চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বন্ধু মানুষের অদৃশ্য বিবেক

প্রতিটি মানুষের জন্যই প্রয়োজন অন্তত একজন ভালো বন্ধু। যার কাছে মনের সব কথা বলা যায় নির্দ্বিধায়। যার সাথে সব সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেয়া যায়। সুখের দিনে সেই তো পাশে থাকে, আবার দুঃখেও থাকে ছায়ার মতো।

একজন ভালো বন্ধু আসলে মানুষের অদৃশ্য বিবেকের মতো। কারণ সে ভালো কাজে উৎসাহ দেয়; আর খারাপ কাজে নিরুৎসাহিত করে সবসময়। বিশ্ব বন্ধু দিবসে সব বন্ধুকে শুভেচ্ছা।

বিজ্ঞাপন

বলা হয়ে থাকে ‘বন্ধু জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ’। আর সেই শ্রেষ্ঠ সম্পদের গুরুত্ব ও মর্ম উপলব্ধির জন্যই পৃথিবীব্যাপী পালিত হয় বন্ধু দিবস। এর শুরুটা ছিল ১৯১৯ সালে। সে বছর প্রথম বন্ধু দিবসের প্রচলন করেন ‘হলমার্ক কার্ডস’-এর প্রতিষ্ঠাতা জয়সি হল। পরবর্তীতে ১৯৩৫ সালে আমেরিকান সরকার আগস্টের প্রথম শনিবার এক ব্যক্তিকে হত্যা করে।

এর প্রতিবাদে ও শোকে পরের দিন ওই ব্যক্তির এক কাছের বন্ধু আত্মহত্যা করেন। এরপরই বন্ধুদের ভালোবাসার প্রতি সম্মান জানানোর জন্য আমেরিকান কংগ্রেসে ১৯৩৫ সালে আগস্টের প্রথম রবিবারকে বন্ধু দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।

এর পর থেকেই প্রতি বছর আগস্টের প্রথম রবিবার বিশ্বব্যাপী বন্ধু দিবস বা ফ্রেন্ডশিপ ডে পালিত হয়। বন্ধু দিবসের ইতিহাস সম্পর্কে আরও জানা যায়, প্রাচীনকালে মানুষের জীবনযাত্রা ছিলো খুবই কঠিন। ক্রমান্বয়ে মানুষ আবিস্কার করে আগুন, চাকা, নানা ধরনের অস্ত্রসহ আরও কত কিছু…। খাবারের জন্য পশু শিকার করতে হয়েছে।

আবার হিংস্র পশুর হাত থেকে বাচাঁর জন্যে যুদ্ধও করতে হয়েছে। এতসব বিপদের মাঝে তারা একটা জিনিস খুব ভালো করে বুঝতে পেরেছে যে মানুষকে বেঁচে থাকতে হলে, ভালোভাবে বাঁচতে হলে একসঙ্গে থাকতে হবে। তাই তারা নিজেরা ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করে। তাদের মধ্যে ভাবের বিনিময় হয়। একে অপরের প্রয়োজনে, বিপদে আপদে, দুঃখে কষ্টে যেমন এগিয়ে আসতে শুরু করে তেমনি আনন্দটাও উপভোগ করতে থাকে একসাথেই। আর তখনই সবার মাঝে গড়ে ওঠে একটা সম্পর্ক। যে সম্পর্কের নাম বন্ধুত্ব।

প্রথমদিকে আমেরিকাতেই শুধু উদযাপিত হত বন্ধুত্ব দিবস। আস্তে আস্তে অন্য দেশগুলোতে, এরপর সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে বন্ধু দিবসের ধারণা। সেই স্রোত এসেছে আমাদের দেশেও। আমাদের দেশেও এখন সমান্তরালে প্রতিবছরই পালন করা হয় এই দিবস। কথায় বলে বিদেশী ভাষার বুলি, দেশি ভাষায় গালি। বাংলাভাষায় বন্ধু শব্দের কিছু বিদেশি প্রতিশব্দ রয়েছে। বাঙ্গালি জাতি বৈচিত্র প্রেমী। ভাষাগত এই বৈচিত্রও হয়তো কারো কারো কাছে আকষর্ণীয় হয়ে উঠতে পারে।

শুধু পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশেই নয়, বরং বাংলাদেশসহ এশিয়ার অনেক দেশেও প্রতিবছর আগস্ট মাসের প্রথম রবিবারকে উদযাপন করা হয় বন্ধু দিবস উপলক্ষ্যে। বন্ধু কিংবা বন্ধুত্বের মতো সম্পর্কের সঙ্গে মানুষের পরিচয় যুগ-যুগান্তরের হলেও বন্ধুত্ব দিবসের মতো কেতাবী উদযাপন কিন্তু এখনো শতবর্ষও পেরোয়নি। বরং কাগজে কলমে প্রায় ৭৭ বছর আর আনুষ্ঠানিকতার দিক থেকে মাত্র দুই আড়াই দশক হলো জাঁকালোভাবে উদযাপন হচ্ছে বন্ধু দিবস।

১৯৯৭ সালে জাতিসংঘ বিশ্বময় বন্ধুত্বের আলাদা অবস্থানে নিজেদের নিয়ে যায়। সে বছরটিতে জাতিসংঘ বিখ্যাত কার্টুন চরিত্র উইনি দ্যা পুহকে বন্ধুত্বের বিশ্বদূত হিসেবে নির্বাচিত করে। বন্ধু দিবসের এই বিশ্বদূত ছাড়াও বন্ধুত্ব দিবসের সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে আছে হলুদ গোলাপ আর ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ডের মতো বিষয়গুলোও।

বিজ্ঞাপন

মজার বিষয় হলো, এই ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ডের ধারণাটিও এসেছে আমেরিকা থেকেই। আমেরিকার আদিবাসীদের মধ্যে অনেক আগে থেকেই বন্ধুত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ ব্যান্ড দেয়ার এই রীতি চালু আছে। তারা তাদের বন্ধুদের জন্য ব্যান্ড তৈরি করে। আর যাকে ব্যান্ড দেয়া হয়, সেও কখনোই ব্যান্ডটি খোলে না।

আবার বন্ধুত্বের প্রতীক যে হলুদ গোলাপ সেই হলুদ রং হলো আনন্দের প্রতীক। আর হলুদ গোলাপ মানে শুধু আনন্দই নয়, প্রতিশ্রুতিও। কাজেই বন্ধুত্বের মাঝে যেন আনন্দের পাশাপাশি থাকে প্রতিশ্রুতিও সেই কথাটিই যেন মনে করিয়ে দেয় এই বন্ধু দিবস।

‘বন্ধু’ শব্দটিকে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় বিবিধভাবে বলা সম্বোধন করা হয়। যেমন:- আলবেনিয়া- মিল্ক, আফ্রিকা- ভ্রেন্ড, চীন- পেনজিউ, ডাচ- ভ্রেন্ড, ভ্রেঞ্জ, ডেনিশ- ভেন, ফ্রেঞ্চ- আমি, জার্মানী ফ্রিউন্ড, জর্জিয়ান- মেগোবারি, হাংগেরিয়ান – বারাট, হিন্দি- দোস, ইটালিয়ান- আমিকো, আইরিশ- কারা, জাপানি- টমোডাচি, কোরিয়ান- জিঙ্গু, ল্যাটিন-আ্যামিকাস, রাশিয়ান- প্রিজাটেল, সংস্কৃত- মিত্রা, স্পেনিশ – আমিগো।

বর্তমান সময়ে পুরো পৃথিবীটাই একটি সমাজে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তির কল্যাণে গোটা বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়। আর তাই বন্ধুত্ব ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশে। এখন ঘরে বসে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যে কোনো দেশের মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করা যায় অনায়াসে।

ব্যস্ততার জন্য এখন ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেকের সাথেই যোগাযোগ রক্ষা করা যায় না। তবে তাই বলে বন্ধুদের প্রতি ভালোবাসা কিন্তু কমে যায় না। বন্ধুতো একদিনের জন্য নয়।

বন্ধু হচ্ছে সারা জীবনের পথ চলার অনুপ্রেরণা। শুধু বড় বড় দেশগুলোও নয় আমাদের দেশেও পালিত হয় বন্ধুত্ব দিবস। তবে এখনও সীমিত আকারেই রয়েছেই এটি। ব্যক্তিগত পর্যায়ে এসএমএস আদান প্রদান, কার্ড আদান প্রদান, বই বা অন্য কোন উপহার বিনিময় করতে দেখা যায় বেশ।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বেশ কিছু রেস্তোরা এ উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন করে থাকে। আবার কিছু বিপনী বিতানে বিভিন্ন পণ্যের উপর বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়। মূলত তরুণদের মধ্যেই এই সংস্কৃতির লালন বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশের ছোট বড় সব শহরের তরুণরা এই দিনে তাদের বন্ধুদের শুভেচ্ছা বিনিময় করে থাকে।

একজন বিখ্যাত মনীষী বলেছিলেন, “আত্মীয়-স্বজন জন্মসূত্রেই পাওয়া যায়, কিন্তু বন্ধু বেছে নেওয়ার সুযোগ আছে, এজন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।” সত্যিই কোন রকম রক্ত সম্পর্কের না হওয়া সত্ত্বেও একজন মানুষ আরেকজন মানুষের এতো আপন হতে পারে এবং নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে পারে সেটা একজন সত্যিকার বন্ধুর মাধ্যমেই উপলদ্ধি করা যায়।

তাই একজন ভালো বন্ধু পাওয়া এবং কারও ভালো বন্ধু হওয়া মানে অনেক বড় অর্জন। আমাদের সকলের মাঝে যেন বন্ধুত্ব চির সবুজ এবং সতেজ থাকুক সারা বেলা, সারা জীবন…।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View