চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বইমেলা আমাদের সপ্তম ঋতু

শেষ দিনে বইমেলার বাইরে কৃত্রিম পাখি উড়তে থাকে। সেই পাখিকে প্রকৃত পাখির মতো চঞ্চল ও জীবন্ত মনে হয়। এবারও যে পাখি উড়ছে তা কল্পনাতীত বাস্তবসম্মত। প্রকৃত পাখির মতো শুধু উড়ছেই না, নীচে নেমে পড়ার পর ডানা ঝাপটে আর্তনাদও করছে। শুরুটা চাঞ্চল্য ও উচ্ছ্বাসের, শেষটা কষ্টের। এই পাখি আর কোথাও দেখা যায়নি। বোঝা যায়, চীনের নতুন উদ্ভাবন। আমাদের বইমেলায় তার উদ্বোধন।

আমাদের ছয়টি ঋতু অনুভবে খুঁজে পেতে কষ্ট হয়। কিন্তু ‘একুশে গ্রন্থমেলা’ নামের একমাসের এই ঋতুর ‘অভিঘাত’ থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে যোগ করে এ মাসের তকমা দিতে চাই ‘সপ্তম ঋতু’। শীতের কিছুটা, বসন্তের কিছুটা মিলিয়ে মিষ্টি রোদ, ধূলিধূসর দিগন্ত, বইয়ের গন্ধ ছড়ানো সারাবেলা এই ঋতুর বৈশিষ্ট্য।

বিজ্ঞাপন

শেষ শুক্রবার বইমেলায় গিয়ে দু’ঘণ্টা রোদে ঘুরে বিনা কসরতে আমি সুপেয় পানি পান করতে পেরেছি। বারবার মনে হয়েছে এখানে মিষ্টি ছায়া আর সবুজ ঘাসের বিছানা থাকলে অনেকেই কিছুক্ষণ শুয়ে থাকতো। সোহরাওয়ার্দীর বাগানের দিকটায় নীচে সবুজ প্রান্তরের মতো করে নির্দিষ্ট সময় পর পর ফগার ‘সিস্টেম’ এ পানি ছড়িয়ে দিলে দারুণ হতো। সবুজ ঘাসের বিস্তার যেমন সজীব থাকতো, মানুষের মনও হয়ে উঠতো সজীব।

‘আমরা বসার সুযোগ পেলে শুতে চাই’ ঠিক। কিন্তু বইমেলার সবুজ প্রান্তরে সারাদিন বহু নারী-পুরুষ বইমেলে শুয়ে আছে, পড়ছে, বিশ্রাম নিচ্ছে এমন দৃশ্যেরও অসাধারণ এক আন্তর্জাতিকতা থাকতো। বইয়ের সঙ্গে বাণিজ্য আছে বটে, তবে এর সঙ্গে মানসিক যে শ্রম ও মগ্ন সৃজনশীলতার বন্ধন জড়িত, তা উগ্র বাণিজ্যিক পরিবেশে পাওয়া কঠিন।

বইমেলাকে ঘিরে গড়ে ওঠা সংস্কৃতি লেখক, প্রকাশক ও বইক্রেতার মধ্যকার সম্পর্ক এবং বই বিষয়ক তৎপরতার সঙ্গে পাঠকের প্রতি দায়বদ্ধতা জায়গাটি ছোট হয়ে আসছে। যতই বাণিজ্যিক চেহারায় পাঠকের দৃষ্টি কাড়ার ব্যবস্থা জোরদার হচ্ছে, তত হাল্কা হয়ে যাচ্ছে বই এবং বইয়ের আবেদন। বইয়ে লেখকের সাক্ষর গ্রহণের ইতিহাস সম্পর্কে আমার তেমন জানা নেই। তবে শুধু লেখকের সাক্ষর গ্রহণের জন্যও বহু মানুষ বই কেনেন, সে বই হয়তো তার পড়ার সুযোগ হয় না কিংবা পড়েন না। এগুলো সময়ের আকস্মিক আবেদন, মিলিয়েও যায় আকস্মিক। পল্টনে রাস্তায় ফেলে বিক্রি করা বইয়ের গাদায় লেখকের সাক্ষর করা বই পাওয়া যায়। বোঝা যায়, কোনো এক লোক বড় ঝড় সামলে লেখকের সাক্ষর নিয়েছিলেন। তখনই তার আবেদন ফুরিয়ে গিয়েছিল। খুব ভালো হতো, যদি বইমেলায় লেখক আরো সম্মানিত হতেন। পাঠক আরো সম্মানিত হতেন।

যদি বিক্রির হিসেবে শীর্ষ বইয়ের তালিকা, শিল্পমানের বিচারে শীর্ষ বইয়ের তালিকা ও সূচক প্রতিদিন হালনাগাদ হতো, যদি বইমেলায় পাঠকদের মনোজগৎকে আরো নাড়া দেয়া যেত, তাহলে বিপুল বিস্তৃত আয়োজনের রেশ আরো গভীরভাবে মানুষের মনে চেতনায় থেকে যেত। বইমেলার সুপারিসরে পায়চারি করে যে আরাম, যে ভালোলাগা, তা অনেকটা মিলিয়ে যায় নানান প্রকাশনীর বইয়ের দঙ্গল দেখে। বহু বই আছে, যেগুলোর দিকে চোখ পড়লে মনে হয়, বইটি কেন বেরুলো? বইয়ের নাম, ভেতরের লেখনী থেকে শুরু করে অনেক কিছুই অসংলগ্ন ও অপরিণত চিন্তায় ঠাসা। এগুলোকে প্রকাশ করে বাজারে আনলে ওই মানুষটির যে ক্ষতি হয়, যে পড়ে ওই পাঠকের যে ক্ষতি হয়, যে বাণিজ্য করে তার যে ক্ষতি হয় তা দেখার মতো চোখ আমরা হারিয়ে ফেলেছি। অন্তত ছোট, নিচু ও সহজ একটি চৌকাঠ দরকার, লেখককে যেটি পেরুতে হবে; যেটি না পেরুলে কারো বই প্রকাশিত হবে না, এমন একটি রীতি থাকা উচিৎ। বাংলা একাডেমি, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে শুরু করে সরকারের আরো কিছু প্রতিষ্ঠানের তদারকিতে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। ইউরোপ আমেরিকা থেকে শুরু করে অনেক দেশেই প্রকাশিতব্য বইয়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিকাঠামো পূরণ করা বাধ্যতামূলক। প্রকাশক হওয়ারে ক্ষেত্রেও সেখানে প্রয়োজন হয় অনেক যোগ্যতার। সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম কাঠামো পুরো করে প্রকাশনা খোলার মতো কাজে নামার সুযোগ ঘটে। আমাদের এখানে তার কোনো প্রয়োজন হয় না। শুধু টাকার গুনতে পারলেই বহু কাজ করা যায়। প্রকাশনা সংস্থা খোলার ব্যাপারেও এর চেয়ে বেশি লাগে না।

বইমেলা শেষ হয়ে গেল। অজস্র বই বেরুলো। বাণিজ্যও কম হলো না। যারা টাকা গুনতে আসেন, তারা টাকা গোনেন। অবশ্য, বাণিজ্যের সঙ্গে যে সৃজনশীলতা আছে, সেই সৃজনশীলতার কিছু আনুষ্ঠানিকতা সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছে কোনো কোনো প্রকাশক। রংচঙা বিশাল প্যাভেলিয়ন, একদল পোশাকধারী তরুণ-তরুণী বিক্রয়কর্মীর ব্যবস্থা, লেখককে বিজ্ঞাপিত করার আয়োজন মেলার আভিজাত্য ও বিক্রি বাড়ায়। কিন্তু বাণিজ্যিক এই আয়োজনে যারা পিছিয়ে থাকছে তাদের দেখলে বোঝা যায়, শুধু পুঁজির ঘাটতিতে তারা পেছনে। যারা পেছনে, যারা ভালো বই বের করে না। জনপ্রিয় লেখকের পাণ্ডুলিপি গ্রহণের সাধ্য তাদের নেই। অনেকেই সাহস করে বিনিয়োগ করে বটে, কিন্তু সব নিয়ম-কানুন মানতে না পেরে শেষমেশ কুলিয়ে উঠতে পারে না। তাছাড়া বইমেলা নিয়ে বাণিজ্যের শুরু ধরা হলেও বছরব্যাপী নানা কারসাজি আছে, সেখানে কম পুঁজির দুর্বল প্রকাশকদের টিকে থাকা কঠিন।

বইমেলা শেষের দিন কারো কারো কান্না পায়। অনেকেই নতুন বইয়ের পরিকল্পনা আর প্রত্যয় নিয়ে ভাঙা মেলা থেকে বের হন। পরিকল্পনার সবটা পরে আর থাকে না। বোঝা যায়, বইমেলার মতো এমন তীব্র প্রভাব অন্য কোনো ঋতুর নেই।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন