চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বনলতা সেনের বাড়িতে!

বনলতা সেনের জন্য আমার অপেক্ষা চিরকালের। সেই কবে যেন বুকের গভীরে ঠাঁই নিয়েছে রহস্যময়ী এই মানবী। তাকে কখনও ভুলতে পারি নি। এবার যখন তার নিবাসে যাই, এখন তো আর তার দেখা পাওয়ার কথা নয়, তবুও কেন যেন সারাক্ষণই মনজুড়ে ছিলেন মোহময়ী এই নারী।

‘অন্ধকার বিদিশার নিশা’র মতো তার চুল আর ‘শ্রাবস্তীর কারুকার্য’-র মতো তার মুখ খুঁজেছি নিরন্তন। আমার কেন যেন মনে হয়েছে, মানুষের মনে কত কিছু যে উদয় হয়, নাটোরের রাজবাড়ির সঙ্গে কোনোভাবে হয়তো তিনি সম্পৃত্ত ছিলেন। এমন মনে হওয়ার যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ নেই, নাটোর যাওয়ার পর এ রকম খুব বেশি মনে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

জীবনানন্দ দাশ কি কখনো নাটোরের রাজবাড়ি গিয়েছিলেন? সেখানে তার সঙ্গে কি দেখা হয়েছিল বনলতা সেনের? এ প্রশ্নটি মনের মধ্যে হরদম ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রিয়তমা মানসীর জন্মস্থানে এবারই প্রথম পা দেওয়ার পর কানের কাছে কে যেন ফিসফিস করে বলেন, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’ আসলেই তো, কেন এত দিন পর এলাম?

বগুড়া সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় হাতের বাঁ পাশে গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে দূর থেকেই উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে দীঘাপতিয়া রাজবাড়ির সিংহদ্বার। কার্তিকের সকালেও ঝলসানো রোদ। রোদ একটু সইয়ে নেওয়ার পর ফটকের সাদা-হলুদ-লালচে রঙ, নকশা ও স্থাপত্যশৈলী সহজেই নজর কেড়ে নেয়। চারতলা ফটকের কপালে টিপ হয়ে শোভাবর্ধন করছে পাথরের একটি ঘড়ি। ঘড়িটি এখনও সময় দিয়ে চলেছে। নিজের ঘড়ির সঙ্গে সময় মিলিয়ে দেখলাম, একটুও হেরফের নেই। ঘড়িটি আনা হয় ইংল্যান্ড কিংবা ইতালির ফ্লোরেন্স থেকে। ঘড়ির পাশে আছে একটি ঘণ্টা। একসময় এই ঘণ্টাধ্বনি অনেক দূর থেকে শোনা যেত। এই তোরণে আছে প্রহরীদের থাকার সুব্যবস্থা। প্রবেশ দুয়ার দেখেই অনুধাবন করা যায় রাজপ্রাসাদের জেল্লা ও জৌলুশ। 5

নাটোরের রানি ভবানীর কাছ থেকে উপহার পাওয়া দীঘাপতিয়া জমিদারীতে রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন রাজা দয়ারাম রায়। ১৭৩৪ সালে তিনি নির্মাণ করেন এ প্রাসাদ। বংশ পরম্পরায় চলতে থাকে রাজত্ব। কিন্তু ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে এই রাজবাড়ি অনেকটা ধসে পড়ে। এরপর প্রায় ৪২ একর জমির উপর এটি পুনঃনির্মাণ করেন রাজবংশের ষষ্ঠ রাজা প্রমদানাথ রায়। তিনি মনের মাধুরী মিশিয়ে গড়ে তোলেন রাজসিক বাগানবাড়ি। এ কাজে নিয়োজিত ছিলেন বিদেশি প্রকৌশলী, চিত্রশিল্পী আর দেশীয় মিস্ত্রিরা।

সেই সময় তো বটেই, এই সময়েও তার নান্দনিক সৌন্দর্য একটুও ম্লান হয় নি। রাজবাড়ির নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ছিল অত্যন্ত কড়াকড়ি। তবে তাতেও ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আচ্ছাদন। কেউ যাতে সহজে ভিতরে অনুপ্রবেশ করতে না পারেন, সেজন্য উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রাখা হয়। পাঁচিলের পাশে সারি সারি গাছ। এরপরই পুরো রাজবাড়ি এলাকা হ্রদ দিয়ে পরিবেষ্টিত। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে এটি ছিল নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। রাজপ্রাসাদের ঢোকার মুখে রাস্তার দু’পাশে সুুউচ্চ পাম গাছের সারি। ডানে-বাঁয়ে পরিখা। তাতে টলমল করছে জল। ফুটে আছে পদ্মফুল।

ভিতরে ঢুকে সোজা পশ্চিম দিকে কিছুটা হাঁটার পর সবুজে ঘেরা প্রধান রাজবাড়ি। আছে রকমারি ফুলের বাহার। তারমাঝে নিশ্চল হয়ে আছে রাজা দয়ারামের আবক্ষ মূর্তি। মার্বেল পাথরের এই ভাস্কর্যটি সবাইকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য চুপচাপ বসে আছে। বাড়িটির স্থাপত্যশৈলী ও সৌকর্যে প্রতিফলন ঘটে এর আভিজাত্য ও বনেদিয়ানা। অলিন্দ ঘেরা একতলা বাড়ি। খোলামেলা। তিন দিকেই বারান্দা। তবে অনুমতি না থাকায় রাজবাড়ির একদম অন্দরমহলে যাওয়া যায় নি। তবে ফাঁক-ফোকড় দিয়ে ভিতরটা কিছুটা হলেও দেখতে পাওয়া যায়। বড় একটি হল ঘর। এছাড়া আছে বেশ কয়েকটি কক্ষ। দামি আসবাব দিয়ে সাজানো। আবসবাবপত্র ইতালি থেকে আনা হয়। দক্ষিণে ঢাউস আকারের স্তম্ভযুক্ত বারান্দা। ছাদে ওঠার জন্য আছে পেঁচানো সিঁড়ি। তবে সিঁড়িটি এখন আর ব্যবহৃত হয় না। 6

বিজ্ঞাপন

রাজবাড়ির পেছনেও কারুকার্যময় প্রশস্ত চাতাল। ফুলের টব দিয়ে সুসজ্জিত। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে গেছে নিটোল হ্রদ। মুগ্ধকর এ জলাশয়ের পাড়ে সারি সারি পাম গাছ। তাতে তৈরি হয়েছে সবুজের নিবিড় বেষ্টনী। বারান্দা থেকে নেমে গেছে শানবাঁধানো সিঁড়ি। চাইলে টুপ করে হ্রদে নেমে জলকেলি করা যায়। জোছনা রাতে কিংবা বসন্তের মাতাল সমীরণে বারান্দার এমন পরিবেশে মনের মধ্যে কী রকম দোলা দিয়ে যায়, সে অভিজ্ঞতা আমার হয় নি।

দক্ষিণ পাশে সুদৃশ্য ও মনোরম উদ্যান। এটি পরিচিত ‘ইতালিয়ান গার্ডেন’ নামে। সুসজ্জিত প্রাচীন ও দুর্লভ সব গাছগাছালি। কোনোটা ফলজ। কোনোটা ঔষধি বৃক্ষ। পারিজাত, কর্পূর, সৌরভী, এগপ্ল্যান্ট, হোয়াইট পয়েনসেত্তিয়া, হোয়াইট এলিসন, মালতীলতা, শঙ্কচক্র, গোদাপদ্ম, হরীতকী, হাপাবমালি, রাজ-অশোক, রঙ্গন, নাগেশ্বর চম্পা, সাইকাস পাম, যষ্ঠিমধু, মাধবী, তারাঝরা, নীলমণিলতা, হৈমন্তী ইত্যাদি। এর অধিকাংশ গাছই সচরাচর দেখা যায় না। বাহারি পাতা আর রঙিন ফুলের সৌরভে হয়ে ওঠেছে যেন নন্দনকানন। বাগানে আছে বসার বেঞ্চ। রাজপ্রাসাদ সংলগ্ন স্বর্গের মতো এ বাগানে আছে অত্যাধুনিক  কৃত্রিম ঝরনাধারা।

বাগানের শোভা বাড়িয়ে দিয়েছে অসাধারণ কিছু ভাস্কর্য। গ্রিক স্টাইলে নির্মিত। কিছু ভাস্কর্য কালো এবং লোহা দিয়ে তৈরি। ছিপ হাতে কালো রঙের মার্বেল পাথরের ভাস্কর্যটি মন কেড়ে নেয়। শ্বেত পাথরে গড়া মা-সন্তান কিংবা সুন্দরীতমাদের অপরূপ সব ভঙ্গিমা। সব ইতালিয়ান মার্বেল পাথরে গড়া। হাত ভাঙা একটি স্থাপত্য দেখে মন খারাপ হয়ে যায়। এটি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সৈন্যদের কীর্তি। বাগানের এক কোনায় আছে কাঠের ‘টি-হাউস’। বিকেলে সেখানে বসে রানি চা পান করতে করতে উপভোগ করতেন প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী। রাজবাড়ির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে কবিতার বীজ। আর সেখানে যদি ঘটনাক্রমে দেখা হয়ে যায় বনলতা সেনের সঙ্গে, তাহলে জীবনানন্দ দাশের মতো জাতকবি হলে অমর সব পংক্তি না লিখে কি পারা যায়?

রাজবাড়িতে আছে দোতলা ‘কুমার প্যালেস’। এটি তহশিল অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হতো। নিচ তলায় অন্ধ কুঠুরি। তাতে ছিল কারাগার ও টর্চার সেল। খাজাঞ্জিখানা, হোলিখেলা, দোলমঞ্চের আকর্ষণের কমতি নেই। আছে কাচারি ভবন, রান্নাঘর, ট্রেজারি বিল্ডিং, মোটর গ্যারেজ, স্টাফ কোয়ার্টার, সেন্ট্রিবক্স ইত্যাদি। আছে বিভিন্ন নামের পুকুর। সামনে শোভা হয়ে আছে ব্রিটিশদের নির্মিত একাধিক কামান। রাজপ্রসাদের সামনে বড় একটি শুভ্র রোয়াক। চারপাশে ডিজাইন করা দেয়াল। এ চত্বরে বসতো বৈকালীন আড্ডা। সেই কত কাল আগে নির্মিত রাজপ্রাসাদটিতে সংমিশ্রণ ঘটেছে রুচি, সৌন্দর্য আর অঢেল ঐশ্বর্যের। এ কারণে এটি এখনও অভিভূত করে পর্যটকদের। 7

সেই সময় বিভিন্ন শিক্ষা, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, উন্নয়নমূলক কাজে নাটোরের রাজবাড়ির যথেষ্ট অবদান রয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় অবিভক্ত ভারতে ক্রিকেট খেলাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ নাথ। কলকাতার বালিগঞ্জে ৪৫ বিঘা জমি কিনে সুরম্য বাগানবাড়ি ছাড়াও গড়ে তোলেন ক্রিকেট মাঠ ও প্যাভিলিয়ন। ১৯০১ সালে গঠন করেন ‘নাটোর ইলেভেন টিম’। শুধু ভারতীয় খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত এ দলের অধিনায়ক ছিলেন মহারাজা নিজে। দীঘাপতিয়ার শেষ রাজা ছিলেন প্রতিভানাথ রায়।

দেশভাগের পর পাকিস্তান সরকার জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করলে ১৯৫২ সালে তিনি সপরিবারে কলকাতা চলে যান। ১৯৬৬ সালে রাজবাড়ি অধিগ্রহণ করে পাকিস্তান সরকার। ১৯৭২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি এটির নামকরণ করা হয় ‘উত্তরা গণভবন’। বর্তমানে রাজবাড়িটি রয়েছে জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে। রাজপ্রাসাদের পুরো সীমানায় আছে যত্ম ও পরিচর্যার ছাপ। 3

নাটোরে যাব, আর বিখ্যাত কাঁচা গোল্লার স্বাদ নেব না, তা কি হয়? এর সোয়াদ নিয়ে ফিরে আসার সময় মনে হতে থাকে, কোনো এক শীতার্ত সন্ধ্যায় এ রাজবাড়িতে অবস্থান করলে হয়তো অনুভব করা যাবে জীবনানন্দীয় অভিজ্ঞতা : ‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মত/সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;/পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পান্ডুলিপি করে আয়োজন/তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;/সব পাখি ঘরে আসে-সব নদী ফুরায় এ জীবনের লেনদেন;/থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’ এমন এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য নাটোরের রাজবাড়ি যেন সাজিয়ে রেখেছে হরেক রকম পসরা। তবে অন্ধকারে মুখোমুখি বসার জন্য নেই কোনো বনলতা সেন।