চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গানে সেই সুপর্ণকান্তির সুর, বাকি গল্প পান্নালালের মুখে

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা ‘আমাদের শেখ মুজিব’ গানটির সুর করলেন ‘কফি হাউজ’ খ্যাত বিখ্যাত সুরকার সুপর্ণকান্তি ঘোষ…

‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’- বাংলা সংগীতে কালজয়ী এক গান! মান্নাদের কণ্ঠে যে গানের সুর এখনও হৃদয়ে হাহাকার তৈরী করে! সেই গানের সুরস্রষ্ঠার নাম সুপর্ণকান্তি ঘোষ। শুধু ‘কফি হাউজ’ নয়, কিংবদন্তী মান্না দে’র ৫৬টি গানের সুর করেছেন সুপর্ণকান্তি।

যিনি সম্প্রতি সুর তুললেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে পান্নালাল দত্তের লেখা গানে! গানটি ২৯ অক্টোবর ইউটিউব ও নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও শেয়ার করেছেন তিনি। কীভাবে এই গানের সাথে যুক্ত হলেন অসংখ্য কালজয়ী গানের সুরস্রষ্ঠা সুপর্ণকান্তি? সেই গল্পই চ্যানেল আই অনলাইনকে শোনালেন গীতিকার পান্নালাল দত্ত।

সুপর্ণকান্তির সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ:
গত বছর আমি একটা গান লিখে কলকাতার বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ দূর্বাদল চ্যাটার্জীকে পাঠিয়েছিলাম। তার সাথে আমার পরিচয় প্রয়াত সুবীর নন্দীর মাধ্যমে। তো এরমধ্যে গত ডিসেম্বরে আমি গিয়েছিলাম কলকাতায়। দূর্বাদলের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে ওই গানটির কথা বললে তিনি আমাকে বলেন, ‘এই গানের সুর একমাত্র একজনই করতে পারেন, তিনি হলে সুপর্ণকান্তি ঘোষ’। বললাম, উনার সঙ্গেতো আমার পরিচয় নেই। তাছাড়া তিনি এতো বিখ্যাত মানুষ, তিনি কেনই বা আমার মতো একজনের গানে সুর তুলবেন! দূর্বাদল আমাকে আশ্বস্ত করলেন এবং গানটি এক সকালে সুপর্ণকান্তির কাছে পাঠালেন। সেই গানের কথা পড়ে সুপর্ণকান্তি আমাকে খোঁজ পাঠালেন। আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন। দূর্বাদল আমাকে উনার ফোন নম্বর, ঠিকানা দিলেন। আর বললেন, ‘সুপর্ণকান্তির সাথে দেখা করতে যাওয়ার আগে তাকে ফোন করবেন, উনি কিন্তু মানুষের সাথে মিসবিহেভ করেন। কারো লেখাটেখা খুব বেশি পছন্দ করেন না। মানে তিনি সোজাসাপ্টা সব বলে দেন, কিছু কেয়ার করেন না। আপনাকে যদি খারাপ কিছু বলে, দয়া করে কিছু মনে করবেন না।’ দূর্বাদলের এমন কথায় কিছুটা ভয়ে থাকলেও যাওয়ার আগে সুপর্ণকান্তিকে ফোন করি। ফোনেও বিরাট কাণ্ড, এতো কথা এখন বলা যাবে না! আমাকে সেদিন দুপুরে যেতে বললেন। যথারীতি ঠিক সময়ে তার ঠিকানায় গিয়ে উপস্থিত হলাম। গিয়ে দেখলাম গান করছেন। আমাকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘আমি কি তুমি করে বলবো নাকি?’ আমি বললাম, ‘বলতে পারেন, অসুবিধা নাই। আমারও বয়স হয়েছে, আপনারও হয়েছে!’ বললেন, ‘আমার বয়স এখন ৬১ চলছে। তোমার কতো বয়স?’ আমি বললাম, ‘আমার আপনার থেকে একটু বেশি, এখন ৭৩ চলছে!’ এটি শুনে তিনি দাঁড়িয়ে নমস্কার নমস্কার শুরু করলেন। বললেন, ‘আজ থেকে আমি আপনাকে আর তুমি তুমি বলবো না।’ -তো এরকম মজারছলে আমাদের শুরু!

বিজ্ঞাপন

গান নিয়ে কথাবার্তা:
এরপর দীর্ঘক্ষণ তার সঙ্গে কথা হলো। আমার লেখা যে গানটি দূর্বাদল চ্যাটার্জী তার কাছে পাঠিয়েছিলেন, সেটা নিয়েও কথা হল। বললেন, আপনার গানের কথাগুলো দারুণ হয়েছে, কিন্তু আমি এটা করতে পারবো না। আমি বললাম, ‘কেন?’ সুপর্ণ জানালেন, ‘এই গান করতে গেলে কফি হাউজের গানের সুরের স্টাইল এসে যাবে। মানুষ তখন ভাববে, আমি কফি হাউফ বিক্রি করে করে গান করছি। আপনি বরং অন্য গান লেখেন, আমি এই গান করবো না।’ স্ট্রেইট এমনটা বলে দিলেন। আমি আর কী করবো! আসার আগে আমাকে বললেন, ‘আপনি অন্য গান পাঠান, পছন্দ হলে করবো, না হলে করবো না’। আমি সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে চলে আসি।

‘আমাদের শেখ মুজিব’ গানটি হয়ে ওঠা:
এরপর করোনায় তো লকডাউন শুরু হয়ে যায়। আমি ছয়মাস কলকাতায় আটকে ছিলাম। এরপর দেশে আসার পর মনে হলো, যেহেতু এখন মুজিব বর্ষ চলছে, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যদি কিছু লেখা যায়, তাহলে সুপর্ণকে দিয়ে সুর করানো যাবে! সেই ভাবনা থেকেই ‘আমাদের শেখ মুজিব’ গানটি লিখি। লিখে দুদিন পরেই সুপর্ণকে পাঠালাম। তিনি গানের কথা পড়ে আমাকে বললেন, ‘গান খুবই ভালো হয়েছে, কিন্তু দ্বিতীয় অন্তরাটা একটু অন্যভাবে লিখে দেন।’ আমিও তার কথা মতো আবার লিখলাম, এবার তিনি পছন্দ করলেন। বললেন, ‘এই গান আমি করবো। অন্যরকম ভাবে করবো এই জেনারেশনের জন্য। আমাদের সময়ের পুরনো স্টাইলে এই গানটির সুর করবো না আমি’! তারপরতো তিনি এই গানের সমস্তটাই করলেন। টানা একমাস খেটে সুর করলেন, বহু পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন। এরপর সুর তৈরী হলে কাকে দিয়ে গাওয়াবেন, সেটা নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন। কাকে দিয়ে গাওয়াবেন, সুরটা পারফেক্ট ডেলিভারি কে দিতে পারবে- এগুলো নিয়ে ভেবেছেন। শেষ পর্যন্ত কলকাতার ‘ভূমি’ ব্যান্ডের গায়ক সুরজিৎ চ্যাটার্জিকে বেছে নিলেন। রেকর্ডের আগে তাকে অভার ফোনেই টানা দশ দিন রিহার্সেল করিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত গানটি রেকর্ড শেষ করে আমাকে পাঠিয়ে তিনি বলেন, ‘দেখেন, আপনার কেমন লাগছে। কলকাতার অনেকেই গানটি পছন্দ করেছেন।’ দেখলাম অনলাইনে অনেকেই গানটি নিয়ে খুব ইতিবাচক মন্তব্য করছেন, এটুকু দেখেই ভালো লাগে।

পান্নালালের যে গানটি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সুপর্ণকান্তি:
যে গানটি করতে সুপর্ণকান্তি রাজি হননি, ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সেই গানটি এখন আছে সুজেয় শ্যামের কাছে। তিনিই সুর দিবেন সেই গানটিতে। ক্যানসারের কারণে মাঝখানে সুজেয় শ্যাম অসুস্থ থাকায় কাজটি একটু পিছিয়ে গেছে, কিন্তু এখন তিনি ভালো আছেন। নিয়মিত গানে সুর তুলছেন। আশা করি শিগগির সেই গানটিও সামনে আসবে।