চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রিয় অগ্রজ আবু কায়সার

বাংলা শিশু সাহিত্যে যে কজন প্রতিভাবান আর মেধাবী লেখক রয়েছেন তাদের মধ্যে আবু কায়সার অন্যতম। তিনি যে লেখাগুলো লিখেছেন তা আমাদের শিশুসাহিত্যের ভুবনের দিগন্তকে বিস্তার করেছে অনেকভাবে, অনেক মাত্রায় কি বিষয়ের বহুমাত্রিকতায় কি গদ্যের প্রাঞ্জলতায়। তাঁর লেখার অনুরাগী পাঠক ১৯৮৬ সাল থেকে।

বিজ্ঞাপন

রামকৃষ্ণ মিশন রোডের ইত্তেফাকের রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের রুমে প্রথম পরিচয়- প্রথম পরিচয়েই তিনি অনুজের কাতার থেকে আমাকে নিয়ে গেলেন অনেক উচ্চতায়- এটাই ছিল লেখক কায়সার ভাইয়ের যোগ্যতা, মানুষ কায়সার ভাইয়ের গুণ।

বিজ্ঞাপন

তখন খেলাঘরের সাহিত্য বাসরের আড্ডা জমত শান্তিনগরের পীর সাহেবের গলির এক বাসায়। ১৯৮৬ সালে কলেজে পড়ি- লেখা নিয়ে যেতাম সেখানে। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই রিটন ভাই, আলী ইমাম ভাই, ফারুক নওয়াজ ভাই, আমীরুল ভাই, বিপ্লব দাশ, নিরঞ্জন অধিকারী, সিরাজুল ফরিদসহ আরও অনেকেই নিয়ম করে নিষ্ঠার সঙ্গে সাহিত্য বাসরে আমাদের পঠিত লেখার তুলোধুনো করতেন।

তো একদিন একজন খেলাঘরের সাহিত্যবাসরের আলোচক হয়ে এলেন- ছোটোখাটো গড়নের মানুষ। রিটন ভাই আর আমীরুল ভাই আমাদের বললেন,

‘আইজকা কে আইব জানো তো? রায়হানের রাজহাঁস আইব। বুঝবা ঠ্যালা-‘

সাহিত্যবাসরে তিনি আমাদের লেখা নিয়ে আলোচনা করলেন। তার আলোচনা শুনে আমাদের লিখিয়েরা মুগ্ধ হলাম। তাঁর আলোচনা শুনে মনে হল আবু কায়সার নামের মানুষটা অসম্ভব রকমের রসিক একজন মানুষ। কথা বলেন কম তবে যা বলেন তা একেবারে ভেতরে গিয়ে লাগে।

সাহিত্যবাসরের পর কায়সার ভাইয়ের সঙ্গে কথা হল। তারপর সেই কথা বলাটা চলতেই থাকল। সারাটা জীবন অনিশ্চয়তায় ঘেরা পত্রিকায় কাজ করেছেন। পত্রিকায় এমাসে কাজ আছে তো পরের মাসে ‘চাট্টি-পাট্টি’ গোল। মাঝে মাঝে কায়সার ভাই গলায় আক্ষেপ এনে আমাদের বলতেন, ‘ শোনো, আর যা-ই করো পত্রিকায় কাম কইরো না।’

কায়সার ভাইকে খুব কাছে থেকে দেখা হয়ে ওঠেনি আমার তবে তাঁর অনেক কথা শুনেছি অগ্রজদের কাছে। বৈষয়িক ছিলেন না বলে সারাজীবন কষ্ট করেছেন তবে যা লিখে গেছেন তা হয়ে রয়েছে সম্পদ- আমাদের শিশুসাহিত্যের এক দামী সম্পদ।

অসম্ভব শক্তিশালী লেখক ছিলেন তিনি। তাঁর হাতের জাদুতে সোনা ফলত। কিন্তু ঐ যে গুরুবাক্য আছে না- আমাদের দেশে যে শক্তিমানদের কপালে শান্তি নেই, ভাত নেই, প্রাপ্তিযোগ নেই, সম্মাননা নেই। তাই জীবিতকালে আবু কায়সারের লেখক জীবনে পাঠকের ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই জোটেনি।

জীবিতকালে তিনি তাঁর লেখার কাজটুকু অপার ভালোবেসে করে গেছেন তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।

আজ আবু কায়সারের মৃত্যু দিন। ২০০৫ সালের এই দিনে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন কিন্তু বাংলা শিশুসাহিত্যে রয়ে গেছেন আজন্ম।