চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র

আজ ১০ এপ্রিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র দিবস!

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্য রাত শেষে অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর, ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তারিখে মুজিবনগর সরকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করে।

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের একটি ঐতিহাসিক দলিল। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫০(১) অনুচ্ছেদ এবং চতুর্থ তফসিলে উল্লেখ করা হয়েছে যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বাংলাদেশের একটি ক্রান্তিকালীন অস্থায়ী বিধান হিসেবে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হবে।

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি এখন সম্পূর্ণ আকারে বাংলাদেশের সংবিধানে সংযুক্ত করা হয়েছে (পঞ্চম তফসিল)।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে সংবিধানের ৭(খ) অনুচ্ছেদ একটি মৌলিক কাঠামো রূপে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দান করেছে । এর ফলে ঘোষণাপত্রটি বাংলাদেশের সংবিধানের একটি অসংশোধনযোগ্য বিধানে পরিণত হয়েছে।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র কী?

মানুষ মাত্রই স্বাধীনতার পূজারী। ব্যক্তিমানুষের জীবনে স্বাধীনতার গুরুত্ব অপরিসীম। স্বাধীনতা ব্যক্তিমানুষকে পরিপূর্ণ করে তোলে। তবে স্বাধীনতা শুধু একজন ব্যক্তিমানুষের জীবনেই প্রয়োজনীয় তা কিন্তু নয়। ব্যক্তিমানুষের সমষ্টিগত জীবনেও স্বাধীনতা এক মূল্যবান ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই সমাজ, জাতি বা রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে স্বাধীনতার স্বাদ ব্যক্তিমানুষকে পরিপূর্ণতার এক অনন্য মার্গে উন্নীত করে।

স্বাধীনতা শব্দটির বহুমাত্রিক অন্তর্নিহিত তাৎপর্য রয়েছে। এ কারণে ভিন্ন ভিন্ন পরিসরে স্বাধীনতা শব্দটির তাৎপর্য বিভিন্নভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক অথবা ব্যক্তি ও বিবেকের স্বাধীনতা এর প্রত্যেকটি ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় এবং ভিন্ন ভিন্ন আলোকে স্বাধীনতা শব্দটিকে অর্থবহ করে তোলে। একই রকমভাবে রাষ্ট্রজীবনে স্বাধীনতা ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে এক নতুন মাত্রার সংযোজন করে।

একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র মূলতঃ সেই রাষ্ট্রের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য ও রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তিকে সুস্পষ্ট করে তোলে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র যে কোন রাষ্ট্রের জন্য একটি মহামূল্যবান দলিল। তবে প্রতিটি রাষ্ট্রের একটি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র থাকতে হবে ব্যাপারটি এমনও নয়। মূলতঃ যে সকল রাষ্ট্র পরাধীনতার শিকল ভেঙে স্বাধীনতা অর্জন করেছে তাদের জন্য এটি একটি অনন্য ঐতিহাসিক দলিল।

বিশ্বে প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণার দলিলের নজির পাওয়া যায় স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে। এটি DECLARATION OF ARBROATH নামে পরিচিত।

১৩২০ সালের ৬ এপ্রিল একটি চিঠির আকারে এই ঘোষণাপত্রটি স্বাক্ষরিত হয়। তবে উল্লেখযোগ্য যে, এই স্বাধীনতার দলিলটি মূলতঃ স্কটল্যান্ডের প্রশাসনিক স্বাধীনতার সূচনা করে, সার্বভৌম স্বাধীনতার যে স্বরূপ তা এখানে অনুপস্থিত।

১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই তারিখে প্রণীত আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণার দলিলটি বিশ্বের ইতিহাসে একটি নতুন মাইলফলকের সৃষ্টি করে। এই দলিলটির মাধ্যমে আমেরিকার ১৩টি উপনিবেশ অধ্যুষিত অঞ্চল তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করে। পরবর্তী পর্যায়ে বিশ্বের যে সকল রাষ্ট্র ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ থেকে নিজেদের স্বাধীন করতে সক্ষম হয়েছে তাদের জন্য আমেরিকার স্বাধীনতার দলিলটি একটি আন্তর্জাতিকভাবে অনুকরণীয় দলিলে পরিগণিত হয়।

১৭৭৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বে মোট ১২০টি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশ রাষ্ট্র তার স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি তৎকালীন মুজিবনগর সরকার জারি করে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি বিভিন্ন কারণে বিশ্বের ইতিহাসে ব্যতিক্রমী একটি ধারার জন্ম দেয়। বাংলাদেশ হলো বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্র যে নাকি সফলভাবে আত্মনিয়ন্ত্রণের আইনানুগ অধিকার প্রয়োগ করে একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে।

আর তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি একটি অনন্য ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে পরিগণিত।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের রূপরেখা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল তারিখে মুজিবনগরে ঘোষিত এবং জারিকৃত হয়। একজন ব্যক্তিমানুষ যেমন জন্মগতভাবে স্বাধীন, একটি জাতি গোষ্ঠীও তেমন স্বাধীনতার দাবিদার। এই মূল মন্ত্রটির বহিঃপ্রকাশই ঘটেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই তারিখে জারিকৃত যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের আদলে অনুপ্রাণিত। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি মূলতঃ একটি অনুকরণীয় মডেল যা নাকি বিশ্বে স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টির ক্ষেত্রে এক বিশাল প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়েছে।

১৭৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণার ১৩ বছর পরেই ১৭৮৯ সালে ফরাসী স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রে যদিও আমরা একই রকম স্বাধীনতাকামী চেতনার উন্মেষ দেখতে পাই, তবে ভাষাগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের এবং ফরাসী স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বেশ পার্থক্য রয়েছে।

তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি হবার পূর্বে বিশ্বের অন্যান্য অনেক নতুন রাষ্ট্রই তাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মডেল সরাসরিভাবে অনুকরণ করেছে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১৭৯০ সালের প্রভিন্স অব ফ্ল্যান্ডার্স-এর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, ১৮১১ সালের ভেনিজুয়েলার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, ১৮৪৭ সালের লাইবেরিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, ১৯৪৫ সালের ভিয়েতনামের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ইত্যাদি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটির বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, এতে মোট ৫টি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে।

প্রথম ভাগে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার ঐতিহাসিক কারণসমূহ বিধৃত হয়েছে। দ্বিতীয় ভাগে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তৃতীয়ভাগে, নতুন রাষ্ট্রের সরকারের রূপরেখার বিবরণ দেয়া হয়েছে। চতুর্থভাগে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপট উল্লেখিত হয়েছে। পঞ্চমভাগে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটির কার্যকর হবার তারিখ নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

প্রথম ভাগে উল্লেখ করা হয়েছে যে কেন, কি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্ম অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে। এই ভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চে ‘বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণার ব্যাপারটির সর্বজনবিদিত স্বীকৃতি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের প্রথম ভাগটিকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগনামা হিসেবেও চিহ্নিত করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রেও কিন্তু একইরকমভাবে রাজা তৃতীয় জর্জের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের অবতারণা করা হয়েছে।

এই ধরনের অভিযোগনামার অবতারণা করা স্বাধীনতাকামী নতুন রাষ্ট্রের জন্য আসলে খুব জরুরি। কেন জরুরি? কেননা যদি নতুন রাষ্ট্রটি তার স্বাধীনতা দাবির স্বপক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন না করতে পারে, তবে তাদের পদক্ষেপকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অপপ্রয়াস বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

ঔপনিবেশিক প্রভুর কর্তৃত্ব থেকে যখন কোন রাষ্ট্র তার স্বাধীনতা দাবি করে তখন ব্যাপারটি আন্তর্জাতিক বিষয় বলেই ধরে নেয়া হয়। কেননা ঔপনিবেশিক সম্পর্ক মূলতঃ ২টি রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ঘিরেই গড়ে ওঠে। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠিত, স্বীকৃত রাষ্ট্রের কোন আভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠী যখন ঐ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করে তখন ব্যাপারটি মূলতঃ ঐ রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ফলে ঐ জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতার দাবিকে আন্তর্জাতিক মহল বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বলে ধরে নেয় এবং দাবিকৃত নতুন রাষ্ট্রকে কখনই স্বীকৃতি দিতে চায় না। যেমন কাতাঙ্গা যখন ১৯৬০ সালে কঙ্গোর বিরুদ্ধে অথবা বায়াফ্রা যখন ১৯৬৭ সালে নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করে তখন তাদের স্বাধীনতা ঘোষণাকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অপপ্রয়াস রূপে চিহ্নিত করা হয় এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ব তাদের রাষ্ট্র রূপে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে।

১৯৭১ সালে যখন পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্গত বাঙালি জনগোষ্ঠী ঠিক একই রকমভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয় তখন তারা সফল হয় এই স্বাধীনতার পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করতে। ফলে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় আন্তর্জাতিক বিশ্ব। এদিক থেকে দেখতে গেলে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের প্রথমভাগে স্বাধীনতা ঘোষণার যে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে তার নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে।

আমি অভিভূত হই যখন দেখি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাধীনতা ঘোষণার স্বপক্ষে যে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে তা অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে, সহজ ভাষায়, অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত ধারায় এবং নূন্যতম প্রয়োজনীয় শব্দের ব্যবহারে উপস্থাপন করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রে স্বাধীনতার দাবিকে দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন টমাস জফারসন। তাঁর দার্শনিক রূপরেখা বিশ্ববাসীকে চমকিত করেছে এ ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই।

অপরদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাধীনতাকে মূর্ত করা হয়েছে একটি বাস্তবিক প্রয়োজন হিসেবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তাই আন্তর্জাতিক বিশ্বে একটি যুগান্তসৃষ্টিকারী অবদান রেখেছে। আজকের উন্নয়নশীল বিশ্বে স্বাধীনতাকে দর্শনের বেড়াজালে আর আবদ্ধ রাখা সম্ভব নয়। স্বাধীনতা আজ পৃথিবীর যে কোন জাতিগোষ্ঠীর একটি জীবন্ত প্রয়োজন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র প্রথমবারের মত বিশ্বে এই ধ্রুব সত্যটি সার্থকভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।

দার্শনিক রুশো প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যে একজন ব্যক্তি মানুষ জন্মগতভাবেই স্বাধীন। আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রতিষ্ঠা করেছে একটি জাতিগোষ্ঠী তার জাতিসত্তার উন্মেষ থেকেই স্বাধীন।

স্বাধীনতার এই যে ব্যক্তি থেকে জাতিগোষ্ঠীর পরিমণ্ডলে উত্তরণ তাকে আমি দার্শনিক জয়যাত্রা হিসেবে দেখিনা। আমি মনে করি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের খসড়াতে স্বাধীনতা চেতনার একটি নতুন দিক উন্মোচন করা হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাধীনতাকে দর্শনের প্রাসাদ থেকে মুক্ত করে, তার জীবন্ত ও প্রায়োগিক (Pragmatic) ব্যবহারের মাধ্যমে সাধারণ জনপদের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি এই কারণেই বিশ্বে অনন্য।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং ইতিহাস বিকৃতির রাজনীতি

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি ১৯৭১ সালেই অনেক বিষয়ের নিষ্পত্তি করেছে। অনেক ঐতিহাসিক বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে এই ঘোষণাপত্রটিতে। তারপরও রাজনৈতিক কারণে অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক ভাবে আমাদের ঐতিহাসিক সত্যগুলোকে নিয়ে বিতর্কের জন্ম দেয়া হয়েছে। যেমন, গণহত্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বিষয়ে মিথ্যা দাবী উত্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এই সকল বিষয়ে ১৯৭১ সাল থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি ইতিহাসের সাক্ষ্য হয়ে আছে। আর তাই নিম্নলিখিত বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্কের অবতারণা করা দূরভিসন্ধিমূলক।

(ক) স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি ১৯৭১-এর গণহত্যার স্বীকৃতির
প্রথম দালিলিক প্রমাণ

বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধকালে এক ভয়াবহ গণহত্যা সংঘটিত হয়। ২০১৭ সাল হতে ২৫শে মার্চ তারিখে আমরা ১৯৭১-এ সংঘটিত গণহত্যা স্মরণে জাতীয়ভাবে ‘গণহত্যা দিবস’ পালন করে আসছি। আমরা এখন লড়াই করছি আমাদের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য। কিন্তু আমাদের সংবিধানের ঘোষণাপত্রে আমরা ১৯৭১-এর গণহত্যার স্বীকৃতির প্রথম দালিলিক প্রমাণ পাই।

এই পবিত্র দলিলে প্রথমবারের মত উল্লিখিত হয় যে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ নানা অপরাধ তৎকালীন পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী সংঘটন করার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বাধ্য হই স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করতে এবং মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে –

“… যেহেতু একটি বর্বর ও নৃশংস যুদ্ধ পরিচালনায় পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ, অন্যান্যের মধ্য, বাংলাদেশের বেসামরিক ও নিরস্ত্র জনগণের উপর নজীরবিহীন নির্যাতন ও গণহত্যার অসঙ্খ্য অপরাধ সঙ্ঘটন করিয়াছে এবং এখনও অনবরত করিয়া চলিতেছে,…”

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ৯ অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছে –

“… যেহেতু পাকিস্তান সরকার একটি অন্যায় যুদ্ধ চাপাইয়া দিয়া, গণহত্যা করিয়া এবং অন্যান্য দমণমূলক কার্যকলাপের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিনিধিগণের পক্ষে একত্রিত হইয়া একটি সংবিধান প্রণয়ন এবং নিজেদের মধ্য একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব করিয়া তুলিয়াছে। …”

তাহলে, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি ১৯৭১-এ বাংলাদেশে পাকিস্তান কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যার এক অকাট্য দালিলিক প্রমাণ।

(খ) স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুই স্বাধীনতার
ঘোষক

বিএনপি দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর স্বাধীনতার ঘোষকের দাবীদার করা হয়েছে তাকে। কিন্তু এই দাবী স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের সাথে সাংঘর্ষিক। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের দুটি জায়গাতে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা আছে যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই হলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে –

“… যেহেতু এইরূপ বিশ্বাসঘাতকতামূলক আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ তারিখে ঢাকায় যথাযথ ভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন এবং বাংলাদেশের মর্যাদা ও অখন্ডতা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহবান জানান…”

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ১৩ অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছে –

“সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্ররূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করিলাম এবং তদ্বারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ইতিপূর্বে ঘোষিত স্বাধীনতা দৃঢ়ভাবে সমর্থন ও অনুমোদন করিলাম…”

অতএব, স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হোল এক ধরণের নোংরা রাজনীতির প্রয়াস। যেই স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ঘোষণাপত্র নিয়ে একটি মুক্তিযুদ্ধ আমরা করলাম, একটি রাষ্ট্রের জন্ম হোল, বিশ্বের বুকে একটি মানচিত্র আমরা পেলাম, সেই ঘোষণাপত্রের ইতিহাস কে যদি আমরা বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করি তবে জাতি হিসেবে আমরা দেউলিয়াপনার চূড়ান্ত উদাহরণ স্থাপন করব।

(গ) বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি

রাজনৈতিক কারণে এবং অসৎ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি নিয়েও বিতর্ক তোলা হয়েছে। অথচ এই ঐতিহাসিক সত্যটিও কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে ১৯৭১ সাল থেকেই প্রতিষ্ঠিত।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ১৪ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে –

“এতদদ্বারা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতেছি যে, সংবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি থাকিবেন …”

তাহলে এই যে বিএনপি দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তাকে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দাবী করা হচ্ছে তা এক নির্জলা মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র যে সত্য ধারণ করে আছে তাকে অস্বীকার করার অর্থ কী?

উপসংহার

আজকের এই দিনে, যেই দিনটিকে আমরা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র দিবস হিসেবে পালন করে আসছি, আসুন আমরা ইতিহাস বিকৃতকারীদের বিরূদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করি। আমাদের রাষ্ট্র এক, মানচিত্র এক, পতাকা এক, তাহলে আমাদের ইতিহাস ভিন্ন হবে কেন? বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত স্বাধীনতার ওপর দাঁড়িয়ে আমরা যে মহান মুক্তিযুদ্ধ লড়েছি, যেই সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখছি, সেখানে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে অস্বীকার করা মানেই হোল সংবিধানকে লঙ্ঘন করা। আর বাংলাদেশ সংবিধানের ৭(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)