চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বড় অভিনেতা হিসেবে তাঁর কোনো ইগো ছিল না: রোকেয়া প্রাচী

২০১৭ সালে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘ডুব’ চলচ্চিত্রে কাজ করেছিলেন সদ্য প্রয়াত অভিনেতা ইরফান খান…

২০১৭ সালে বাংলাদেশে মুক্তি পায় মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র ‘ডুব’। এরমধ্য দিয়ে প্রথমবার কোনো বাংলা ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন বলিউডের প্রখ্যাত অভিনেতা ইরফান খান। খুব সঙ্গত কারণেই ব্যাপক হইচই পড়ে যায়। চলচ্চিত্রে জাবেদ হাসান নামের একজন লেখকের ভূমিকায় অভিনয় করেন ইরফান। বলা হয়, সেই চরিত্রটি কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ছায়া অবলম্বনে! যেখানে লেখকের প্রথম স্ত্রী (গুলতেকিনের ছায়া অবলম্বনে) মায়ার চরিত্রে অভিনয় করেন দেশের মেধাবী অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী।  

সেইসব আলোচনা, সমালোচনা বহু আগেই ভুলে গেছে মানুষ। কিন্তু ইরফান খানের মৃত্যুতে আবার বাঙালি দর্শকের কাছে প্রসঙ্গ হয়ে উঠলো ‘ডুব’। বুধবার দুপুরে চ্যানেল আই অনলাইনকে এই অভিনেতার সঙ্গে কাজ করার সময়ের অভিজ্ঞতা শোনালেন রোকেয়া প্রাচী: 

অভিনেতা ইরফান খান মারা গেছেন, শুনেছেন নিশ্চয়?
হ্যাঁ, সকালেই শুনেছি! এরপর থেকেই মনটা কেমন বিষণ্ণ হয়ে আছে। একজন দারুণ অভিনেতা, যার সঙ্গে আমি কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম অথচ এতো অল্প বয়সেই তিনি চলে গেছেন। আরও কতো কী আমরা তাঁর কাছ থেকে পেতে পারতাম! এসব ভাবছিলাম। ফেসবুকে কিছু লিখতে চেয়েছিলাম, পরে ভাবলাম কী লিখবো! আসলে সমস্ত ভাবনা এই মুহূর্তে খুব এলোমেলো!

বিজ্ঞাপন

মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘ডুব’ এ ইরফানকে সহ-অভিনেতা হিসেবে পেয়েছিলেন। তাঁর সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কেমন ছিলো?
উনি অসম্ভব ভালো একজন অভিনেতা, এটা সবাই জানেন। একইসঙ্গে তিনি খুব ভাল একজন মানুষ ছিলেন। দায়িত্বশীল অভিনেতা বলতে যা ‍বোঝায়, উনি তাই ছিলেন। যার যেটা কাজ শতভাগ সামর্থ দিয়ে সেটাই করা উচিত, উনি সেটা বিশ্বাস করতেন এবং করতেন। পেশাদারিত্ব বলতে ‘কতো টাকা পারিশ্রমিক’ সেটাই আমরা বুঝি, কিন্তু ইরফান খানদের কাছে পেশাদারিত্বের সংজ্ঞা অন্যরকম। পেশা হিসেবে শিল্পীরা অভিনয়কে নেন কিন্তু পেশাদারিত্ব জিনিসটা বুঝেন না বা প্রদর্শন করেন না। এই প্রবণতা শুধু আমাদের মধ্যে না, অনেক জায়গাতেই আছে। কিন্তু ইরফান খান প্রকৃত অর্থে ছিলেন একজন পেশাদারী মনোভাবাপন্য অভিনেতা। খুবই দায়িত্বশীল একজন।

ইরফান খানের সঙ্গে আপনার কাজের অভিজ্ঞতা যদি জানতে চাই?
সহ-অভিনেতা হিসেবে উনার সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের পর থেকেই দারুণ অভিজ্ঞতা ছিলো। ‘ডুব’ এর পুরো জার্নিটা এত দুর্দান্ত ছিল আমাদের…! পুরো সময়টা দেখেছি উনি খুবই কনসাস থাকতেন। অভিনয় নিয়ে কনসাস থাকা মানে এই নয় আমি কি অ্যাক্টিং করছি! ‘ফুল অব প্রিপারেশন’, পারিপার্শ্বিকতা, এই মুহূর্তের সমাজ, গল্পে যে সময়ের কথা এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট জেনে বুঝে ধারণ করে তিনি অভিনয় করতেন। একজন অভিনেতা একটা স্ক্রিপ্ট পেল আর সেটা মুখস্থ করে অভিনয় করে ফেলল, ইরফান খানের বেলায় কিন্তু তা না। তাকে দেখেছি তিনি যে গ্রাউন্ডে কাজ করছেন তার সমস্ত কিছু জেনে বুঝে এবং সেগুলো ধারণ করে তারপর অভিনয়টা শুরু করেন। এগুলো একজন অভিনেতার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই চর্চাগুলো তাকে করতে দেখেছি।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘ডুব’ কতোটা সার্থকতা পেল এটা দর্শক ও সময়ই বলে দেবে। কিন্তু আমি বলব এই ছবির মধ্য দিয়ে ইরফান খানের মতো একজন অভিনেতা বাংলাদেশে এসেছিলেন, কাজ করেছেন। আমরা অনেকেই তার সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি, এটা আমাদের জন্য একটা বড় এক্সপেরিয়েন্স হয়ে থাকবে!

হ্যাঁ, তো বটেই…
যখন একটি প্রজেক্টে এমন একজন উচ্চ মানের এবং শিক্ষিত অভিনেতা থাকেন তার সাথে কাজ করাটা ভীষণ আনন্দের হয়ে যায়। যে অভিনেতা শুধু কস্টিউম পরে অভিনয় করছেন এবং তার মাঝখানে মাঝখানে ফেসবুকে ঢুঁ মারছেন বা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকছেন। অভিনয়ের প্রতি নিমগ্নতা নেই যার, সেরকম অভিনেতার সাথে কাজ করা এবং একজন নিমগ্ন অভিনেতার সাথে কাজ করার মধ্যে পার্থক্য আছে। কাজেই ইরফান খানের মতো এমন দুর্দান্ত অভিনেতার সাথে কাজ করে আমি ভীষণ তৃপ্ত, খুব আনন্দ পেয়েছি। তাঁর সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্য আর স্বস্তিবোধ নিয়ে কাজ করেছি।

অভিনয় তো স্পন্টেনিয়াস একটা এক্সপ্রেশন। একজন অভিনেতা যদি পরিণত হন শিক্ষিত হন তাহলে কাজটা খুব সহজ হয়ে যায়, উনার সাথে কাজ করে আমি এই আনন্দটা পেয়েছি। উনি একজন মারাত্মক পারফেকশনিস্ট ছিলেন, শট দিলাম আর হয়ে গেল ব্যাপারটা তা নয়। এই বিষয় তার মধ্যে ছিল না। নিজের শতভাগ দিতে চাইতেন, এবং চাইতেন ডিরেক্টর এবং ক্যামেরাপার্সন সহ সব বিভাগের শতভাগ নিশ্চিত হোক।

তারমানে বড় অভিনেতাদের সচরাচর যে ইগো দেখা যায়, সেটা উনার কম ছিলো?
বড় অভিনেতা হিসেবে উনার কোনো ইগো ছিল না। আমি দেখেছি, উনি যে মানের অভিনেতা ইগো তো দূরে থাক বরং উল্টো আমি ওনার কাছ থেকে রেসপেক্ট পেয়েছি। বিশেষ করে যখন তিনি শুনেছেন আমি অভিনয়ের পাশাপাশি রাজনীতিও করি। আমার কাছে এই সময়ের রাজনীতি সম্পর্কে তিনি জানতে চাইতেন। বাংলাদেশ নিয়ে কথা হতো।

কাজের সম্পর্কের বাইরে নিশ্চয় ব্যক্তি ইরফানকেও চিনেছেন?
রাজনীতি সচেতন আধুনিক মানুষ ছিলেন ইরফান খান। দেশ জাতি এই মুহূর্তের বিশ্ব রাজনীতি সমস্ত কিছু নিয়ে আমরা কথা বলতে পারতাম ওনার সাথে। উনি জানতে চাইতেন বাংলাদেশ সম্পর্কে, আমাদের সমাজ আমাদের রাজনীতি এখানকার প্রেক্ষাপট নিয়ে উনার ব্যাপক আগ্রহ দেখেছি শুটিংয়ের সময়। এগুলো নিয়ে আমাদের মধ্যে কথা হতো, আর এসব কথা হওয়ার মধ্য দিয়ে কিন্তু কাজটা আরো বেশি আনন্দদায়ক হয়ে উঠেছিল। আর উনি তো এমনিতেই প্রফেশনালি স্কিলড একজন অভিনেতা, এমন একজন অভিনেতার সাথে কাজ করলে অনেক কিছু শেখা যায়। দেখেছি, উনার কনসেপ্ট খুব ক্লিয়ার! কারণ তিনি যা করতেন, তা তিনি জেনে বুঝেই করতেন!