চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রাণ ফিরে পাচ্ছে সিডনী

সিডনীকে বলা হয় ‘রঙের শহর’। সিডনীর বছর শেষের এবং শুরুর আতশবাজি পৃথিবিবিখ্যাত। সেখানে আতশবাজির শুরুতে যে চলচ্চিত্র দেখানো হয় সেখানে সিডনীকে উপস্থাপন করা হয় ‘সিটি অব কালারস’ হিসাবে। প্রকৃত অর্থেও সিডনী আসলেই রঙের শহর। রঙ যেমন এর প্রকৃতিতে তেমনি এখানে বসবাসরত মানুষের মধ্যে। পঞ্জিকা অনুযায়ী এখানে চার ঋতু – গ্রীষ্ম, শরত, শীত এবং বসন্ত। ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে সিডনীর রঙ বদলে যায়। গ্রীষ্মের সিডনী তপ্ত এক নগরী। তাপমাত্রা কখনও কখনও পঞ্চাশের ঘর ছাড়িয়ে যায়। শরতের শুরুতেই সিডনীর গাছগুলোর পাতা বাহারি রঙে নিজেদের রাঙিয়ে নেয়। এরপর শীতের সিডনী যেন নির্জীব এক শহর। গাছগুলো তখন পাতা ঝরিয়ে যেন বিশ্রাম নেয় আর তৈরি হয় বসন্তের জন্য। এরপর বসন্ত আসলেই সিডনী আবার নববধূর মতো লকলকে সবুজে সেজে উঠে।

আর সিডনীর অধিবাসীদের মধ্যে রঙের বাহার তো বিশ্ব বিদিত। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে সিডনীতে এসে বসবাস করছে। এছাড়াও প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ বিনোদনের জন্য বেড়াতে আসেন সিডনীতে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ বসবাসের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে এখানে সারা বছরই কোন না কোন উৎসব লেগেই থাকে। আর তারই সাথে তাল মিলিয়ে সিডনীর রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে ইমারতগুলোও সেজে উঠে। এছাড়াও সিডনীর নিজস্ব কিছু উৎসব থাকে বছর জুড়ে। বিশেষকরে শীতকালের নির্জীব সিডনীকে সজীব রাখতে আয়োজন করা হয় চোখ ধাঁধানো এক আলোক উৎসবের। এই আলোক উৎসব ‘ভিভিড সিডনী’ নামে পরিচিত। এভাবেই সিডনী হয়ে উঠে রঙের নগরী।

কিন্তু গত প্রায় দুবছরের লকডাউনের ফলে সিডনীর কোন উৎসবই আলোর মুখ দেখেনি। যার ফলে সিডনী যেন তার রঙ হারিয়ে একেবারে শীতকালের গাছের মতো ধূসর বর্ণ ধারণ করেছিলো। অবশেষে করোনার টীকা গ্রহণের নির্দিষ্ট হার অর্জিত হবার পর লকডাউন শিথিল করা হয়েছে। যদিও সিডনীর অধিবাসীদের দেখলে মনেহবে যেন লকডাউন পুরোপুরি উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। অবশ্য এখনও জনসমাগমের স্থান যেমন শপিংমল ও জনপরিবহনে মাস্ক বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে। এছাড়াও সব জায়গাতেই পরিপূর্ণ টীকাদানের ছাড়পত্র ও কিউ আর কোড স্ক্যান করে প্রবেশ করতে হচ্ছে। কিন্তু এতেকরে উৎসব প্রিয় সিডনীবাসীকে আটকে রাখা সম্ভব হচ্ছে। তারা মুক্তির আনন্দে বের হয়ে এসেছে। উৎসবের ছোট খাটো অনুষঙ্গকে কেন্দ্র করেই আনন্দ করছেন।

গত ২৫ অক্টোবর থেকে লকডাউন শিথিল করার পর আমরা ৩০ অক্টোবর প্রথম বের হয়েছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল হারবার ব্রিজ এ যাওয়া। অবশ্য হারবার ব্রিজ আর অপেরা হাউস কাছাকাছি হওয়াতে একইসাথে দুটোই দেখা হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের এবারের লক্ষ্য ছিল হারবার ব্রিজের শুরুর জায়গাটা যেটাকে বলা হয় ‘দি রকস’। সেখানে নেটফ্লিক্সের বর্তমানের সবচেয়ে জনপ্রিয় সিরিজ ‘স্কুইড গেম’র প্রথম খেলা ‘রেড লাইট, গ্রীণ লাইট’ যেটা অনেকটা বাংলাদেশের বরফ পানি খেলার মতো। এই সিরিজে দেখানো হয়েছে একটা হলুদ রঙের পুতুল এই খেলাটা পরিচালনা করে। সেই পুতুলেরই একটা রেপ্লিকা স্থাপন করা হয়েছে দি রকস-এ। সার্কুলার কিয়ে স্টেশন থেকে মিনিট পাঁচেকের হাঁটাপথ।

বিজ্ঞাপন

স্টেশন থেকে বের হয়েই আমরা যেন জনস্রোতে মিশে গেলাম। অনেকদিন পর একসাথে এতো মানুষ দেখে খুবই ভালো লাগছিল। আর ৩১ অক্টোবর ২০২১ সারা অস্ট্রেলিয়া জুড়ে পালিত হবে ‘হ্যালোইন’ উৎসব তাই তরুণ তরুণী থেকে শুরু করে শিশুদের পোশাক আশাকে ছিল তার ছোঁয়া। তারা বাহারি সব সাজে সেজে চলাচল করছিলো। যারফলে মনে হচ্ছিল যেন গত দুবছরের ধূসর সিডনীর গাঁয়ে একটু একটু করে রঙের ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে। যাওয়ার পথে সিডনী অপেরা হাউসকে পেছনে রেখে আমরা একটা গ্রুপ ছবি তুলে নিলাম। যেমন প্রথমবার কেউ সিডনী আসলে সবাই ছবি তুলে। অতিমারীর সময় পেরিয়ে আমরাও যেন সিডনীকে আবার নতুন করে আবিষ্কার করলাম। এরপর ‘স্কুইড গেম’র পুতুলের সাথে ছবি তুলে আমরা উদ্দেশ্যবিহীন হাটা শুরু করলাম।

এই উদ্দেশ্যবিহীন হাঁটাহাঁটিও আমরা খুবই উপভোগ করছিলাম। পথেপথে মানুষের কলরব। আহা কতদিন পর সেই পুরনো কোলাহলে ফেরা। অনেকেই ছবি তুলছেন পরিবারের সাথে। আমরা যেমন অনেকের পারিবারিক ছবি তুলে দিতে সাহায্য করলাম ঠিক তেমনি অনেকেই আমাদেরও সাহায্য করল। এভাবেই হাঁটতে হাঁটতে ক্ষুধা পেয়ে গিয়েছিল সবার। তখন রাস্তার একটা স্প্যানিশ টং দোকান থেকে বাংলাদেশের খিচুড়ির মতো একটা খাবার কিনে উদরপূর্তি করে খেয়া নেয়া হলো। পাশাপাশি বড়দের জন্য কফি আর ছোটদের জন্য নেয়া হলো আইসক্রিম। এভাবেই একসময় বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা পার হয়ে রাত হয়ে গেল কিন্তু আমাদের ফেরার কথা মনে ছিল না। মানুষের এই মুখর পদচারণ যেন জীবনের প্রতিচ্ছবি। অতিমারীর দমবন্ধ সময় পেরিয়ে মানুষ যেন একটু বুকভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। পথে পথে মানুষের কোলাহল যেন গেয়ে চলেছে নবজীবনের জয়গান।
প্রকৃতির নিয়মে সময় ডানায় ভর করে সিডনীতে এসেছে শীতের পর বসন্ত। গাছে গাছে নতুন পাতা আর ফুলের মেলা।

অস্ট্রেলিয়ার বসন্তের সিগনেচার ফুল জ্যাকারান্ডা ফুটতে শুরু করেছে। শীতের নির্জীব গাছে পাতা আশার আগেই বেগুনী রঙের এই ফুল ফুটে গাছটাকে একেবারে পুরোপুরি বেগুনী রঙের চাদরে ঢেকে দেয়। পাখির চোখে তখন সিডনী শহরকে দেখলে মনে হবে যেন কোন নিপুণ শিল্পী মনের আনন্দে সিডনী শহরকে বেগুনী রঙে রাঙিয়ে দিয়েছেন। অবশ্য বসন্তের একেবারে শুরুতেই অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় ফুল ‘দি ইয়োলো ওয়াটল’ ফুটে তখন চারপাশটা সোনালী রঙে ছেয়ে যায়। এর পাশাপাশি আরও হাজারও রকমের ফুল ফোটে গাছে গাছে। ‘ফ্লেম ট্রি’ বলে এক ধরনের গাছে আসে আগুন্রঙ্গের লাল ফুল। বাংলাদেশের যেমন ‘পলাশ শিমুল বনে আগুন লাগে’ এখানে ঠিক তেমনি পাতাবিহীন ফ্লেম ট্রিতে আগুন লেগে যায়। এজন্যই হয়তোবা এই গাছের এমন নামকরণ।

আমাদের আশা সিডনী তথা পুরো বিশ্বই খুব দ্রুত যেন অতিমারীর এই প্রকোপ কাটিয়ে উঠে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। রঙ লাগবে বিশ্বে, রঙ লাগবে সিডনীতে। প্রকৃতির রঙের পাশাপাশি মানুষের উতসবমুখর পদচারনায় আবারও মুখরিত হয়ে উঠবে সিডনীর পথঘাট, বিপনিবিতান থেকে শুরু করে সব জায়গা। আবারও প্রাণ ফিরে আসুক সিডনীতে। আবারও সিডনী হয়ে উঠুক রঙের শহর।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন