চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ
Partex Cable

ফেসবুকীয় সহিংস মানসিকতার বিষফোড়ার অস্ত্রোপচার!

Nagod
Bkash July

ছোটবেলার একটা গল্প দিয়েই আজকের লেখা শুরু করতে চাই। আমাদের ছোটবেলার অনেক কর্মই বড়বেলার চলার পথকে যেমন নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনি জীবনমানও সমৃদ্ধ করে বলে আমার বিশ্বাস। নিজের অভিজ্ঞতায়ও তা প্রমাণ মিলেছে বারংবার। ছোটবেলায় আমি ডায়েরি লিখতাম। আজও লিখি। নানান ধরনের কথা আছে সেই ডায়েরিতে। লিখি নিজের কথা, নিজের অনুভূতির কথা। থাকে পরিবার এবং সমাজ নিয়ে নানান ভাবনার কথা। আরো কতো শত গল্প থাকে সেই ডায়েরিতে! যেই কথাগুলো একান্তই আমার গল্প। এটাও এক ধরনের যোগাযোগ। যোগাযোগ বিদ্যায় যার নাম ‘অন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ’। সহজ কথায় নিজের সঙ্গে যোগাযোগ। এই গল্পগুলো গণমাধ্যমের জন্য নয়। ছোটবেলায় যখন ডায়েরি লিখতাম সেই কথা কাউকে জানাতে চাইতাম না। কারণ ডায়েরি মানেই তো ব্যক্তিগত। ব্যক্তিগত মনের ভাবনা সবার জন্য উন্মুক্ত করার নাম স্বাধীনতা নয়। ছোটবেলায় স্বাধীনতাবোধের এই শিক্ষার হাতেখড়ি পরিবার থেকে। আজও আমি ডায়েরি লিখি। আজও সেই ডায়েরির পাতায় আমার জন্যই আমি লিখি। আমার সঙ্গে আমার কথোপকথন বলতে পারেন। সেই লেখা কখনো একা বসে পড়ি আর মৃদু হাসি। বাংলাদেশের বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এবং অভিনেতা সুভাষ দত্তকে নিয়ে আলোকচিত্র প্রদর্শনীর কাজ করার সময় তিনি আমাকে বলেছিলেন- ‘নিজের সঙ্গে কথা বলতে পারাটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। এই কঠিন কাজটি রপ্ত করতে পারলেই তুমি সৃজনশীল মানুষ হতে পারবে। একই সাথে নেতিবাচকতা দূর করতে পারবে। মনে রেখো- সব কথা সবার জন্য উন্মুক্ত করতে নেই।’

Reneta June

এই লেখাটা যখন লিখতে বসেছি, বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি! হঠাৎ ১৯৯৫ সালের একটি কথা খুব মনে পড়ছে। আপনাদের সেই স্মৃতির কথা বলি তবে। তখন আমি মতিঝিল সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলাম। দশম শ্রেণীতে পড়ি। এসএসসি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি চলছে স্কুল জুড়ে। একদিন মনে প্রশ্ন জাগলো – কিছুদিন পর তো এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে সবাই চলে যাবো বিভিন্ন কলেজে, কিন্তু আমার বন্ধুরা আমাকে নিয়ে কি ভাবনা পোষণ করে? এটা তো জানা হলো না। যেই ভাবনা সেই মাঠে নেমে পড়া। উত্তর আমাকে জানতেই হবে। কি করা যায় ভাবতেই মাথায় একটা বুদ্ধি আসলো। সবাই তখন এসএসসি পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত। ঠিক সেই সময় আমি একখানা নতুন ডায়েরি কিনেছিলাম। নিশ্চয় মনে মনে ভাবছেন ডায়েরি কেনো? ভাববেন না কোচিং কিম্বা পরীক্ষার নোট করবার জন্য। আমি চেয়েছিলাম আমার স্কুলের বন্ধুরা আমাকে নিয়ে তাদের ধারণাগুলো সেই ডায়েরিতে যেনো লিখে দেয়। বলতে পারেন এক ধরনের চিঠির মতো ব্যাপারটা। কিছুটা মন্তব্যধর্মী প্রতিবেদনও বলতে পারেন। একটু জোর করার মতো বিষয় ছিলো বৈকি! আমার এই অনুসন্ধানী আচরণ সহজাত। ছোটবেলা থেকেই আমি প্রশ্ন করতে পছন্দ করতাম। পরিবার এবং বন্ধুরা আমার এই আচরণে মাঝে মাঝে বিরক্ত হলেও শেষ অবধি মেনে নিতো। অনুসন্ধানী আচরণের কারণ ‘তিন গোয়েন্দা’ সিরিজ অধিক পাঠের প্রভাব বলতে পারেন। অনেক বন্ধু বলতো – ‘সালমা বড় হলে নিশ্চয়ই সিআইডি হবে।’ শুনে আমি হাসতাম। পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়ার পাশাপাশি আমি ডায়েরিতে বন্ধুদের মন্তব্য নেয়ার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। এদিকে সকল বন্ধুদের পরীক্ষার চিন্তা। শুরুতে আমার বন্ধুরা রাগী রাগী চোখে তাকালেও আইডিয়া ভালো হওয়ায় সবাই সেই ডায়েরিতে আমাকে নিয়ে তাদের ভাবনা লিখে দিয়েছিলো খুশি মনে। তাদের ধারনা সম্বলিত সেই ডায়েরিখানা আজো আমার সঙ্গী। সেই ডায়েরিতে আমাকে খুশি করার চেয়েও আমাকে সমালোচনা করেই মন্তব্য প্রধান্য পেয়েছিলো। তবে সবই ছিলো গঠনমূলক। বন্ধুদের আমাকে নিয়ে সেই ভাবনাগুলো আজো আমার চলার পথে পাথেয়। কোনো বন্ধু আমাকে ক্ষুদে মাস্টার বলে আখ্যা দিয়েছিলো। কেউবা বলেছিলো ডাক্তার হলে খুব ভালো সেবা আমি দেশকে দিতে পারবো। কেউবা বলেছিলো আর্মি হলে দেশের জন্য লড়াই করলে বেশ মানাবে আমায়। অবশেষে বন্ধুদের ক্ষুদে মাস্টার আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকই হয়ে গেলাম।

এরপর স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে ভিকারুন নিসা নূন কলেজে ভর্তি হলাম। স্কুলের পুরনো কিছু বন্ধুদের সাথে যুক্ত হলো নতুন কিছু বন্ধু। সেখানে বন্ধুদের অভিনব সব কাজ চলতে থাকে। পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলো আমাদের আচরণে। কলেজের শ্রেণীকক্ষে আমরা খুব চিরকুট লিখতাম। ক্লাস চলাকালীন এতোক্ষণ কথা না বলে কি করে থাকবো! একটা তো উপায় বের করতেই হবে। বুদ্ধি আটতে শুরু করলাম। শুরু হলো তিন গোয়েন্দার ‘ভূত থেকে ভূতে’ স্টাইলে চিরকুট লিখা। মানবিকী অনুষদের বি শাখা ক্লাসের ১১ জন আমরা এই চিরকুট লিখার কাজটি খুবই পারদর্শিতার সাথে করতাম। দিন শেষে সেই চিরকুট আমার কাছে জমা হতো। আমি সেই চিরকুট পরীক্ষার খাতার মতো খুব যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করতাম। কেন করতাম, জানিনা। এটাই হয়তো সেই বয়সে আমাদের আনন্দের খোরাক ছিলো। মজার বিষয় সেই চিরকুটগুলো আজও আমার কাছে সংরক্ষিত আছে। কলেজ জীবনের এই চিরকুট লিখাটা স্কুল জীবনের ডায়েরি লিখার মতো আর ‘অন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ’ এ সীমাবদ্ধ থাকলো না। হয়ে পড়লো ‘দলীয় যোগাযোগ’। ক্লাস চলাকালীন যে কথা গুলো মনে আসতো আমরা ১১ বন্ধু চিরকুটের মাঝে দলীয় ভাবে সেই ভাবনা লিপিবদ্ধ করে রাখতাম। তবে ক্লাসকে বিরক্ত করে নয় কিন্তু।

আমার মতো আপনারাও নিশ্চয় অনেকেই ডায়েরি লেখেন। নিজের সাথে কথা বলার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম ডায়েরি – এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস। দ্বিমত করতেই পারেন। দ্বিমত কে বিরোধিতা করবো না। সব মানুষের জীবনে নিজস্ব কিছু বিষয় থাকে যা একান্তই নিজের । আবার কিছু বিষয় সবার জন্য উন্মুক্ত। চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে একটা বিষয় লক্ষণীয় – যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে আমাদের ডায়েরি লেখার অভ্যাসটা কমে যাচ্ছে। চিরকুট লেখায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ আছে কিনা আমার জানা নেই। পরিবারের স্কুল এবং কলেজ পড়ুয়াদের কাছে ডায়েরি বা চিরকুট লেখার বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে তারা মিটিমিটি হাসে। নিশ্চয় মনে মনে ভাবে কি পাগলের প্রলাপ বকছি!

যুগের এই পরিবর্তনের জন্য প্রযুক্তিকে দায়ী করতে চাইনা আমি। প্রযুক্তির সাথে আমার কোনো শক্রতাও নেই। প্রযুক্তি ব্যবহার বিধি নিয়ে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ আছে বৈকি। আমার ছোটবেলায় আমাকে আমার বাবা ডায়েরি উপহার দিতেন, সেই ডায়েরিতে যা ভালো লাগতো আমি লিখতাম। মাঝে মাঝে কবিতাও লিখতাম। তবে লজ্জায় সেটা কাউকে দেখানো হতো না। আমি মনে করি লজ্জা পাওয়ার এই অনুভূতি আমার ব্যক্তিগত এবং এটি গোপন করার যে অধিকার সেটা আমার স্বাধীনতা। ডায়েরি উপহার পেতে বেশ ভালো লাগতো আমার। তারিখ অনুযায়ী ঘটনা লিখে রাখতেও আমি খুব পছন্দ করতাম। আমার দাদা এবং বাবাকে দেখতাম ডায়েরিতে কি যেনো লিখেন। অন্যের ডায়েরি পড়া অন্যায়, তাই কখনো তাদের ডায়েরির পাতায় লুকানো কথাগুলো জানা হয়নি। জানার প্রবল ইচ্ছে হতো। কিন্তু পারিবারিক শিক্ষার প্রভাবে সেই ইচ্ছা নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছিলাম ছোটবেলা থেকেই। আমার মেয়ে রূপকথা। বয়স সবে ১২। জন্মের পরই আমি রূপকথাকে একটি ডায়েরি উপহার দিয়েছিলাম। যখন থেকে রূপকথা লিখতে শিখলো সেই ডায়েরিতে রূপকথা প্রতিদিনকার ঘুমের ভেতর দেখা স্বপ্নের কথা লিখে রাখে। আমাকে পড়ে শোনায় । কিন্তু আমি মেয়ের ডায়েরিও কোনোদিন গোপনে পড়িনি। কেননা ডায়েরির কথাগুলো একান্তই রূপকথার। রূপকথার মতো ছোট মানুষটির প্রাইভেসি বা গোপনীয়তাকে শ্রদ্ধা করা উচিত বলে আমি মনে করি। তার এই গোপনীয়তা বোধের যে অনুভূতি তার মাঝেই প্রকৃত স্বাধীনতা নিহিত বলে একজন মা হিসেবে আমার বিশ্বাস।

আপনারা নিশ্চয় ভাবছেন ডায়েরি নিয়ে কেনো এতো কথা বলছি! আমি অনুধাবন করতে পারছি, আমার লিখার শিরোনামের সাথে ডায়েরির এতো গল্প আপনাদের অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে হচ্ছে। ভাবাটাই স্বাভাবিক। মূল আলোচনায় যাবার আগে প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে বৈকি। ডায়েরির কথা বলছি এইজন্য যে, বর্তমান সময়ে আমরা ডায়েরিতে মনের কথা আর লিখিনা। ব্যতিক্রম থাকতে পারে। তাদের সংখ্যা বের করার জন্য গবেষণা আবশ্যক। তবে ফেসবুকীয় প্রদর্শনবাদীতা এতো ব্যাপকতা পেয়েছে যে, আজ আমাদের গোপনীয়তার বিষয়টি উন্মুক্ত পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে। আমার তো মনে হয় আমরা স্বাধীনতার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছি।

এই বিষয়ে একটি পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করতে চাই- একজন দম্পতির সংসার। দুজন মানুষ। একদিন তাদের বাড়িতে বেড়াতে এলো পুরুষ সদস্যটির বাবা-মা। এদিকে নারী সদস্যটি যেহেতু ঘরে জিন্স ফতুয়া পড়েন তাই শ্বশুড়- শাশুড়ির উপস্থিতিতে এই ধরনের পোষাক পরিধান করা বেমানান। তাই তার পোষাকে পরিবর্তন আসলো মনের বিরুদ্ধে। বেশ কিছুদিন পর নারী সদস্যটি পুরুষ সদস্যটির কাছে জানতে চাইলেন, তার বাবা – মা কবে যাবেন। কিছুদিন পর এই নিয়ে তাদের মাঝে বেশ মনোমালিন্য শুরু হলো। নারী সদস্যটি অভিযোগ করলো তার প্রাইভেসি যাকে আমরা বলি গোপনীয়তা তা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। কেননা তিনি তার পছন্দের পোশাক পরতে পারছেন না। একই সাথে নারী সদস্যটি তার স্বাধীনতা হারাচ্ছেন বলে অভিযোগ করলেন। কিন্তু সেই নারী সদস্যটি ফেসবুকে সকল প্রাইভেসি বা গোপনীয়তাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে নিজেকে প্রকাশ করার আনন্দে মত্ত।

গল্পটি এই জন্য বললাম- ঘরে আমাদের নিজেদের মানুষের কাছে আমাদের প্রাইভেসি বা স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হবার যে বোধ তৈরী হয় বা হচ্ছে সেটি অনেকের জীবনে ফেসবুকের ক্ষেত্রে অনুভূত হচ্ছে না। কেনো প্রশ্ন জাগে না ফেসবুকে নিজেকে বা নিজের ভাবনাকে উন্মুক্ত করে দিয়ে আমরা যেভাবে স্বাধীন হয়ে উঠতে মরিয়া তাতে আমাদের প্রাইভেসি বা গোপনীয়তা হারাচ্ছি? আমার – আপনার এই আচরণ পরিবারের ছোট সদস্যরা শুধু দেখছেই না, শিখছে। তারাও ধীরে ধীরে পারিবারিক জীবনের প্রাইভেসিকে তুলে দিচ্ছে ফেসবুকের কাছে। এবং নিজেকে স্বাধীন ভাবছে ভুল ভাবে। প্রক্রিয়াটি ভুল বলছি এই জন্য যে – আমাদের তো পরিবারের চেয়ে ফেসবুকেই বেশি প্রাইভেসি বা গোপনীয়তা থাকার কথা ছিলো। হচ্ছে একেবারে তার বিপরীত। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না- শিশুরা পরিবারের কাছে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে আচরণ শেখে এবং তার প্রয়োগ ঘটায়। সমাজ তো আসে অনেক পরে। কিছু ব্যতিক্রম থাকবেই। সেটি উদাহরণ হতে পারে না।

এবার আরেকটি পর্যবেক্ষণের গল্প বলি- একজন পরিবারের পুরুষ সদস্য পরিবারের মানুষের সঙ্গে ছবি তোলেন বটে কিন্তু সেগুলো যেনো ফেসবুকে পোস্ট করা না হয় সেই নিষেধাজ্ঞায় তিনি থাকেন অনড়। মজার বিষয় হলো, সেই একই ব্যক্তি কিন্তু বন্ধু মহল কিংবা সহকর্মীদের সাথে ছবি তুলছেন এবং দ্বিধা ছাড়াই তা ফেসবুকে পোস্ট করছেন। এবং অন্য কেউ পোস্ট করলে বাধাও দিচ্ছেন না। তবে পরিবারের ক্ষেত্রে তার এই নিষেধাজ্ঞা সত্যিই অবাক করার বিষয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই পুরুষ ব্যক্তিটিও পরিবারের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করাকে প্রাইভেসি বা গোপনীয়তা ভঙ্গের শামিল মনে করেন। আবার একই ব্যক্তি নিজে অন্য মহলে ছবি তুলে সেই ছবি ফেসবুকে পোস্ট করার ক্ষেত্রে কোন প্রাইভেসি বা গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হচ্ছে মনে করছেন না। কিন্তু পারিবারিক ছবি পোস্ট করাকে সেই ব্যক্তি গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করেন। একই ব্যক্তির মাঝে দুই ধরনের সত্ত্বা। একই বিষয়ে দুই ধরনের আচরণ প্রকাশ হতে দেখে সত্যিই এই বৈষম্যকে সমর্থন করাটা অযৌক্তিক। প্রকারন্তরে তিনি পারিবারিক আনন্দের যে স্বাধীনতাবোধ সেটা কিন্তু নষ্ট করছেন। কেননা পরিবারের সাথে তোলা ছবি পোস্ট করাতে যার অনীহা সেই ব্যক্তি বন্ধু বা সহকর্মীদের সঙ্গে তোলা ছবি দিব্যি ফেসবুকে পোস্ট করছেন। ফেসবুককে কেন্দ্র করে একই ব্যক্তির একই বিষয়ে দুই ধরনের মানসিক অবস্থান পরিবারের আনন্দ যেমন ক্ষুণ্ন করছে, তেমনি তার ব্যক্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

এ ধরনের আচরণ আমার -আপনার অনেকের পরিবারের প্রতিদিনকার চিত্র। এবারে একটু ফেসবুকের স্ট্যাটাস নিয়ে কথা বলতে চাই। এক সময়ে আমরা মনের কথা ডায়েরিতে লিখতাম। এখন এই চর্চা অনেকটা কমে গেছে। কমে গেছে এই জন্য বলছি – ফেসবুক খুললেই কারো না কারো, কোনো না কোনো মন্তব্য চোখে পড়ে। সেটা আমার অধ্যয়নের বিষয় বলতে পারেন। আমি ব্যক্তির পোস্টগুলোকে যদি আধেয় হিসেবে বিবেচনা করি তবে সেই আধেয় বিশ্লেষণ করতে আমার ভালো লাগে। সেই আধেয় বিশ্লেষণ করলে সেই ব্যক্তির আচরণ এবং পারিবারিক শিক্ষার একটা চিত্র অনুধাবন করা যায়। অনেকেই আছেন এমন ভাষায় পোস্ট করেন যেটা অধ্যয়ন করে রীতি মতো হুমকি স্বরূপ মনে হয়। সেখানে কোনো নান্দনিকতা বোধ দেখা যায় না। ডায়েরিতে যে কথাটি শুধু আমার, সেটি যখন আমরা ফেসবুকে লিখছি- সেটা যে আর লুকায়িত থাকছে না সেই জ্ঞান শূণ্যতার অভাব চোখ পড়ে বৈকি। ব্যক্তির ফেসবুকের পোস্টের সেই আধেয় বিশ্লেষণ করে স্পষ্ট বোঝা যায় তার ব্যক্তিত্ব, পারিবারিক এবং সামাজিক অবস্থান। এবং একই সাথে ব্যক্তির মানসিক অবস্থান। আমরা চাইলেই কি একে অপরকে ফেসবুকে গালি দিতে পারবো? ফেসবুকীয় কিছু মন্তব্য বিশ্লেষণ করে আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে গালি দেবার এই অধিকার কে নির্ধারণ করেছে? কিন্তু দ্বিধাহীন চিত্তে আমরা উন্মুক্ত ফেসবুকীয় প্ল্যাটফর্মে নিজের ভেতরকার সহিংস মানুষটাকে প্রতিনিয়ত প্রকাশ করে ফেলছি। এতে আমাদের কোনো অনুশোচনা হচ্ছে না। আবার কোনো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও নেই। আবার মজার বিষয় হচ্ছে- কেউ একজন একটি নেতিবাচক স্ট্যাটাস দিলে তার ফেসবুকীয় বন্ধুদের কেউ কেউ তাকে নিয়ন্ত্রণ না করে এমন সব পাল্টা নেতিবাচক মন্তব্য করেন তাতে মানুষের আচরণের স্বরূপতা দেখে আমি শঙ্কিত হয়ে পড়ি। আতঙ্কিত হই মানুষের মানসিক বিভৎসতার প্রকাশ দেখে। নেতিবাচক মানুষদের ভিড়ের সংখ্যা বৃদ্ধি দেখে আহত হই । তাই মাঝে মাঝে মনে হয় চলচ্চিত্রের মতো ‘সেন্সর শীপ’ ব্যবস্থা এই ফেসবুকীয় মন্তব্যের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা উচিত। কেননা একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী এতো ব্যভিচারী হতে পারেন না। কথায় আছে- অশালীনতা স্বাধীনতা নয়। আর স্বাধীনতা মানেই স্বেচ্ছাচারিতা নয়।

আমাদের সবার মনে রাখা উচিত- একজন নেতিবাচক ব্যক্তির মন্তব্য শুধু তার ব্যক্তিত্বের পরিচয়ই বহন করে না। এবং ফেসবুকের বদৌলতে সেই নেতিবাচকতা অগণিত পরিবারের সদস্যদের মননে খুব দ্রুত ছড়ায়। যোগাযোগের শিক্ষক হিসেবে বিশ্বাস করি – নেতিবাচক মন্তব্য অবশ্যই সেই ব্যক্তির নেতিবাচক মানসিকতারই বহি:প্রকাশ। একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী যা মন চাইলো, যেভাবে মন চাইলো লিখতে পারেন না। পারার কথাও নয়। এই স্বাধীনতাবোধের অধিকার কোথা থেকে ব্যক্তি পেলো? ফেসবুক ব্যবহারী কোনো ব্যক্তির নোংরা ভাবনা বিস্তার স্বাধীনতা নয়, আমার কাছে তা স্বেচ্ছাচারিতা। এই বিষয়ে নিয়ন্ত্রণবিধি থাকা উচিত বলে আমি মনে করি। কেননা একজন ব্যক্তির একটি নেতিবাচক মন্তব্য দেশ থেকে দেশের সীমানার বাইরের মানুষকে স্পর্শ করে। সেই নেতিবাচকতা ছড়িয়ে পড়ে ঘর থেকে সমাজে এবং রাষ্ট্রের জনগণ এভাবেই নেতিবাচক মানসিকতা নিয়ে জীবন সাজাতে থাকে। কখনো সচেতনভাবে, আবার কখনো অসচেতনভাবে।

ফেসবুকের আধেয় অধ্যয়ন করে আমার প্রথম প্রস্তাব- ফেসবুক ব্যবহারীদের নেতিবাচক আধেয় নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক। কেননা অন্যান্য গণমাধমের মতো ফেসবুকও আমাদের আচরণে প্রভাব ফেলে। অধিক স্বাধীনতা পেয়ে আমরা যখন নিয়ন্ত্রণহীন ফেসবুকীয় উন্মুক্ত পরিসরে অশালীন বক্তব্য প্রকাশ করছি- এই নোংরা মানসিকতার প্রকাশ অন্যদের আচরণে খুব সহজেই দ্রুততার সঙ্গে প্রভাব ফেলছে। এবং এই নেতিবাচক প্রভাব অল্প সময়ে ছড়িয়ে পড়ছে দেশ থেকে দেশান্তরে। একজন ফেসবুক ব্যবহারকারীর নেতিবাচক আচরণ অন্য মানুষকে নেতিবাচক পথে ধাবিত করার সক্ষমতা রাখে। একই ভাবে একটি ভালো উদ্যোগ বা একটি ইতিবাচক প্রতিবাদ জোরালো করতে এই ফেসবুকের ভূমিকা আমি স্বীকার করে নিচ্ছি। শুরুতেই স্পষ্ট করেছি প্রযুক্তির সাথে আমার কোনো বিরোধীতা নেই। তাই বলে প্রযুক্তি ব্যবহার করে অশালীন এবং স্বেচ্ছাচারী আচরণকে সমর্থন করার পক্ষপাতিও আমি নই। তাই ফেসবুক ব্যবহারীদের এতো স্বাধীনতা সঠিক নয় বলে আমার পর্যবেক্ষণ। কারণ আমরা স্বাধীনতার সম্মান দিতে শিখিনি। অনেক সময় দেখা যায় কিছু কথা ব্যক্তি ব্যক্তিতে হতে পারতো। মুখোমুখি কথা বলে অনেক তর্ক সমাধান করা যায়। কিম্বা জুম মিটিং করেও সমাধান হতে পারে। এতো বিকল্প ব্যবস্থা থাকতে কেনো ফেসবুকেই অশালীন ভাষায় কথা বলতে হবে? কেনো আমরা এতো মারমুখো হয়ে উঠছি? আবার নিজেদের এই নেতিবাচক এবং সহিংস আচরণকে স্বাধীনতা বলে দাবীও করছি। সবারই মনে রাখা উচিত- আপনার যেমন স্বাধীনতা আছে, তেমনি অন্য আরেকজন ইতিবাচক ব্যক্তি এবং পরিবারেরও শালীনভাবে বাঁচার সমান অধিকার আছে। তাই ফেসবুকীয় ব্যক্তিগত নেতিবাচক অভিমত নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। যদি কাউকে গালি দিতে চান – মেইল করুন, ফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠান। কিম্বা অন্য যে কোনো পদ্ধতি বেছে নিন। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে শুধরে নিন এবং দিন নিজেদের ভুলক্রুটি। ফেসবুকের উন্মুক্ত পরিসরে সহিংসতা ছড়ানোর অধিকার আমাদের কারোই নেই। আমাদের সবার স্মরণে রাখতে হবে- মন্দ কথা বলে কোনো স্থায়ী সমাধান কোনো দিন সম্ভব নয়। এতে কেবল সহিংসতাই বাড়ে।

ফেসবুকের স্ট্যাটাস অধ্যয়ন করে একজন মা হিসেবে আমি আমার সন্তানের ভবিষৎ ‘ভাবনা জগৎ’ নিয়ে চিন্তিত। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি আমার শিক্ষার্থীদের ‘জীবনবোধের আচরণ’ প্রকাশের ধরণ নিয়ে শঙ্কিত। ফেসবুকে সহিংস আচরণ প্রকাশ বন্ধ করতে হবে। বন্ধের প্রয়োজনে আইন বিধি প্রয়োগ করতে হবে। ফেসবুক আচরণ শেখাতে সক্ষম তাই ফেসবুকের ব্যবহার বিধিতে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আসা জরুরী বলে মনে করছি। ফেসবুকের প্রদর্শনবাদীতার বিষয়টি নিয়ে আরেকদিন কথা বলবো। যাই প্রদর্শন করুন না কেনো সেটা যেনো অন্য কোনো ব্যক্তি, সমাজ বা রাষ্ট্রের ক্ষতির কারণ না হয় সেটি বিবেচনায় রাখার অনুরোধ রইলো। অনেকেই বলেন, নোংরা বা নেতিবাচক ব্যক্তির মন্তব্য এগিয়ে যেতে বা সেই ব্যক্তিকে ব্লক করে দিতে। এটা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। বরং নেতিবাচক ব্যক্তিকে প্রতিহত করাটাই কাম্য। নোংরা বা নেতিবাচক ভাষায় পরিবর্তন আনা অসম্ভব। এটি কেবল একজন নেতিবাচক এবং সহিংস ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে। একই সাথে আমাদের পরিবার,সমাজ এবং রাষ্ট্রের জনগণকে নোংরা ভাষা শেখানোর পাশাপাশি, নেতিবাচক মানসিকতার ব্যক্তিতে পরিণত করছে। যোগাযোগের শিক্ষক হিসেবে এই বিষয়ে সতর্ক হবার সময় এসে গেছে বলে আমি মনে করি। সড়কে যেমন আমাদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ট্রাফিক পুলিশ আছে। সেই সাথে আছে লাল, সবুজ, হলুদ বাতির নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। ফেসবুক ব্যবহারকারীদের নেতিবাচক ভাষার ব্যবহার অধ্যয়ন করে ২০২১ সালে আমি দাবী জানাচ্ছি, ফেসবুকের নেতিবাচক ভাষা রোধে অবশ্যই সড়কের ট্রাফিক ব্যবস্থার মতো কোনো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু হওয়া জরুরী। রাষ্ট্রের কাছে দাবী থাকলো -কিছু নেতিবাচক এবং সহিংস ব্যক্তির হীন মানসিকতা রোধে প্রয়োজনে ফেসবুক ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছুটা কঠোর নিয়ন্ত্রণ আনা জরুরী। প্রয়োজনে আইন প্রয়োগ করে হলেও। অন্যথায় ফেসবুকীয় সহিংস মানসিকতার বিষফোড়া অস্ত্রোপচার করেও কোন লাভ হবে না।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

BSH
Bellow Post-Green View