চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধু, নদ-নদী-নৌপথ ও নৌ পরিবহন ব্যবস্থা

পাঠক মহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তো একজন সফল রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রনায়ক, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি এবং সর্বোপরি বিশ্বনন্দিত গণমাধ্যম বিবিসির জরিপে ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’। তাহলে এ দেশের নদ-নদী ও নৌ পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে কালজয়ী এ মহানায়কের কী সম্পর্ক? পাঠকদের মাঝে বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের পাঠকদের মনে এমন প্রশ্ন জাগা মোটেও অবান্তর নয়।

কারণ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ এখনও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে সবিস্তারে জানেন না। আবার আমাদের মতো মধ্যবয়সী বা পঞ্চাশোর্ধ্বরাও অনেকে বাংলাদেশের নদী ও নৌ চলাচলের গৌরবোজ্জ্বল অতীতের সুফল ভোগ করতে পারেননি। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের বিয়োগান্ত ঘটনা অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত করেছিল। এর মধ্য দিয়ে আমাদের নদ-নদী ও নৌ পরিবহন ব্যবস্থাকে বিপন্ন করে তোলা হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, বাঙালিসহ এ ভূখণ্ডের সকল জাতি-গোষ্ঠীর মানুষের আত্মপরিচয়ের মূলে রয়েছে নদী। ১৯৭১ এর স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময় ও স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেও এ দেশের সাধারণ জনগণের স্লোগান ছিল- ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’। অর্থাৎ দেশের অন্যতম তিনটি বৃহত্তম নদীর মাঝেই আমাদের পরিচিতি তুলে ধরা হয়েছিল। প্রতীকী অর্থে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার নাম ব্যবহার করা হলেও প্রকৃত অর্থে এ স্লোগানের মধ্য দিয়ে সকল নদীকেই বোঝানো হয়েছে।

এখানে আরেকটি বিষয় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শেষ পর্যায়ে বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান লেখক অন্নদাশঙ্কর রায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন। কবিতার চরণ চারটি নিম্নরূপ:
‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান
ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।
দিকে দিকে আজ অশ্রুমালা রক্তগঙ্গা বহমান
তবু নাই ভয় হবে হবে জয়, জয় মুজিবুর রহমান।’

অন্নদাশঙ্কর রায় কবিতাটি লিখেছিলেন ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বরের ‘কিছুদিন আগে কী পরে’। এ সম্পর্কে অন্নদাশঙ্কর রায় স্মৃতিচারণা করেছেন, ‘তারিখটা ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ভারত দিয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের স্বীকৃতি। আমরা ক’জন সাহিত্যিক যাচ্ছি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধান পুরুষদের অভিনন্দন জানাতে মুজিবনগরে।…

‘শেখ মুজিবুর রহমান যদিও মুজিবনগর সরকারের শীর্ষে ছিলেন, তবু তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎকার মুজিবনগরে গিয়ে সম্ভব হলো না। কারণ তিনি ছিলেন পাকিস্তানে কারাবন্দী। সেদিন মুজিবনগর থেকে ফিরে আসি তাঁর জন্যে ভয়-ভাবনা ও প্রার্থনা নিয়ে। যুদ্ধ তখনো শেষ হয়নি, তার সবে আরম্ভ। যুদ্ধে হেরে গেলে পাকিস্তানিরা কি শেখ সাহেবকে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে দেবে? প্রতিশোধ নেবে না? এর মাস চার-পাঁচ আগে থেকেই তাঁর প্রাণ রক্ষার জন্যে আবেদন বিশ্বময় ধ্বনিত হয়েছিল। তার জন্যে কলকাতার ময়দানে আমরা সাহিত্যিকরাও জমা হয়েছিলুম। তার কিছুদিন আগে কি পরে আমি রচনা করি “যতকাল রবে…”।
[অন্নদাশঙ্কর রায়: কাঁদো প্রিয় দেশ, প্রথম বাংলাদেশ সংস্করণ, অন্বেষা, ঢাকা ২০১০, পৃষ্ঠা ৫৮-৬০]।

বিজ্ঞাপন

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর কবিতাটি অসাধারণ হয়ে ওঠে এবং এর তাৎপর্য নতুন করে পাঠকের কাছে ধরা পড়ে। বিশেষ করে, ‘ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান’ চরণটি অধিকতর বাঙময় হয়ে আসে। ১৯৭৬ সালের একুশকে সামনে রেখেই প্রতিবাদী গল্প-কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল। তবে ১৯৭৮ সালের একুশের সংকলন ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়’ সব মহলেই আলোড়ন সৃষ্টি করে। এতেই প্রথম প্রকাশিত হয় অন্নদাশঙ্কর রায়ের সেই চার লাইনের কবিতা আট লাইন হয়ে। শুধু তা-ই নয়, কবিতার শব্দও এতে পরিবর্তিত হয়ে যায়, এমনকি শব্দ আগপাছ হয়েও প্রকাশিত হয়। ১৯৭৮ সালের এ সংকলনে প্রকাশিত কবিতাটি নিম্নরূপ:
‘যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা
গৌরী যমুনা বহমান।
ততদিন রবে কীর্তি তোমার
শেখ মুজিবুর রহমান।
দিকে দিকে আজ অশ্রুগঙ্গা
রক্ত গঙ্গা বহমান
নাই নাই ভয় হবে হবে জয়
জয় মুজিবুর রহমান।’
[সূত্র: এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়, একুশের সংকলন, ঢাকা ১৯৭৮]।

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ যেমন পরস্পর অভিন্ন, তেমনি নদ-নদীসহ প্রাকৃতিক জলসম্পদ ও নৌ পরিবহন ব্যবস্থা এ দেশের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ; যার সঙ্গে মিশে আছেন কালের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ কারণেই হয়তো অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছিলেন, “যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা গৌরী যমুনা বহমান, ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।”

নদী ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সুখময় স্মৃতি যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বেদনার কাহিনীও। কুচক্রী মহল নদীপ্রেমী বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রেও নদীকে ব্যবহার করেছিল। দেশের অন্যতম বৃহত্তম নদ ব্রহ্মপুত্র ও চিলমারী বন্দর- পরস্পর অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ব্রহ্মপুত্রের যেমন ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে, তেমনি গুরুত্ব রয়েছে এই নদের তীরে গড়ে ওঠা ইতিহাসখ্যাত চিলমারী বন্দরেরও। ষড়যন্ত্রকারীরা ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় চিলমারী বন্দরের এক নারীকে ‘বাসন্তী’ নাম দিয়ে দৈনিক ইত্তেফাকের পাতায় ‘ক্ষুধা ও দারিদ্রের প্রতীক’ হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। ‘বস্ত্রাভাবে নগ্ন’ শরীরে মাছধরা জাল পেচিয়ে লজ্জা নিবারণের ছবি তৈরি করে তা পত্রিকায় ছাপিয়ে বিশ্ববিবেককে জাগ্রত করার অপচেষ্টা করা হয়েছিলো। যদিও পরবর্তী সময়ে প্রমাণিত হয়, কথিত দুর্ভিক্ষের প্রতীকী ছবিটি ছিলো কৃত্রিম। মূলত বঙ্গবন্ধু সরকারকে বিব্রত করতে, বিশ্ববাসীর কাছে তৎকালীন সরকারকে ‘ব্যর্থ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চিলমারী বন্দর এলাকার মানসিক প্রতিবন্ধি ভবঘুরে এক যুবতীকে অস্বাভাবিক পোশাক (মাছধরা জাল) পরিয়ে ছবিটি তোলা হয়েছিলো। [আশীষ কুমার দে: বাংলাদেশের নদ-নদী ও নৌ পরিবহন ব্যবস্থা, পৃষ্ঠা ৩৭-৩৮]।

তবে নদ-নদী নিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি শুধু কবিতায় সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর কর্মেও প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, নদীমাতৃক, কৃষিপ্রধান ও প্রাকৃতিক মৎস্যনির্ভর প্রিয় মাতৃভূমিকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে আত্মনির্ভরশীল করতে অমূল্য জলসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার অনস্বীকার্য। সেজন্য নদ-নদী সচল রাখা, নৌ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও উন্মুক্ত জলসম্পদ রক্ষা করা আবশ্যক। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনসহ নানা ঝুঁকি মোকাবেলায় শত ব্যস্ততা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নদী খননে মনোযোগী ছিলেন। এর প্রায় সাড়ে তিন দশক পর বাংলাদেশের বিলুপ্ত নদ-নদী ও নৌপথ পুনরুদ্ধার, নিয়মিত খনন ও পলি অপসারণের মাধ্যমে নদী ও নৌপথ রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের ঘোষণা দেন তাঁরই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বিষয়টি যুক্ত করেন তিনি। ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েই বিদেশ থেকে ড্রেজার আমদানির সিদ্ধান্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেন। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ড্রেজার ইতোমধ্যে আমদানি হয়েছে; যা দিয়ে চলছে নদী খনন ও পলি অপসারণের কাজ। শুধু তাই নয়, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার নৌ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি যুগান্তকারী পদক্ষেপও নিয়েছে সরকার।

নদ-নদীসহ প্রাকৃতিক জলসম্পদ রক্ষায় বঙ্গবন্ধুর পদক্ষেপ তর্কাতীতভাবেই প্রশংসনীয়। তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে এই অমূল্য সম্পদ রক্ষার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও ব্যয়সাশ্রয়ী নৌ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাও নিজের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও অকৃত্রিম দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View