চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ফেসবুক হোক সকলের পরিশীলিত ভাবনার বহিঃপ্রকাশ

একটা সময় গেছে বাংলাদেশে যখন প্রবীণ -যুবক সকলেই নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করবার জন্য শুধুমাত্র ফোন ব্যবহার করতো। ভাবনা চিন্তাগুলোকে শেয়ার করার জন্য বা ছড়িয়ে দেবার জন্য অনেক দূর থেকে এসে বন্ধুদের আড্ডায় (পার্ক, ক্লাব, ক্যাম্পাস , রাস্তার মোড়ে, রেস্টুরেন্ট বা ড্রয়িং রুম আড্ডায়) অংশগ্রহণ করতে হতো।

লেখালিখি মানুষজনকে তেমন একটা করতে হতো না পরীক্ষার খাতা, চাকুরির দরখাস্ত আর ভুল বানানে প্রেম পত্র লিখা ছাড়া। পরীক্ষার খাতায় যা লিখতো তাতো আমরা সবাই জানি মুখস্থ করে খাতায় বমি করা, আর চাকুরির দরখাস্ত লিখা সেটাও মুখস্থ বিদ্যা পাশাপাশি মাছি মারা কেরানির গল্পটাও মনে রাখবেন সুধী পাঠক। সব শেষ লিখা লিখির মাধ্যমটি বলেছিলাম প্রেম পত্র লিখা। তবে আজ মনে হয় একমাত্র প্রেম পত্র লিখতেই শুধুমাত্র আমাদের লেখনীর সৃজনশীলতা দেখাবার সুযোগ মিলতো।

প্রচুর চিন্তা করতে হতো কারণ নানা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দিয়ে প্রেম পত্র লিখতে হতো এবং কয়েক দিস্তা কাগজ বলী দেবার ফসল হতো এক পাতার নিরেট ভালোবাসার গল্প বা প্রেমের চিঠি যাকে আমরা একমাত্র মৌলিক লিখা বা সৃষ্টি বলতে পারি। আর হ্যাঁ, সমাজ ও চারিপাশের পরিবেশ নিয়ে চিন্তা করা আর লিখালিখির কাজটা একচেটিয়া লেখক, কবি, সাহিত্যিক আর মূল ধারার গণমাধ্যম গুলোর সাংবাদিকদেরই ছিল। কিন্তু সময় বদলেছে ,আজ মানুষ ফোনেও টেক্সট লিখে লিখে কথা বলে আর টুইটার, ফেসবুকতো আছেই নিজের ভাবনা প্রকাশের মাধ্যম যাকে আমরা ডিজিটাল বন্ধুদের আড্ডার স্থল বলি ।

আমি গত নয় বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছি, সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, ফেসবুকে বা ব্লগ এ লিখতে লিখতে গুণগত মানের চিন্তাশীল, সৃষ্টিশীল ভালো লেখক তৈরী হচ্ছে চারপাশে যা একটু মনোযোগ দিলেই দেখতে পাই, যদিও তারা সংখ্যায় খুবই কম । মানুষ অনেকের লিখাই হয়তো ফেসবুকে পড়ে না বা তারা হয়তো প্রফেশনাল বা নাম করা লেখক নয় আমাদের চোখে। এত এত পোস্ট এর ভিড়ে অনেকের লিখাই আমাদের পড়া হয়ে উঠে না কিন্তু পাঠকরা পড়ুক বা নাই পড়ুক, সমাজ তাদেরকে বড় মাপের লেখক বলুক আর নাই বলুক ,আমি ব্যক্তিগত ভাবে সম্মান করি সেই সকল নবীন সাহসী লেখকদের।

কারণ আমি দেখতে পাই মানুষ নিজেকে প্রকাশ করবার জন্য ফেসবুকের স্বাধীনতাটা উপভোগ করছে, অনেকের সাথে ভাব বিনিময় করে একধরণের মানসিক পরিতৃপ্তি পাচ্ছে, সাধারণত ভেবে না দেখা অনেক বিষয় নিয়ে ভাবতে শিখছে, ক্রিটিক্যালি চিন্তা করছে , প্রশ্ন করতে শিখেছে চারপাশের রাজনৈতিক, সামাজিক ভেদ-বৈষম্য, সুশাসনের সমস্যা,অবাধ দুর্নীতি, ক্ষমতাবানদের ক্ষমতার অপব্যবহার, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় গোঁড়ামী , সামাজিক কুসংস্কার,বিজ্ঞান এবং মানবাধিকার লংঘন নিয়ে, যা নিয়ে আমরা সচরাচর খোলাখুলি আলোচনা করতে ভয় পাই এবং সমাজ, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উৎসাহ যোগায় না সেসকল চ্যালেঞ্জিং প্রশ্ন করতে।

ফেসবুক এ যারা ক্রিটিক্যালি লিখছে তার মানে মানুষটি জাগ্রত তার চেতনায় এবং লেখনিতে। ডিজিটাল সামাজিক আড্ডার মাধ্যমে অন্যকে জাগাতে চেষ্টা করছে ,সচেতনতা তৈরী করতে চাচ্ছে বিভিন্ন সোশ্যাল জাস্টিস বিষয়ে । সমাজের আর দশটি মানুষ যারা আজও চিন্তার খোরাক নেই তেমন সব হিন্দি সিরিয়াল বা বাংলা ছবির গান, বা স্থূল রুচির বিনোদন মাধ্যমগুলো দেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকে অথবা এই ফেসবুকেই সাজসজ্জা, কি খাবার খাচ্ছে এবং কোথায় খাচ্ছে, মেধাহীন ভাবে ব্যক্তিগত প্রচারের উন্মাদনায় উন্মত্ত, আর অশালীনভাবে সামাজিক প্রতিপত্তি দেখানোপনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে তাদের চাইতে এই ইনফরমাল ভাবে লিখা লিখির দলটা অনেক উন্নতমানের চিন্তাশীল মানুষ এবং নিঃসন্দেহে তারা শ্রদ্ধা ভাজন ।

কারণ আমি দেখেছি তারা অনেকেই মানব জীবনের দুর্লভ অভিজ্ঞতা-লব্ধ দর্শন (Experiential learning) তুলে আনে তাদের লেখনীতে যা অনেক সময় গভীর ও চিরন্তন সত্যের প্রতি দিক নির্দেশনা দেয়। আর সমাজকে নিয়ে যারা ভাববে তারাই একদিন সমাজকে কিছু দেবার জন্য এগিয়ে আসবে নিজেদের অজান্তেই। হয়তো ইনফরমাল লিখা লিখির সেই অদৃশ্য প্রভাব বা এর কান্ট্রিবিউশনকে আমরা দেখতে পাইনা বলে এর গুরুত্ব বুঝিনা। কিন্তু চিন্তাশীল মানুষ তৈরী করাটাই কি শিক্ষার এবং জীবনের লক্ষ্য নয় ?

বিজ্ঞাপন

কারণ আমি বিশ্বাস করি ফেসবুক এর এই সাধারণ চিন্তাশীলতাই একদিন সৃষ্টিশীল, রুচিবান,তীক্ষ্ণ যুক্তিবাদী মানুষ তৈরী করবে। একজন সৃষ্টিশীল , রুচিবান মানুষের আত্মা কখনোই পরিবারের, সমাজের অমঙ্গলকর চিন্তা এবং কর্ম করবে না।

সম্প্রতি কোন বইটা পড়লাম, কি জানলাম সেই বই থেকে, বা কোন মুভিটা দেখলাম কেন অন্যদের দেখা উচিত, স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনা, যেকোনো সামাজিক বিষয়ে সচেতনতা তৈরীতে কথা বলবার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে নিজে উপকৃত হতে পারি এবং সমাজের জন্য ইতিবাচক প্রভাব তৈরী করা সম্ভব। অভিভাবকদের দায়িত্ব হবে ঘর থেকেই ছেলে মেয়েদের শিখিয়ে দেয়া কেমন করে, কোন বিষয় নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নিজ বক্তব্য তুলে ধরতে হবে। শিক্ষকরাও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে এ বিষয়ে। ছাত্র -ছাত্রীদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ভীষণ জরুরি এবং আমাদের দেশে তার অভাব রয়েছে তা আর নতুন করে নাই বা বললাম।

প্রযুক্তিকে খারাপ বলে দূরে সরিয়ে না দিয়ে এর যথাযথ ব্যবহার শিখে নেয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে আমি মনে করি। কর্পোরেট বাণিজ্যের শিকারে পরিণত হয়ে আমরা আজ সত্যের মুখোমুখি হতে ভুলে গেছি। রং মেখে সং সেজে একটা রাংতা কাগজের মতো চাকচিক্যময় জীবনকে তুলে ধরবার চেষ্টা করছি ফেইসবুক এর মাধ্যমে প্রতিনিয়ত। আমরা ভুলে যাই যে পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে যারা সাদা-সিদা আটপৌরে বেশে ও মনণে জীবন কাটাতে চান কারণ তারা জানেন যে গ্ল্যামার ক্ষণস্থায়ী এবং এই দেখানোর মধ্যে জীবনের অন্তর্নিহিত সত্য লুকিয়ে নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে যদি আমরা সামাজিক-মানবিক আন্দোলনের জন্য ব্যবহার করতে পারি তাহলে পৃথিবীটা হবে অন্যরকম সুন্দর আমরা কি এই বিষয়টা ভেবে দেখেছি কখনো ?

আসুন সবাই সৃষ্টিশীল, সকলের জন্য ইতিবাচক ভাবনা শেয়ার করার জন্য ফেইসবুক ব্যবহার করি, জন সচেতনতা তৈরী করবার জন্য এই স্পেসটিকে ব্যবহার করি, সেই সাথে কুশল বিনিময় , নিজেদের দৈনন্দিন জীবনের অর্জন, বিশেষ মুহূর্ত, দিন, ভালোলাগার স্মৃতি, খারাপ লাগা, হতাশা, জিজ্ঞাসা তাতো থাকবেই। অবাধে প্রকাশ করতে পারবার এবং জ্ঞানের রাজ্যে হারাবার এই স্বাধীনতাটুকুকে পুরোপুরি উপভোগ করবার সুযোগটা নেয়া উচিত এবং সুযোগটাকে কাজে লাগানো উচিত সৃষ্টিশীল ভাবনা এবং লেখনীর মাধ্যমে।

লিখালিখি করার জন্য বন্ধু মহল বা ক্লাব তৈরী করতে পারি (Writer’s Club) , আসুন ক্রমাগত লিখতে থাকি, ভাবতে থাকি আর ভাবনার আলোটা অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করি ফেইসবুক এর মাধ্যমে। আর হা আমরা পরমত অসহিষ্ণু জাতি এই কথাটাও মনে রাখবেন, অন্যের প্রতিবাদ, সমালোচনা পড়ে রেগে ফেসবুক একাউন্ট বন্ধ না করে বা মারামারি, কাটাকাটি না করে আসুন শৈল্পিকভাবে বিতর্ক করতে শিখি এই ফেইসবুক এর মাধ্যমেই। কারণ অনেকের কাছেই ফেসবুক তাদের কাছে ” যেমন ইচ্ছে লিখার কবিতার খাতা ” ঠিক শামসুর রহমানের মতন।

পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন আর এই গতিমান পৃথিবীর সাথে তাল মেলাতে হলে ফেসবুক, ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রতি নিয়ন্ত্রণ আনবার কথা না বলে বলুন গুণগত মানের ভাবনা (Quality of thoughts) ভাবতে হবে। আসলে কেমন করে কিভাবে সৃষ্টিশীল ভাবনা ভাবতে হয় সেটাও শিখতে হয়। কেউ আপনা থেকেই তেমন করে ভাবতে পারে আবার কেউ অন্যকে দেখে শেখে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এই সারা বিশ্বের বৈচিত্র্যময় ভাবনা গুলোকে দেখবার সুযোগ করে দেয়। গঠনমূলক সমালোচনা করা এবং বিতর্ক করতে শেখাও একটা শিক্ষা, যোগ্যতা, শিল্প এবং সবশেষে একটা অর্জন।

আসুন সকলে মিলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটিকে ভালোবেসে, সম্মানের সাথে, নিরাপদে ব্যবহার করি। ফেসবুক হোক সকলের পরিশীলিত ভাবনার বহিঃপ্রকাশ।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন