চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রম: আশা ও আশঙ্কা

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা তৈরি করেছে। বলা হচ্ছে, রূপরেখা ২০২১ সালের মাঝামাঝিতে চূড়ান্ত করার পর ২০২২ সাল থেকে এর বাস্তবায়ন শুরু হবে। নতুন শিক্ষাক্রম সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক মত দেওয়ার সময় পেরিয়ে গেলেও আমি মনে করি, এর কিছু বিষয় নিয়ে, বিশেষত বাস্তবায়ন কৌশল নিয়ে, এখনও গভীর ভাবনার অবকাশ রয়েছে।

রূপরেখার শুরুতেই বর্ণনা করা হয়েছে কেন এবং কীভাবে প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমটি প্রণয়ন করা হয়েছে। জানানো হয়েছে, ২০১২ সালে প্রণীত সর্বশেষ শিক্ষাক্রম নিয়ে নানা গবেষণা করা হয়েছে। এও উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত ড. কুদরাত-এ-খুদার নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশন প্রতিবেদন প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমের অন্যতম ভিত্তি। নিঃসন্দেহে এটি ইতিবাচক যে, গবেষণার ভিত্তিতে প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমটি প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান শিক্ষাক্রমের কোথায় ঘাটতি ছিলো, কোন কোন বিষয় বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি এবং কেন সম্ভব হয়নি এসব বিষয়ের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। যেকোনো গবেষণাই পূর্ণতা পায় তার ফলাফল বিস্তরণের মাধ্যমে। এনসিটিবির যেসব গবেষণা করেছে, সেগুলোর ফলাফল বিস্তারিত জানতে পারলে বর্তমান ও প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমের ফারাকটি অনুধাবন সহজতর হতো। ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমের অন্যতম ভিত্তি ছিলো ২০১০-এর শিক্ষানীতি। এই শিক্ষানীতিটি বহাল থাকা সত্ত্বেও কেন খুদা কমিশন প্রতিবেদনকে অন্যতম ভিত্তি করা হলো তার অ্যাকাডেমিক ব্যাখ্যা আমি পুরোপুরি অনুধাবন করতে সক্ষম হইনি। বাংলাদেশে এ-পর্যন্ত যতোগুলো শিক্ষা কমিশন প্রতিবেদন এসেছে, সেগুলোর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে একটি শক্তিশালী, আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রতিবেদন ছিলো খুদা কমিশনের। সেটি অবশ্যই ভিত্তি হতে পারে, কিন্তু যেহেতু একটি শিক্ষানীতি চলমান, সেটির প্রাসঙ্গিকতাও নিশ্চয়ই বিদ্যমান। বর্তমান শিক্ষানীতিরও অন্যতম ভিত্তি ছিলো খুদা কমিশন এবং বর্তমান শিক্ষানীতি খুদা কমিশনের মূল চেতনা ধারণ করে। এ-প্রসঙ্গে আরও বলা প্রয়োজন যে, বর্তমান শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক স্তর অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার কথা বলা হয়েছিলো ও কারিগরি শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছিলো। যেহেতু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাদর্শন আলাদা হওয়ার কথা, সেহেতু শিক্ষাক্রমও বিভাজিত হতে হবে সেভাবেই। প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিতে যদিও প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ধারাবাহিকতা রাখার কথা বলা হয়েছে এবং প্রাসঙ্গিকভাবে শিক্ষার বিভিন্ন পর্যায় ও স্তরের উদ্দেশ্যসমূহও বিধৃত হয়েছে, কিন্তু এই প্রাসঙ্গিকতা বর্তমান শিক্ষানীতির সঙ্গে কতোটুকু সাযুজ্যপূর্ণ, তা নিয়ে বিশদভাবে ভাবার অবকাশ রয়েছে। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষার বিষয়টি তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে করি।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে, যে দশটি বিষয়ের কথা প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমে বলা হয়েছে এবং বিজ্ঞান-কলা-মানবিক বিভাজনের যে সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছে, সেটি আপাতদৃষ্টিতে ভালো মনে হতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশেই এ-ধরনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে যেখানে অন্যান্য দেশে প্রচুর বিকল্প থাকে, এক্ষেত্রে তেমন বিকল্প রাখা হয়নি। ফলে মূল সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানালেও প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিকল্প না থাকায় সিদ্ধান্তটি একপর্যায়ে নেতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে বলে আশঙ্কা। বাংলাদেশে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী আশঙ্কাজনকভাবে কম এবং দেশে কোনো STEM বা STEAM নীতিমালা নেই। ফলে এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বিজ্ঞানশিক্ষার। অপরদিকে, উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়কে যদিও বিশেষায়ণের জন্য প্রস্তুতির ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, কিন্তু এই সিদ্ধান্তের ফলে বিষয়বস্তুর বিচারে সেটি কতোটুকু প্রস্তুতির ক্ষেত্র হবে তা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। আবার এই শিক্ষাক্রম প্রণয়নের সাথে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার সম্পর্কও স্পষ্ট নয়। শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ে যা জেনে আসবে, তা কি বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পঠিত বিষয়গুলোর জন্য ন্যূনতম মানদণ্ড অর্জনে সহায়ক হবে? বিষয়বস্তুর নিরিখে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের সঙ্গে উচ্চশিক্ষার সম্পর্ক কোথাও কোথাও কম থাকলেও কোথাও কোথাও বেশ জোরালো। যেমন, যে শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিষয়ে পড়বে, সে কি মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে পড়ার জন্য যতোটুকু গণিতের জ্ঞান ও দক্ষতা আবশ্যক, সেটি কি অর্জন করে আসতে পারবে? এই বিষয়গুলোতে এখনও নিশ্চিত নই। অপরদিকে, প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমে এমন অনেক উপাদান আছে যেগুলো পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক না হয়ে বরং সহশিক্ষাকার্যক্রমের উপাদান হতে পারে। সব উপাদান পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক না করে শিক্ষাক্রমে সহশিক্ষাকার্যক্রমের ওপর আরও গুরুত্বারোপ করা যেতে পারে বলে মনে করি। তবে এক্ষেত্রে জোরালোভাবে মনে করিয়ে দেওয়া আবশ্যক যে, সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম যেন বিদ্যালয়ে নিশ্চিতভাবে করানো হয়, সেই প্রক্রিয়াটি শুরু করা ও মনিটরিং করা জরুরি।

রূপরেখায় সুন্দরভাবে শিখন সময় ও শিখন সময়ের বিষয়ভিত্তিক বণ্টনের বিষয়টিকে কেন্দ্র করে শিখন ঘণ্টার হিসাব করা হয়েছে। এতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য দু’দিন ছুটির প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও তাত্ত্বিকভাবে আমি এটিকে যথাযথ মনে করি, কিন্তু একইসঙ্গে ভিন্ন আশঙ্কাও তৈরি হয়। রূপরেখায় উন্নত বিশ্বের শিখন সময়ের সঙ্গে প্রস্তাবিত শিখন সময়ের তুলনা করা হয়েছে। কিন্তু উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার কাজটির মূল দায়িত্ব গ্রহণ করে বিদ্যালয় এবং সেখানে কোচিং-প্রাইভেট টিউশনি ব্যবস্থা বিদ্যালয়ের সমান্তরালে কাজ করে না। এই বাস্তবতা বাংলাদেশে অনেকাংশেই ভিন্ন। আমাদের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশকে বিদ্যালয় সময়ের বাইরেও প্রাইভেট পড়া বা কোচিংয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। দুইদিন ছুটির বিধান এক্ষেত্রে প্রাইভেট, টিউশনি ও কোচিংয়ের বাজারকে আরও বড় করে তুলবে কি না সেই শঙ্কা তাই রয়ে যাচ্ছে। আমি মনে করি, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা দু’দিনের ছুটি যেন পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করতে পারে, এনসিটিবিকে সেই ধরনের বাস্তবায়ন কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। না হলে দু’দিনের ছুটির এই ভালো ধারণাটি খারাপ ফল বয়ে আনতে পারে।

শিখন-শেখানো কৌশল এবং শিখন-শেখানো সামগ্রী অংশেও মনে করছি, নতুন রূপরেখা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বর্তমানে আমাদের বিদ্যালয়গুলোর ভৌত অবকাঠামো অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে। একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য যে-ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার, আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে তার অনেককিছুই অনুপস্থিত। সম্পদের অপ্রতুলতার বিষয়টি অধিকাংশ বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। পাশাপাশি, করোনাভাইরাসের সময়ে যেভাবে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দুর্যোগকালীন শিখন-শেখানোর প্রচেষ্টা অনেকটাই অনুপস্থিত বলে আমাদের মনে হয়েছে। রূপরেখায় ও নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে এই বিষয়টিকে আরও গুরুত্ব প্রদান করা আবশ্যক।

বিজ্ঞাপন

যেকোনো ভালো পদ্ধতিই খারাপ ফলাফল বয়ে আনতে পারে যদি সেটির সুষ্ঠু বাস্তবায়ন সম্ভবপর না হয়। নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে সম্মুখ কর্মী হিসেবে কাজ করবেন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকগণ। এক্ষেত্রে শিক্ষকদের তৈরি হওয়ার ও তৈরি করার বিষয়টি নানা অর্থে চ্যালেঞ্জিং। প্রথমত, সব শিক্ষককে নতুন শিক্ষাক্রমের সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম করতে হবে যাতে তারা নতুন শিক্ষাক্রমের প্রতিটি পরিবর্তন ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারেন। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, ২০১২ সালের শিক্ষাক্রম বিস্তরণের প্রশিক্ষণই এখন পর্যন্ত সকল শিক্ষক সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারেননি। সুতরাং এই নতুন শিক্ষাক্রমের ক্ষেত্রেও সেই আশঙ্কা রয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের মানসিকতার পরিবর্তন আবশ্যক। শিক্ষকদের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত নিবিড় প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে যাতে কোনো ধরনের ভুল বা বিচ্যুতির জায়গা না থাকে। আর তা করতে হলে বিদ্যমান ডিপিএড প্রশিক্ষণের শিক্ষাক্রমও পরিমার্জন করতে হবে। পাশাপাশি, শিক্ষকদের নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে পুরোপুরি অনুপ্রাণিত করা যাচ্ছে কি না তার ওপর শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন নির্ভর করবে। অভিজ্ঞতা বলে, শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ নিলেই অনুপ্রাণিত হন না। অনুপ্রেরণার একটি জায়গা প্রশিক্ষণ হলেও শিক্ষকদের বেতন, সামাজিক মর্যাদা, কাজের চাপ ইত্যাদি নানা বিষয় অনুপ্রেরণার সাথে জড়িত। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এসব প্রতিটি ক্ষেত্রেই শিক্ষকরা অবহেলিত। অদক্ষ শিক্ষকও রয়েছেন অনেক। শিক্ষকদের দক্ষতাবৃদ্ধির পাশাপাশি তারা যদি নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে অনুপ্রাণিত না হন, তাহলে প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রম ভালো ফল বয়ে আনতে পারবে বলে মনে করি না। এনসিটিবিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে হবে এবং শিক্ষকদের বেতন, সামাজিক মর্যাদা ও কাজের চাপের বিষয়টি সমন্বয় করে একটি মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। একইসাথে এও বলা প্রয়োজন, শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন একটি সমন্বিত দায়িত্বের অংশ। এনসিটিবি শিক্ষাক্রম তৈরি করেছে বলে তাদেরকেই সবকিছু নিশ্চিত করতে হবে, এই ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট সব মহলকে শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের দায় নিতে হবে। না হলে দিনশেষে শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে কোনো খামতি ধরা পড়লে এর দায়ভার শিক্ষকদের ওপর চাপানো হবে।

শিক্ষকদের অনুপ্রেরণার বিষয়টির সঙ্গে প্রস্তাবিত মূল্যায়ন কৌশলও অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। প্রস্তাবিত মূল্যায়ন কৌশল দেখে আনন্দিত, কিন্তু একইসঙ্গে শঙ্কিতও। প্রথমেই সাধুবাদ জানাই দশম শ্রেণির আগে কোনো ধরনের পাবলিক পরীক্ষা না নেওয়ার সিদ্ধান্তটির কারণে। প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রম অনুসারে এরপর একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে দুটো পাবলিক পরীক্ষা নেওয়া হবে এবং দুটোর সম্মিলিত ফলাফলের ভিত্তিতে চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারিত হবে। এক্ষেত্রে প্রস্তাব হচ্ছে, একাদশ শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষা বাদ দিয়ে কেবল দ্বাদশ শ্রেণিতে দ্বাদশ শ্রেণির সিলেবাসের ওপর পাবলিক পরীক্ষা নেওয়া হোক এবং একাদশ শ্রেণির মূল্যায়নকে শিখনকালীন মূল্যায়নের অন্তর্ভুক্ত করা হোক। না-হলে দশম, একাদশ ও দ্বাদশ—পরপর তিনবার শিক্ষার্থীকে পাবলিক পরীক্ষা দিতে হবে যার চাপ শিক্ষার্থীদের ওপর বর্তমান সময়ের মতোই থাকবে। এটিও সাধুবাদযোগ্য যে, প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিখনকালীন মূল্যায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কিন্তু শঙ্কা জাগে যে, সমাজের অংশ হিসেবে বিদ্যালয়সমূহে যে-ধরনের অনৈতিকতা, অসাধুতা ও অদক্ষতার চর্চা হয়ে থাকে, সেখানে শিখনকালীন মূল্যায়ন কতোটুকু কার্যকর হবে! শিক্ষকরা কি রাজনৈতিক, সামাজিক ও নানা ধরনের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত চাপ এড়িয়ে শিক্ষার্থীকে সত্যিকার অর্থেই বিদ্যালয়ে মূল্যায়ন করতে সক্ষম হবেন? ব্যবহারিক পরীক্ষাগুলোতে আমরা হাতখুলে নম্বর প্রদানের যে-ধরনের অনৈতিক চর্চা দেখেছি, তেমনি পূর্বের বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়ন (school based assessment) প্রক্রিয়ার ব্যর্থতার উদাহরণও জানা। যদিও প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমে এসব মূল্যায়নের জন্য নানা ধরনের কৌশল অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই প্রক্রিয়াটিও অনৈতিক ও অসাধুতার একটি চর্চা ক্ষেত্র হতে পারে বলে আমার আশঙ্কা। উদাহরণ হিসেবে আরও বলা যায়, দশম শ্রেণি শেষে যে পাবলিক পরীক্ষাটি হবে সেখানে পাঁচটি বিষয়কে শিখনকালীন মূল্যায়নের পাশাপাশি সামষ্টিক মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু অপর পাঁচটি বিষয় পুরোপুরি শিখনকালীন মূল্যায়ন হওয়ায় সেখানে এই ধরনের চর্চার সুযোগ বেশি থাকবে আর সে কারণেই এসকল বিষয়ে শিক্ষার্থীরা কম গুরুত্ব দিবে বলেও মনে হয়।

একইভাবে প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমে শিখন পরিবেশ মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে। যে প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি এমনিতেই সম্পদের অপ্রতুলতায় ভুগছে, সেগুলো স্বাভাবিকভাবেই এক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকবে। শিখন পরিবেশ মূল্যায়ন এক্ষেত্রে একটি সুযোগ হিসেবে দেখা দিতে পারে এভাবে যে, যেসব বিদ্যালয় শিখন পরিবেশ মূল্যায়নে পিছিয়ে থাকবে, তাদেরকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ দেয়া হবে। তাহলেই কেবল এই প্রস্তাবটি কার্যকর হবে।

শিক্ষাব্যবস্থার মূল্যায়নের কথাও এসেছে প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমে, যেটি আশাব্যঞ্জক। আমরা পূর্বে জিপিএ ৫-এর উল্লম্ফন দেখেছি। একইসাথে কিন্তু সরকারেরই করা জাতীয় কৃতি অভীক্ষার (এনএসএ) ফলাফলে বিরাট ফারাক উঠে এসেছে। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার ফলাফলে যে বড় ধরনের সাফল্য দেখা যায়, এনএসএর ফলাফল তার বিপরীত। প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রম সেটির ওপর গুরুত্ব প্রদান করায় আনন্দিত। একইসাথে বলবো, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেসব মূল্যায়ন প্রচলিত ও বিশ্বব্যাপী গৃহীত, যেমন, PISA বা TIMSS, সেগুলোতেও বাংলাদেশের অংশগ্রহণের উদ্যোগ ধীরলয়ে হলেও গ্রহণ করা হোক। তাহলেই কেবল অন্য দেশের তুলনায় আমরা কতোটুকু এগিয়ে বা পিছিয়ে আছি, সেটি অনুধাবন করতে সক্ষম হবো।

প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রম বেশ কিছু নতুন ও ইতিবাচক বিষয় নিয়ে এসেছে। যেমন, শিক্ষাক্রমে একীভূততা ও জেন্ডার সংবেদনশীলতার কথা বলা হয়েছে; শিক্ষাক্রম বিস্তরণ এবং বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণের কিছু গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে। এগুলো শিক্ষাক্রমের সার্বিক আঙ্গিক নিয়ে নীতিনির্ধারকদের সচেতনতার পরিচয় বহন করে। কিন্তু তত্ত্বীয়ভাবে অনেক কিছু আপাতদৃষ্টিতে ভালো মনে হলেও সঠিক বাস্তবায়নের অভাবে কিংবা বাস্তবায়নের দুর্বলতায় ভালো উদ্যোগ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে। প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমে অনেক ভালো দিক রয়েছে, কিন্তু আশঙ্কা হচ্ছে, বাস্তবায়ন কৌশল যথাযথ না হলে এগুলো শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠবে। আশাবাদের বিষয় যে, এই ওয়াশব্যাক ইফেক্টের বিষয়টি সম্পর্কেও প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রম সচেতন যা তাদের রূপরেখায় উঠে এসেছে। তবে যেহেতু সৃজনশীল শিক্ষাব্যবস্থার মতো শিক্ষার নানা বিষয়ের পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা সুখকর নয়, তাই মনে করি, শুধু শিক্ষাক্রমের একার পরিবর্তনে প্রত্যাশিত ইতিবাচক ফল আনা সম্ভব নয়। এজন্য দরকার শিক্ষানীতির সঙ্গে শিক্ষাক্রমের সামঞ্জস্য বিধান এবং শিক্ষাবাজেট বৃদ্ধির মাধ্যমে গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পদে পরিপুষ্ট করে তোলা। অন্যদিকে এটিও বলা দরকার, সরকার ইতোমধ্যে বর্তমান শিক্ষানীতি সংশোধনের ঘোষণা দিয়েছে। ধরে নেওয়া যায়, সংশোধনের পাশাপাশি শিক্ষানীতির অনেক কিছু পাল্টে যাবে। তখন কি নতুন করে আবার শিক্ষাক্রম তৈরি করা হবে? সরকার যেহেতু শিক্ষানীতি নিয়ে ঘোষণা দিয়েছেই, তাই এত তাড়াহুড়া না করে বরং নতুন শিক্ষানীতি অনুসারে শিক্ষাক্রম চূড়ান্ত করা যেতে পারে। শিক্ষানীতি অনুসারে শিক্ষাক্রম হয়, শিক্ষাক্রম আগে তৈরি করে তারপর শিক্ষানীতি তৈরির মতো উল্টোহাঁটার সিস্টেম যে নেই!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)