চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বঙ্গভবনে জেনারেল মইনের শ্বাসরুদ্ধকর ৪ ঘণ্টা

দেশে জরুরি অবস্থা জারি হওয়া এক এগারো বা ওয়ান ইলেভেন নামে পরিচিত ২০০৭ সালের এ দিনটিতে সন্ধ্যা ৬টার দিকে বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে আসেন সেসময়ের সেনা প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মইন ইউ আহমেদ। ততোক্ষণে জরুরি অবস্থা জারি করতে রাজি হয়েছেন রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান উপদেষ্টা ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। তার আগে অবশ্য সেনা প্রধান এবং তার সঙ্গে যাওয়া অন্য সেনা কর্মকর্তাদের বঙ্গভবনের ভেতরে শ্বাসরুদ্ধকর সময় কাটাতে হয়। এমনকি মৃত্যুর আশঙ্কাও করেছিলেন জেনারেল মইন।

‘আমি জানতাম হতে পারে এ যাত্রাই সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে আমার শেষ যাত্রা, কিংবা কে জানে হয়তো জীবনের শেষ যাত্রা।’ এভাবেই সেসময়ের কঠিন অবস্থা বর্ণনা করেছেন ওয়ান ইলেভেনের মূল কারিগর জেনারেল মইন ইউ আহমেদ।

বিজ্ঞাপন

২০০৯ সালে প্রকাশিত তার ‘শান্তির স্বপ্নে’ বইয়ে তিনি লিখেছেন যে তিনি জানতেন, তিনি এমন কিছু প্রস্তাব নিয়ে যাচ্ছিলেন, যার কারণে তৎক্ষণাৎ রাষ্ট্রপতি তাদের বরখাস্ত করতে পারেন, গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিতে পারেন, এমনকি হত্যার নির্দেশও দিতে পারেন। রাষ্ট্রপতির নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন: তারা সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য হলেও তাদের কর্মপদ্ধতি ভিন্ন। বঙ্গভবনে তাদের কাছে প্রেসিডেন্টই একমাত্র ভিভিআইপি যাকে রক্ষা করতে তারা নিয়োজিত।

সেসময়ের অবস্থা উল্লেখ করে তিনি আরো লিখেছেন: এমনকি প্রেসিডেন্টের জীবনের উপর হুমকি মনে করলে তারা যে কাউকে হত্যা করতে পারে। পিজিআর কিংবা এসএসএফ, সেনাবাহিনী কিংবা অন্য কোনো বাহিনীর চেইন অব কমান্ডের আওতাধীন নয়। এমন নিরাপত্তা বলয়ে আমরা কজন যাচ্ছি সম্পূর্ণ নিরস্ত্র অবস্থায়। বঙ্গভবনে রওয়ানা হওয়ার আগে তাই তিনি মেজর জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়াকে বলেছিলেন, ‘আমি না ফিরলে পরবর্তী পরিস্থিতি সিজিএস হিসেবে প্রাথমিকভাবে তাকেই সামাল দিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

‘শান্তির স্বপ্নে’ নামের বইয়ে জেনারেল মইন লিখেছেন: তিনিসহ সশস্ত্র বাহিনীর অন্যান্য প্রধান ও ডিজিএফআইয়ের একজন শীর্ষ কর্তা সেদিন প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিনকে পরিস্থিতি বোঝানোর জন্য বেলা আড়াইটার দিকে বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন। ভেতরে গিয়ে জানতে পারেন, প্রেসিডেন্ট দুপুরের খাবার খাচ্ছেন। ঘণ্টা দেড়েক অপেক্ষা করর পর প্রেসিডেন্টের দেখা পান তারা। প্রেসিডেন্টকে তারা ভয়ানক পরিস্থিতি থেকে দেশকে রক্ষা করতে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানালে প্রেসিডেন্ট তা ভেবে দেখার জন্য সময় চান।

জেনারেল মইন এবং অন্যরা অবশ্য পরিস্থিতি বিবেচনায় কোনো সময় দিতে চাননি। কারণ হিসেবে তিনি লিখেছেন: আমি জানতাম ইতোপূর্বে উপদেষ্টা পরিষদের অনেক ইতিবাচক সিদ্ধান্ত অজানা কোন কারণে ও প্রভাবে পরিবর্তন হয়ে গেছে। যার কারণে আমরা কোনো দুষ্টুচক্রকে আবার নতুন কোনো খেলা শুরু করার সুযোগ দিতে চাচ্ছিলাম না। কক্ষে নেমে এলো সুনসান নীরবতা…… আমার মনে হলো আমাদের চোখ দিয়ে পুরো দেশ যেন তাকিয়ে আছে প্রেসিডেন্টের দিকে।

অনেকক্ষণ ওইরকম সুনসান নীরবতার পর প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ জরুরি অবস্থা জারির পক্ষে মত দেন। একইসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে উপদেষ্টা পরিষদ ভেঙে দেবেন বলেও জানান ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ।

সবকিছু ঠিকঠাক হওয়ার পর সন্ধ্যা ৬টার দিকে জেনারেল মইন বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে আসেন। বেরিয়ে যাবার সময় বঙ্গভবনের প্রধান ফটকে কয়েকজন সাংবাদিক তার সঙ্গে কথাও বলেন। তিনি তাদের জানান, দেশে জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে, সিভিল ড্রেসে থাকার তাকে তেমন কেউ চিনতে পারেননি।

পরে গভীর রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ জরুরি অবস্থা জারির ঘোষণা দেন।