্দুর রবসহ অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, বর্তমান ইউএনও নিজেই বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন।

এখন প্রশ্ন হল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যখন করোনার মত ভয়াবহ বিপদ মোকাবেলা করেও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে তখন এই ঘটনা থেকে চূড়ান্তঅর্থে লাভবান হবে কারা? মুজিব শতবর্ষের আগস্ট মাসে এই করোনা মহামারীতে কোনো পক্ষ কি শেখ হাসিনার দিকে তাকিয়ে নিজেদের সম্মান ও ক্ষমতার জায়গায় সামান্য ছাড় দিয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমস্যার সমাধান করতে পারতেন না? নিশ্চয় একদিনে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। ভুল কোথায় হচ্ছিল? কেন এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হল? কারা উস্কানি দিয়ে এই পর্যায়ে আনল?

এটা তদন্তে আমার মতে বাংলাদেশের আওয়ামীলীগ এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সৎ এমন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও শীর্ষ আমলাদের সমন্বয়ে একটা উচ্চ পর্যায়ের কমিটি করা উচিত। ভুলগুলো দ্রুত না সংশোধন করলে রাষ্ট্র-বিরোধীরা এর সুযোগ নিবে। রাষ্ট্র ও শেখ হাসিনা-বিরোধীদের একটা অংশ রাজনীতিবিদদের পক্ষ নেবে, আরেকটা অংশ আমলাদের পক্ষ নিবে। উস্কানি দিবে। যখনই উনুন গরম হবে তখন মাছ ভেজে খাবে। সুতরাং সাধু সাবধান।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)