চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রাণের গহীনে যে আছে, তাকেই খুঁজে ফেরা

মৌসুমী শুক্লার কাব্যগ্রন্থ “মনোকুঞ্জে মধুকর”

মনের মধ্যে কুঞ্জবন। সেখানে এক মধুকর। নিত্য ঘোরাঘুরি, ওড়াউড়ি তার। বারবার ফিরে ফিরে যেতে চাই তারই কাছে নিজের একান্ত গহীনে যার নিত্য অধিষ্ঠান। সেই গন্তব্য, সেই মধুকর হচ্ছে স্মৃতি।

স্মৃতি মানে এই আমির আগের একটা সংষ্করণ। তার সাথে চারপাশের মানুষ আর পরিপার্শ্বিকের সেই সময়ের সংষ্করণ। মৌসুমী শুক্লার ‘মনোকুঞ্জে মধুকর’ কাব্যের পাতায় পাতায় ফেলে আসা আমির কাছে ফিরে যাবার সেই আকুতি । কবি খুব পরিষ্কার করেই বলেন, “আমার আমিকে ফিরে পেতে চাই/ শৈশবের নিষ্পাপ আনন্দে/ ছোট ছোট প্রাপ্তির সুখে।”

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

একটা জটিল সামাজিক বিন্যাসে, স্ট্রেসফুল সময় ও প্রতিবেশের মধ্যে জীবনগুলো তালহীন; সম্পর্কগুলোও জটিল। এখানে কখনো কখনো ভালবাসা গিয়ে ঠেকে কেবলই পরস্পরকে সহ্য করার মধ্যে। এসবের মধ্যে সেই মধুকরকে বয়ে নিয়ে বেড়ানো একান্ত নিভৃতে। এ এক গভীর অন্তর্গত অনুভব। গভীর সেই অনুভবকে কবি তুলে ধরেছেন অত্যন্ত সাবলীল ভাষায়। লাইনের পর লাইন চোখকে টানে, মনকে ধরে রাখে। কারণ কবিতাগুলোতে পাঠক নিজেকে খুঁজে পাবার অবকাশ পান।

পাওয়া না পাওয়া, হিসেবের ভুল অথবা পাওয়ার ইচ্ছে হারিয়ে ফেলা সময়ের স্রোতে। তবুও জীবন বহমান থাকে, বাঁক নেয় কখনো হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে ভালোর দিকে; অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কখনো খারাপের  দিকে। বিশ্বাস হারানোর চেয়ে বড় কোনো হারানো হয় না। মানবীয় সম্পর্কের অনাকাঙ্ক্ষিত বাঁকগুলোতে এসে একথাই কবি লেখেন “হারানো বিশ্বাস ফেরে না/ যেমন ফেরে না মৃতেরা”। তিনি মনে করেন, পুড়ে যাওয়া বনভূমিতে নতুন উদ্ভিদরাজি জন্মালেও “ক্ষত একটা থেকেই যায়”।

সকল চাওয়াকে একটি গোলাপে সংক্ষিপ্ত করে আঁকবার দিনে প্রত্যাশা তো থাকেই অন্যজন বুঝবে এই একটি গোলাপ কেবল একটি গোলাপমাত্র নয়; জীবনের সকল সুন্দর চাওয়ার একীভূত রূপ। অথবা সুন্দর এটি জীবনের রূপক। একথা ভুলে গেলে, “মাঝরাতে গাছের পাতার আড়ালে/ মায়াবী আলো ছড়িয়ে/ ঝিরিরিঝিরি হাওয়ায়/ জ্যোৎস্না বিলিয়ে দেয়া/ চাঁদের সাথে” তার আর কথা হবে না।

বিজ্ঞাপন

এতেই ফুটে ওঠে কবির মনের নিজেকে হারিয়ে ফেলার বেদনা। তখনই প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয় “আকাশের মতো অন্তহীন হৃদয়ের/ একচ্ছত্র আধিপত্য/ শুধুই তোমার।/ কথাটা বলে খুব ভুল করেছিলে/ তাই না?” সেই আবেগ থেকে ফিরে এসে কবি একই কবিতায় বলেন, “অপূর্ণতা এড়িয়ে যাওয়াই শ্রেয় নয় কি?/ সময়ের অপচয়ে কী লাভ?” এখানে কবি মনোভূমের অধিবাসী নন। জটিল সময়ে জটিল শহরের একজন প্রাত্যহিক নাগরিক। এই দুই আমির কখনো সংঘর্ষ, কখনো বোঝাপড়া এই যে দ্বৈততা মানুষের- সেটাকে কবিতায় তুলে আনা সহজ নয়। মৌসুমী শুক্লা তা করতে পেরেছেন সাবলীলভাবেই।

এর মধ্যে সুন্দরের বলি হওয়ার খবর আছে। তা নিয়ে অন্যদের দুশ্চিন্তা না হওয়ার খবর আছে। কবি লিখেছেন “যুপকাষ্ঠে যে পশুর বলি হয়/ তার কথা কে শোনে?/ তাকে তো তখন উৎসর্গ করা হয়।/ মুক্তি দিয়ে পূণ্যবান করার আনন্দে সবাই মত্ত।” এই মনখারাপের খবরের মধ্যে কবি বলে ওঠেন, “গভীর আলিঙ্গনে শুনতে চেয়েছি/ তার প্রাণস্পন্দন/ অনুভূতির নিবিড় মমত্ববোধে কেবলই/ বেঁচে থাকার নিমন্ত্রণ”। এসব নিয়েই তো আমরা বেঁচে থাকি।

কবিতার কতোটা ভাব, কতোটা ভাষা আর কতোটা ব্যাকরণ সেসব বিতর্কের বাইরে থেকে ভালোলাগার মুগ্ধতা নিয়ে পড়ে যাওয়ার মতো আটান্নটি কবিতার এই সংকলন। খুব কাছাকাছি মনোভাব প্রকাশ করছে এরকম কতোগুলো কবিতা যে পুনরুল্লেখের বিরক্তি না এনে বরং একটু একটু করে আরো বেশি আচ্ছন্ন করে ফেলতে পারে সেই বোধই “মনোকুঞ্জে মধুকর” কাব্যগ্রন্থ থেকে একটি বড় প্রাপ্তি।

“দূরের ওই পথটা কেবলই একদার/ সুখস্মৃতিময় মায়াবী আবেগের সঙ্গী/ অস্ফুট অভিমানের নিশ্চুপ কান্না”। সবার জীবনেই থাকে একদার একটা পথ। সময়ের বিবেচনায় দূরে; কিন্তু অনুভবের বিবেচনায় একান্ত কাছে। মৌসুমীর শুক্লার কবিতার হাত ধরে সেই পথে আরেকবার হাঁটবার জন্য পাঠককে আমন্ত্রণ জানাই।

মনোকুঞ্জে মধুকর
মৌসুমী শুক্লা
প্রকাশক চন্দ্রদীপ
মূল্য ১৫০ টাকা

 

 লেখক: তাপস বড়ুয়া