চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ফিরে ফিরে এসো আমার বসন্ত হয়ে

সখি,
পত্রের শুরুতে তোমার প্রতি রইলো ভালোবাসা। বহুদিন পর লিখছি তোমায়। কিছু না হলেও দুই যুগ তো হবেই। সেই কবে লিখেছিলাম ভালো মনেও নেই। আর এখন তো চিঠি পত্তরের দিনই নেই। কেউ চিঠি লিখে না। তবে আমি প্রায় তোমার কাছে মনে মনে চিঠি লিখি। আজ হঠাৎ মনে হলো বসেই তো আছি, লিখি একখানা চিঠি। পোস্ট না হয় নাই করলাম। তোমার বাবা মারা যাওয়ার পর তোমরা হুট করেই চলে গেলে নোনা দেয়ালের দেড়তলা বাড়িটা বিক্রি করে। তারপর থেকে মনে হয় এমুখো আর হওনি। কিন্তু আমার আসা যাওয়ার পথে সিমেন্ট লাগা তোমাদের টিনের ওই গেটের প্রতি এক ধরনের মায়া পড়ে গিয়েছিলো। ভেতরে তুমি নেই জেনেও তাকাতে আমাকে হতোই। স্পষ্ট মনে আছে সাদা চকে লেখা ৭৭৭ নাম্বার বাসা ছিলো তোমাদের। পাচিল টপকে কতো গেছি তোমাকে চিরকুট দেবো বলে। হাত পা ছিলে একাকার। তুমি হয়তো জানোই না মস্ত এক দালান উঠেছে ওইখানে। প্রায় দেখি দোতলার বেলকোনিতে ধবধবে ফর্সা এক মহিলা বসে ইংরেজি পত্রিকা পড়েন। আমার তো আর এপাড়া ছাড়া হয়নি তাই এসব রোজই দেখতে হয়।

তোমার কি চাঁন চাচার দোকানের কথা মনে আছে ? স্কুল ছুটির পর যেখানে আমি দাঁড়িয়ে থাকতাম তোমাকে একটিবার দেখবো বলে। সে দোকান আর নেই। বিশাল ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। চাচা মারা গেছেন। তার ছেলেরা চালায়। আমাকে দেখলেই চা খেয়ে যেতে বলে। ওদের হয়তো ধারণা আমি সেই থেকে এখনো চা খেতেই ওদিকে যাই। হা হা হা। সবই বদলে গেছে। তুমি আসলে চিনতেই পারবে না। তবু এসো একদিন তোমার প্রথম প্রেমের পাড়ায়। সব বদলে গেলেও আমাদের স্কুলে সেই বুড়– আম গাছটার কথা মনে আছে তো? ও ব্যচাড়া এখনো ওমনিই আছে। পৌষ মাসের বুড়ির ফাটা পায়ের মতো শরীর। একবার আমি তোমার নামের প্রথম অক্ষর যোগ আমার নামের প্রথম অক্ষর লিখেছিলাম বলে সে তোমার কি রাগ! শোন, আমি গিয়ে দেখে এসেছি । ওলেখা মুছে গেছে সেই কবেই। তবে ঠিক ওই জায়গায় গাছের শরীরটা একটু অন্য রকম হয়ে আছে। যেমন আমার ভেতরে তোমার নামটা মুছে গেলেও ঠিক একটা যায়গা কেমন জানি দাগ রয়ে গেছে, সেই রকম।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষে যেবার প্রথম তোমার গালে চুমু খেলাম, মনে আছে তোমার? দৌড়ে পালাতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে আমার বাঁ পায়ের বুড়ো নখটাই উঠে গেলো। সে কি রক্তারক্তি অবস্থা। পরের ৭দিন তো স্কুলেই যেতে পারলাম না। তখনই বুঝেছিলাম তোমার সাথে আমার হবে না। তাও কেন জানি তোমাকেই খুব ভালো লাগতো। রোগা লিকলিকে শ্যাম বর্ণের ভাসা ভাসা চোখের কোন কিশোরীকে দেখলেই কেন জানি মনে হয় এই হয়তো তুমি। বয়সের সাথে তুমি যে আমারই মতো বদলে গেছো তা আর মনে থাকে না। তবে এখন তোমাকে আর প্রেমিকা মনে হয় না। এখন তোমাকে আমার গান বা কবিতা মনে হয়। চিঠি লেখার একজন মানুষ মনে হয়। মনে হয় কেউ একজন আছে খুব গোপনে অল্প একটু যায়গা জুড়ে, তবে পুরোটাই আমার হয়ে। যেখানে আর কেউ নেই। যেখানে তোমার আসা যাওয়া সবই আমার নিয়ন্ত্রণাধীন। এই যে দেখ না হটাৎ ফাগুনের বাতাস ছাড়লো তোমাকে লিখতে বসে গেলাম। এ চিঠি পোস্টের কোন তাড়া নেই, নেই ঠিকানাও। তুমি আমাকে চির কিশোর বানিয়ে গেছো।

জানি না তুমি কেমন আছো ? কোথায় আছো ? তবে তোমার কথা যখনই মড়ে পড়ে আমি কিশোর হয়ে উঠি। আমি প্রেমময় ছটছটে সদ্য কৈশোরে পা রাখা গোপন প্রেমিক হয়ে ওঠি। মনে হয় আমার কোন বয়স নেই , ঝলমলে আমি নিজেই চির বসন্ত। তুমি না থাকলে তো আর এসব হতো না। তাই তোমার কাছে আমার অনেক ঋণ। যে ঋণ শোধরাবার কোন ইচ্ছে আমার নেই। তোমার সাথে একটা দেনা পাওয়ার হিসেব না হয় অমীমাংসিত থেকে যাক। ভালো থেকো আমার ক্লাস টেন এর বইয়ের ভাঁজে শুকনো ফুল হয়ে। কিংবা ভালো থেকো বিশ্ববিদ্যালয় লেখা নিউজ প্রিন্টের খাতার শেষ পৃষ্ঠায় লেখা সাংকেতিক ভাষায় ভালোবাসা হয়ে। ভালো থেকো রোজ স্কুল ছুটির পরে আড়চোখে তাকানো চতুরতা হয়ে। প্রথম চুমুর অনুভূতি কিংবা প্রথম কষ্টের রাত হয়ে। তবু তুমি থেকো। ফিরে ফিরে এসো আমার বসন্ত হয়ে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View