চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বই, বইপড়া ও ফেসবুকের সবজান্তাগণ

বইপড়ার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আমরা অনেক সুন্দর সুন্দর কথা বলি। তবে আফসোসের বিষয়টা হলো, বর্তমান সময়ে আমরা বইপড়া থেকে ক্রমেই অনেক দূরে সরে যাচ্ছি। এমনিতেই জাতি হিসেবে বইপড়ার ব্যাপারে আমাদের প্রবল অনীহা।

আমাদের পারিবারিক জীবনেও বইপড়ার ব্যাপারে অনুকূল পরিবেশ নেই। অভিভাবকরা বইপড়তে নিরুৎসাহিত করে। পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য বইপড়াকে খারাপ চোখে দেখা হয়। বইয়ের বিরুদ্ধে আমাদের আছে একশ একটা অকাট্য যুক্তি। বইপড়া মানে সময় নষ্ট। পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য বইকে বলা হয় ‘বাজে’ বই।

বই-বিরুদ্ধ পরিবেশে বড় হয়ে বইপড়া আমাদের জীবনে এক নিরানন্দ একঘেয়ে ব্যাপারে পরিণত হয়। আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ কেবল পরীক্ষা পাস ও চাকরি পাওয়ার জন্য বই পড়ে থাকে। পরীক্ষা আর চাকরির প্রয়োজন না থাকলে কে বই পড়ত? স্বেচ্ছায় মনের আনন্দে কে বই পড়ে?

এখন বইয়ের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বি হচ্ছে স্মার্ট ফোন। আরও স্পষ্ট করে বললে ফেসবুক। এখনকার ছেলেমেয়েরা পড়তে চায় না। সবাই কেবল মোবাইল টেপে। শয়নে-স্বপনের-জাগরণে-রেস্টুরেন্টে-আড্ডায়-টয়লেটে সবারই চোখ মোবাইলে। পারস্পরিক কথা বিনিময় কম হয়। সবাই ফেসবুক আপডেট দেখতে ব্যস্ত।

এরই মধ্যে প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে বইমেলা আয়োজন করা হয়। মেলা উপলক্ষে হাজার হাজার বই প্রকাশিত হয়। বইমেলাকে ঘিরে প্রচুর লোক সমাগম ঘটে। বইমেলায় ভিড় ঠেলে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া রীতিমতো একটা চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার হয়ে ওঠে। তবে এতো মানুষ সমাগমের পরেও বইয়ের কাঙ্ক্ষিত কাটতি নেই।

অনেকের কাছে বই আবার ঘুমের ওষুধ হিসেবে কাজ করে। টিভি-মোবাইলে ঘাড় গুঁজে রাখলে, আড্ডা দিলে, ঘুরে বেড়ালে কিছুই হয় না। কিন্তু বই নিয়ে বসলেই ঘুম পায়। কয়েকলাইন পড়লেই ঘুমে চোখের পাতা লেগে আসে। রাজ্যের ক্লান্তি যেন এসে ভর করেছে শরীরে। তখন মনে হয়, ঘুমের চেয়ে জরুরি আর কিছুই হতে পারে না জীবনে।

এভাবে আমাদের জীবনে সব হয়, শুধু হয় না পড়া। তারপরও কিন্তু কিছু কিছু ব্যক্তি বই কেনে। বইমেলায় কোটি কোটি টাকার বই বিক্রি হয়। তবে যারা বই কেনে তাদের সবাই বই পড়ে না। বই নিয়ে নানা জনের নানা অভিজ্ঞতা। কেউ কেউ বই কেনে সাজিয়ে রাখার জন্য। ড্রইংরুমের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য। কয়েকটা মোটা মোটা বই আলমারির র‌্যাকে। সুন্দর করে সাজিয়ে না রাখলে নিজের আভিজাত্য প্রমাণ করা যায় না। যদিও সে বই সংশ্লিষ্টরা নিজেও পড়েন না, কাউকে ছুঁতেও দেন না!

আমাদের সমাজে রয়েছে বইয়ের বহুবিধ ব্যবহার। ঠোঙা বানানো, চানাচুর-বাদাম, পান বিক্রির কাজে পুরনো ও বাতিল বইয়ের পৃষ্ঠা অনাদিকাল থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আমি এমন অনেক অলস ব্যক্তিকে দেখেছি যিনি গল্পের বইয়ের পৃষ্ঠা ছিড়ে সেটিকে মুড়িয়ে কান চুলকানোর কাজে ব্যবহার করেন।

আবার এমন অনেক সৃজনশীল গৃহিণীকে দেখেছি যারা বইয়ের পৃষ্ঠা ছিড়ে এক চুলা থেকে আরেক চুলায় আগুন ধরান! আমরা ছোটকালে যখন ভাইবোনেরা ঝগড়া করতাম, তখন বড়রা বইকে ডান্ডা হিসেবে ব্যবহার করত। মনে আছে, একবার আমার বড়ভাই আমাকে এক গ্লাস পানি আনতে বলেছিল। আমি তাৎক্ষণিক জবাব দিয়েছিলাম যে আমি কারও চাকর নই। তার হাতে ছিল বঙ্গিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলা। আমার ঔদ্ধত্যের জবাবে সে ওই কপালকুণ্ডলা আমার কপাল বরাবর ছুঁড়ে মেরেছিল।

একটা ছোটখাট রক্তারক্তি ব্যাপারও ঘটে গিয়েছিল। ছোট সাইজের উপন্যাসও যে কত শক্ত হতে পারে, সেদিন বুঝেছিলাম। তারপর থেকে বঙ্কিমের বইয়ের প্রতি এক ধরনের ভীতি সৃষ্টি হয়। সেই ভীতি এখনও কাটেনি!

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে করে আমরা যখন দলবেধে মেসে থাকতাম, তখন প্রায় প্রতিরাতেই কিছু ভবঘুরে বন্ধু অনিচ্ছুক অতিথি হতো। তখন মেঝেতে শোয়ার সময় লুঙ্গি বিছানা চাদর হিসেবে ব্যবহার করা হতো, আর রবীন্দ্র রচনাবলি, বঙ্গীয় শব্দকোষ জাতীয় ঢাউস সাইজের বইগুলো বালিশ হিসেবে ব্যবহার হতো।

যখন মোবাইল-টিভির রমরমা ছিল না তখন দেখেছি অনেক মা বাচ্চা-কাচ্চার কান্না থামানোর জন্য বিভিন্ন গল্প-উপন্যাস-কবিতার বই তাদের সামনে দিয়ে বসিয়ে দিত। আর বাচ্চারা মনের আনন্দে বই ছিঁড়ত। বাচ্চারা কিন্তু এখনও বইয়ের পৃষ্ঠা ছিঁড়তে ভীষণ পছন্দ করে।

তবে যারা বই লেখেন, বই প্রকাশের চেষ্টা করেন তারা কিন্তু অতশত ভেবে তা করেন না। একজন তরুণ কবিকে জানি যিনি একজন প্রকাশকের কাছে গিয়েছিলেন। প্রকাশককে গিয়ে কবি বলছেন: কিছু দুর্দান্ত কবিতা লিখে এনেছি একটা বই যদি প্রকাশ করতেন।

বিজ্ঞাপন

প্রকাশক : বিয়ে করেছেন?
: না।
: বিয়ে করে তারপর আসেন।
:কেন?
: আপনার বইয়ের অন্তত একজন পাঠক তো চাই!

বই নিয়ে গোটা দুনিয়াজুড়েই অনেক কাহিনি প্রচলিত আছে। ফ্রান্সের বরেণ্যসাহিত্যিক আলেকজান্ডার দুমা একবার রাশিয়ার টিফলিস শহরে বেড়াতে গিয়ে একটা বইয়ের মার্কেটে গেলেন। সেই মার্কেটের এক দোকানদার খবর পেয়ে দুমাকে খুশি করার জন্য তার দোকান শুধু দুমার বই দিয়ে ভরে ফেলল।

দুমা অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, কী ব্যাপার, অন্য সাহিত্যিকদের বই কোথায়?
: অন্যদের বই! অন্যদের সমস্ত বই বিক্রি হয়ে গেছে!
অনেকে বলেন বউ আর বইয়ের বিরোধ রয়েছে। এ ব্যাপারে যদিও কোনো গবেষণা নেই। আমার ধারণা নারী-বিদ্বেষী ব্যক্তিরা এমন একটা কথা দুনিয়াজুড়ে রটিয়েছে। আমি নিজে যা বুঝি তা হলো: বউ নিজে নিজেই আপনাকে ছেড়ে যেতে পারে। কিন্তু বই কখনও আপনাকে ছেড়ে যাবে না, যদি কেউ তাকে চুরি করে নিয়ে না যায়!

বই নিয়ে একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে। ট্রেনে এক হকার বই বিক্রি করছেন।
হকার একজন যাত্রীকে উদ্দেশ করে বললেন, ভাই, দেব নাকি একখানা বই? খুব ভালো বই, কাজের বই। বইয়ের নাম “চুরি করলে ধরা পড়বেন না”। এই বইটা পড়ে দেখুন, চুরি করে ধরা না-পড়ার সমস্ত নিয়মাবলি আছে। খুব সহজেই আপনি কৌশল আয়ত্ত করতে পারবেন। মনে করুন আপনার পকেটে কিছু আছে। বলেই সে ওই যাত্রীকে বললেন, ভাই আপনার পকেটে কি আছে? একটু বলুন।
যাত্রীটি বলল, মানি ব্যাগে পাঁচশো টাকা আছে।

এরপর ওই হকার যাত্রীটির পকেটে হাত দিয়ে মানিব্যাগটি বের করে ফেললেন। এরপর বললেন, এবার আমার দিকে লক্ষ্ করুন, এই নিলাম (বলেই, হকার চলন্ত ট্রেন থেকে নিচে লাফ দিল।) দেখলেন তো কিভাবে চলন্ত ট্রেন থেকে লাফ দিলাম, তবে এই কাজটি করতে হবে অত্যন্ত সাবধানে।

যাত্রীটি এবার চিৎকার করে বললেন, এই মিয়া কর কি, আমার মানি ব্যাগটা…।
হকার : (হাসতে হাসতে) ধরতে পারবেন না, ভাই। সব নিয়মাবলি বইটায় দেওয়া আছে। মনে রাখবেন, না বলেই নিতে হয় এবং কাজটা আকস্মিক করতে হয়!

তবে এ ধরনের ঘটনা সব সময় ঘটে না। সবার ক্ষেত্রেও ঘটে না। বইকেনা নিয়েও অনেক ক্রেতার বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা রয়েছে। এক ক্রেতা বইয়ের দোকানে গিয়ে বই দেখছেন। একটি চমৎকার প্রচ্ছদের বইয়ে পাঠকটির দৃষ্টি আটকে গেলে।

বই বিক্রেতা ক্রেতাকে উদ্দেশ করে বললেন, এই বইটা পড়লে হাসতে হাসতে মারা যাবেন।
ক্রেতা : তাহলে এক কপি দিন। আমার বসকে পড়তে দেব!
অপর এক ক্রেতার অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন। বইমেলায় এক স্টলে ঢুকে কিছু বই চাইলেন এক ভদ্রলোক। বিক্রেতা জানতে চাইলেন, কী রকম বই চাই, বলুন। হালকা কিছু?

জবাবে ভদ্রলোক বললেন, না না, ওজন নিয়ে আপনি মোটেও ভাববেন না। আমার সঙ্গে গাড়ি আছে ।
বইয়ের গুরুত্বও সবার কাছে সমান নয়। এক অফিসের বস অফিসে বসেই সাহিত্য রচনা করতেন। তার এক অধস্তন সহকর্মী একদিন বসকে গিয়ে বললেন, স্যার আপনি সারাক্ষণ এত মনোযোগ দিয়ে কী লিখেন?

বস বললেন, গল্প-উপন্যাস লিখি।
এবার অধস্তন কর্মীটি বললেন, এত কষ্ট করে রাত জেগে লেখার দরকার কী? কয়টা টাকা খরচ করলে তো বাজার থেকেই এগুলো কিনতে পারেন।

বই নিয়ে গল্প-কৌতুকের কোনো শেষ নেই। মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের পাঠাভ্যাস নিয়ে এক সময় বাজারে একটি গল্প খুব প্রচলিত ছিল। জর্জ বুশের হোয়াইট হাউস ত্যাগের সময় তার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র পরিবহনের জন্য ট্রাক এলো। প্রেসিডেন্টদের অনেক বই থাকে। ফলে বড় ট্রাকই বরাদ্দ। কিন্তু মাল পরিবহনের লোকজন বুশের স্টাডিতে গিয়ে হতভম্ব হয়ে গেলেন। পুরো স্টাডিজুড়ে পড়ে আছে শুধু দুখানা বই। একটা স্পোর্টস ম্যাগাজিন আর এক কপি হাসলার!

তবে সবাই বুশের মতো নয়। পৃথিবীতে এমন অনেক রাজনীতিক আছেন যাদের প্রজ্ঞা, বিদ্যা ও জ্ঞানের গভীরতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। সাধারণভাবে রাষ্ট্রনায়কদের কাছে প্রজ্ঞা ও দার্শনিকতা প্রত্যাশা করা হয়। প্লেটো বলেছিলেন, তার আদর্শ রাষ্ট্রের প্রধান হবেন একজন দার্শনিক রাজা।

বলেছিলেন, দার্শনিকদেরই রাজা হতে হবে কিংবা রাজাকে দার্শনিক হয়ে উঠতে হবে। এখন যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তারা কোনো রকম লেখাপড়া ছাড়াই একেকজন ‘জ্ঞানী ও দার্শনিক’। আবার নাগরিকরাও এখন কোনো রকম পঠনপাঠনের অভ্যাস ছাড়াই একেকজন পণ্ডিত ও দার্শনিক। ‘বুক’ নয়, ‘ফেসবুক’ পড়েই, ফেসবুকে লিখেই সবাই ‘সবজান্তা শমসের’ সেজে বসে আছেন।
এই ‘সবজান্তা শমসের’-দের জয় হোক!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন