চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ‘ট্রিলোজি’ নির্মাণের কী খবর?

গেল বছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন ‘গাড়িওয়ালা’ নির্মাতা আশরাফ শিশির। চ্যানেল আই অনলাইনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বঙ্গবন্ধুর উপর ‘ট্রিলোজি’ নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিলেন।

তারই অংশ হিসেবে ট্রিলোজির প্রথম ছবি ‘৫৭০’-এর কাজ শুরু করছেন এবং ২০১৯ সালের ১৫ আগস্টের মধ্যে মুক্তির ব্যবস্থাও করবেন বলে তখন জানিয়েছিলেন। এক বছর হয়ে গেলো, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ঘোষিত সেই ট্রিলোজির কী খবর? বিষয়টি নিয়েই বছর ঘুরে ফের চ্যানেল আই অনলাইনের মুখোমুখি নির্মাতা আশরাফ শিশির।

বিজ্ঞাপন

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ট্রিলোজি নির্মাণের আপডেট জানতে চাইলে এই নির্মাতা বলেন, আমাদের টার্গেট ছিল ২০১৯ সালের ১৫ আগস্ট এরমধ্যে ট্রিলোজির প্রথম চলচ্চিত্র ‘৫৭০’ নির্মাণ করে মুক্তি দেয়ার ব্যবস্থা করবো। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে গিয়ে দেখি, যেহেতু এটি ঐতিহাসিক ছবি ফলে এখানে বানিয়ে লেখা বা বলার সুযোগ নাই। প্রত্যেকটা বিষয়ের সাথে রেফারেন্স থাকা বাঞ্ছনীয়। আর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে চলচ্চিত্র করতে গেলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে পারমিশন এর প্রয়োজন, বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের অনুমতির প্রয়োজন। এরকম আরো বেশ কিছু বিষয় আছে, যেগুলো ধাপে ধাপে পার হওয়া লাগে। প্রাথমিকভাবে আমাদের প্রস্তুত করা যে স্ক্রিপ্ট ছিলো, সেটা করতে গিয়ে দেখলাম যে আমাদের বেশ কিছু রেফারেন্স এর প্রয়োজন। আমরা স্ক্রিপ্টে যা দেখাবো বলে লিখেছি সেগুলির অনেক বিষয় কার্যত ইতিহাসের সাথে কনফ্লিক্ট করে। ঐতিহাসিক সত্য যেখানে জড়িত, সেখানে তাড়াহুড়ো করে গোল পাকিয়ে ফেলার সম্ভাবনা দেখা দিলে একটু সময় নেই। অস্থির না হয়ে পুনরায় স্ক্রিপ্ট প্রস্তুতির আগে আরেকবার গবেষণা করেছি, সেই গবেষণা এখন শেষ হয়েছে। ফাইনাল স্ক্রিপ্ট ও তৈরি, এখন আমরা আশা করছি আগামী সেপ্টেম্বর থেকে ‘৫৭০’-এর শুটিং শুরু করব।

কিন্তু আগে যখন সিনেমার ঘোষণা দিলেন, তখনতো বলেছিলেন স্ক্রিপ্টসহ সমস্ত কিছুই প্রস্তুত? এমন প্রশ্নে শিশির বলেন: আমাদের প্রাক প্রস্তুতিতো করাই ছিলো আগে থেকে। কিন্তু রেফারেন্স ইউজ করতে গিয়েই আমাদের খটকা লাগে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরের ১/২ দিনের ইতিহাস খুবই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ছোট্ট একটা এক্সাম্পল দেই, বঙ্গবন্ধুকে টুঙ্গিপাড়ার নিয়ে যাওয়ার পর ওইখানে যারা রিসিভ করেছিলেন এমন দাবীদার ই আছে অন্তত ৫ জন। এরমধ্যে একজন দাবি করেছেন তিনি তিব্বত-৫৭০ সাবান এনে দিয়েছিলেন, অমুক কাফনের কাপড় এনেছিলেন, তমুক জানাজা পড়িয়েছিলেন! ছবিটা করতে গিয়ে এবং ঐতিহাসিক সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে দেখি এরকম বেশ কিছু ঘটনা খুবই ছড়ানো-ছটানো। যে গল্পটা করতে চাইছি ‘৫৭০’-এর সেই গল্পটা ঠিক আছে কিন্তু গল্পের চরিত্রগুলো বা দাবিদার বহু জন! একটা কনফ্লিক্ট তৈরী করে দিয়েছিলো। ফলে আমাকে রেফারেন্স জোগাড় করতে হয়েছে ঐতিহাসিক সত্যতার ভেতর থেকে। প্রচুর বই, পেপার কাটিং, ভিডিও ফুটেজ সবগুলো জেনে আমরা একটা অবস্থায় এখন দাঁড়িয়ে আছি, একটা সিদ্ধান্ত উপনীত হয়েছি। রেফারেন্স এর মাধ্যমে আমরা এখন বলতে পারবো যে এই বিষয়গুলি বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর ১/২ দিনের মধ্যে ঘটেছিল।

তিনি বলেন, এখন আমাদের স্ক্রিপ্ট এতটা স্ট্রং হয়েছে যে ৫৭০-এ আমরা যা দেখাবো তার বিপরীতে রেফারেন্স ও দিতে পারব। ঘটনার পেছনের রেফারেন্স এর জন্যই মূলত আমাদের সময় একটু বেশি লেগে গেছে।

‘৫৭০’ চলচ্চিত্রের গল্প নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনে গেল বছর সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন আশরাফ শিশির। সাক্ষাৎকারটি প্রকাশের পর নির্মিতব্য চলচ্চিত্রের গল্পের সাথে ২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘তিব্বত ৫৭০’-এর ঘটনাক্রম ও নামের মিল খুঁজে পেয়ে অভিযোগ জানিয়েছিলেন গল্পকার খালিদ মারুফ। কথা প্রসঙ্গে সেই গল্পকারের অভিযোগ নিয়েও কথা হয় আশরাফ শিশিরের সঙ্গে।

খালিদ মারুফের অভিযোগের ভিত্তিতে আশরাফ শিশির বলেন: ওই অভিযোগটা আমার কাছেও এসেছে। কিন্তু উনার অভিযোগ খুবই হাস্যকর। ধরুন কেউ একটা ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে কাজ করছেন, সেটা নবাব সিরাজদৌলাকে নিয়েও হতে পারে। এখন সিরাজদৌলার যে বিষয়টি লেখক বা নির্মাতা তুলে ধরতে চাইছেন, সেই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর রেফারেন্স যদি তার কাছে থাকে তাহলে সমস্যা কোথায়? সিরাজদৌলা কিংবা এরকম ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ কতো কতো লেখকের লেখনীতে কি আসে নাই? দ্বিতীয় পয়েন্ট হচ্ছে যে ভদ্রলোক অভিযোগ করেছেন তার সাথে আমার কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই, তার কোনো লেখা আমি এই জীবনে পড়িনি। তার কিংবা তার লেখার সম্পর্কে আমার সত্যিই কোনো ধারণাও ছিলো না। ‘৫৭০’ সিনেমার যে গল্প সেই প্রেক্ষাপট আমি জানি বহু বছর আগে থেকে, বঙ্গবন্ধুর হত্যার সময় যারা সাক্ষী ছিলেন তাদের এভিডেন্স থেকে এই বিষয়গুলি প্রকাশ্যে আসে। সাক্ষ্যদানকারী মানুষগুলোর এভিডেন্স আমার কাছে রেফারেন্স হিসাবে আছে। সেই সময়ের প্রচুর নিউজ আছে তাদের বরাত দিয়ে। বঙ্গবন্ধু এবং তার মৃত্যুর পর তার হালহকিকত নিয়ে। যতদূর জেনেছি, খালিদ মারুফের লেখা গল্প ২০১৬ সালের। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু পরবর্তী বিষয় নিয়ে আনিসুল হকরাও লিখেছেন, ২০১০ থেকে শুরু করে ১১, ১২,১৩,১৪ ১৫ সালেও বহু লেখা বেরিয়েছে। তিব্বত সাবান দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে শেষ গোসল দেয়ার বিষয়টি ঐতিহাসিক সত্য, এই বিষয়টি খালিদ মারুফের লেখার আগে থেকেই বহু মানুষের লেখাতে এসেছে, তাহলে কি আমি বলবো ওই লেখাগুলো থেকে খালেদ মারুফ তার ‘তিব্বত ৫৭০’ চুরি করে লিখেছেন? এটাতো না।

গল্প চুরির ইঙ্গিতকে পাত্তা না দিয়ে আশরাফ শিশির আরো বলেন, ধরুন বঙ্গবন্ধুকে গোসল দেয়ার সময় তিব্বত-৫৭০ দিয়ে তাঁকে শেষ গোসল দেয়া হয়, এখন যদি আমি তার সেই সময়টুকু নিয়ে বা তাঁকে নিয়ে সিনেমা করি এবং তিব্বত-৫৭০ দিয়ে তাঁকে গোসলের দৃশ্য দেখাই তাহলে কি আমি চোর হয়ে যাব? তাহলে কি গল্পকার বলতে চাইছেন, তিব্বত-৫৭০ এর পরিবর্তে অন্য সাবান দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে গোসলের দৃশ্য দেখানো উচিত? আর আমার সিনেমার গল্প শুধু ওই সাবান কেন্দ্রিক মুহূর্তটা নয় বরং বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর টুঙ্গিপাড়ার অবস্থা কী ছিল, সেখানে কী ঘটেছে সেসব পরিস্থিতিও উঠে আসবে।

‘তিব্বত ৫৭০’ গল্প থেকে সিনেমার গল্প নেয়ার পেছনে খালিদ মারুফের আরেকটি যুক্তি ছিলো, আশরাফ শিশির যদি অনুমতিহীন ভাবে ‘তিব্বত ৫৭০’-এর গল্প না ই নিবেন, তবে সিনেমার নাম কেন ‘৫৭০’? তাহলে কি সুকৌশলে ‘তিব্বত’ শব্দটি ফেলে সচেতনভাবেই সিনেমার নাম ‘৫৭০’ রেখেছেন শিশির?

এমন প্রশ্নে ‘আমরা একটি সিনেমা বানাবো’র নির্মাতা আশরাফ শিশির বলেন, বিশ্বাস করুন আমি উনার কোনো লেখা পড়ি নাই কিংবা এত আলোচনা-সমালোচনা হওয়ার পরও উনার ওই গল্পটা এখনো পড়িনি। আমি আসলে উনার গল্পের ভেতর দিয়ে যেতেই চাইছি না। বঙ্গবন্ধুর ঘটনা ঐতিহাসিক সত্য একটি ঘটনা, যেকোনো মোমেন্টাম নিয়ে আমি কিংবা যে কেউ ই ক্রিয়েটিভ কাজ করতে পারার অধিকার রাখেন। আবার চলচ্চিত্রের নাম তিব্বত-৫৭০ না হয়ে কেন শুধু ‘৫৭০’, তার কারণ হলো আমার সিনেমাটার নাম যদি ‘তিব্বত-৫৭০’ রাখতাম তাহলে সবাই অনুমান করে ফেলত এর গল্প কী হবে! সবাই ধরেই বসে থাকতো এটা শুধু তিব্বত সাবান দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে গোসল করার বিষয়টি! কিন্তু ‘৫৭০’ যখন বলি তখন গল্পটা আগে থেকে আঁচ করা যায় না, আর আমি মনে করি যে গল্পের পরিনতি পাঠক আগেই জেনে যান সেটি একটি দুর্বল গল্প।

দ্বিতীয়ত: যখন আমি একটি কর্পোরেট কোম্পানির ব্র্যান্ডকে ছবির নামে জুড়ে দেব, তখন বিষয়টা অন্য রঙের হয়ে যায়। ধরুন ছবির নাম দিলাম ‘কোকাকোলা’, তো এটা দিলে দুইটা জিনিস হতে পারে। এক. তারা খুশি হয়ে আমাকে প্রচুর অর্থ সহায়তা দিল। দুই. তাদের কাছ থেকে অনুমতি না নেয়ায় আমার নামে মামলা ঠুকে দিল! ফলত ‘তিব্বত ৫৭০’ কেন দিলাম না বলে যে উনার অভিযোগ, এটিও খুব শিশুতোষ!

‘৫৭০’-এর গল্প নিয়ে আত্মবিশ্বাসী শিশির জানালেন, আমি ডিরেক্টলি গল্পগুলো কালেক্ট করেছি এবং তার প্রতিটি ঘটনার পেছনে রেফারেন্স হাজির করছি, ফলত কেউ বলে দিল আমি কারো গল্পের ভেতর দিয়ে হাঁটছি সেটা খুবই আমার কাছে হাস্যকর।

Bellow Post-Green View