চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রশ্নবিদ্ধ শিশুতোষ সাহিত্যের মান

সাদেকুর রহমান, বাসস: সাহিত্য সমাজের দর্পণ। যে জাতি সাহিত্যে যত বেশি সমৃদ্ধ সে জাতি তত বেশি উন্নত। ব্যক্তির ব্যক্তির সাহিত্য চর্চা শুরু হয় মূলত শিশু বয়স থেকে। এ জন্য শিশু সাহিত্য হতে হবে মান সম্মত। কিন্তু আমাদের দেশের শিশুদের জন্য যে সাহিত্য রচনা করা হয়, শিশুরা সাহিত্যের যে বইগুলো পড়ে তা কতটা মান সম্মত! অনেক শিশুই গল্পের বই পড়তে ভালবাসে। তাই শিশু বয়স থেকেই তাদের হাতে সু-সাহিত্য তুলে ধরতে হবে যাতে ভবিষ্যতে তারা ভালো কিছু শিখতে পারে।

রাজধানীর একটি স্কুলে প্লে শ্রেণিতে পড়ে আহমেদ যারার ওয়াহেদ শাবীব। ছবিযুক্ত গল্পের বই ওর ভারি পছন্দ। নিজে বই পড়তে না পারলেও দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ুয়া বড় ভাই মুহাম্মদ সাদমান সাইফানকে পড়তে বলে, আর সে গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনে। কোনো বাক্য ছুটে গেলে আবার পড়তে বলে। কখনো কখনো বাবা-মাকেও একইভাবে বইয়ের পাঠক বানিয়ে গল্প শোনে। একদিন ‘ভূতের গল্প’ নামে একটি বই পড়ছিল বড় ভাই, আর শাবীব তা যথারীতি শুনছিল। এক পর্যায়ে হঠাৎ করে শাবীব ওর মাকে ডেকে বলছে, “মামুনি মামুনি ভূতের গল্প সব একই রকম। মজা লাগছে না। ভূত বলে কী আসলে কিছু আছে? নাই। মনের ভূতই ভয় ঢুকায়।”

ঘটনাটি ছিল গেল ফেব্রুয়ারিতে, মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলার কোনো একদিনের। পূর্বের বায়না মতো বাবা-মা ওদের দু’ভাইকে বাংলা একাডেমির গ্রন্থমেলা থেকে কিছু বই কিনে দেন। মা এডভোকেট রুবিনা ইসলাম তার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বললেন, “মেলায় গিয়ে দেখলাম বাচ্চাদের জন্য মানসম্পন্ন বইয়ের যথেষ্ট অভাব। ভূত-প্রেত আর রাক্ষস খোক্কস নিয়ে যেসব গল্প লেখা হয়েছে তার বেশির ভাগই অসঙ্গতিপূর্ণ কিংবা চর্বিত চর্বণ। মৌলিক লেখা খুবই কম। রঙ-বেরঙের মলাটে, নানান নামে বই আসছে, কিন্তু মান হতাশাব্যঞ্জক। সায়েন্স ফিকশন নামে তো লেখকদের চৌর্যবৃত্তি ও প্রকাশকদের স্বেচ্ছাচারিতা চলছে। ভালো বই না হলে শিশুদের আগ্রহ থাকে না। ভালো বই মানে অবশ্যই জীবনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।”

অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল

এ থেকে উত্তরণ ঘটাতে অবশ্যই কেন্দ্রীয়ভাবে বাংলা একাডেমিকে কঠোর হতে হবে এবং সম্পাদনা পরিষদ থাকতে হবে। ব্যাংক কর্মকর্তা রাশেদুন নবীও গত বইমেলা থেকে তার সাত বছরের শিশুর পছন্দে কেনা কার্টুনের বইয়ের প্রসঙ্গ টেনে বললেন, ‘ও এখনও পড়তে শেখেনি, আমরাই পড়ে শোনাব। ভিতরের কনটেন্ট ভীষণ দুর্বল। কিন্তু বইয়ের প্রচ্ছদে অযথা আকর্ষণীয় কার্টুন থাকায় এই বইগুলোই সে কিনবে। এটা এক ধরনের প্রতারণা।’

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাংলা একাডেমি, নজরুল ইন্সটিটিউট, শিশু একাডেমি, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতর এবং জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর নিয়মিতভাবে শিশুতোষ পত্রিকা, বই ইত্যাদি প্রকাশ করে থাকে। সম্পাদনা পরিষদ থাকায় এসব প্রকাশনার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ খুব কম। বাংলা একাডেমি বেশ কিছু মৌলিক ও অনূদিত শিশু-কিশোর সাহিত্য ও আনন্দপঠন গ্রন্থ প্রকাশ করেছে।

বেসরকারি ভাবে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে বাংলা সাহিত্যে শিশু (২০০২) ও দুই খণ্ডে আকর্ষণীয় শিশু বিশ্বকোষ ছোটদের বাংলাপিডিয়া (২০১১) এবং মুক্তধারার মতো বেসরকারি প্রকাশনা সংস্থাও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুতোষ গ্রন্থ প্রকাশ করে এ ধারার সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। বেসরকারি অন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল), ঐতিহ্য, শৈশব প্রকাশ, পাতাবাহার সহ বেশ কয়েকটি ভালো মানের শিশুতোষ বই প্রকাশ করে থাকে।

কিন্তু বাজার-অর্থনীতি আর কপি-পেস্টের প্রভাব পড়েছে শিশুসাহিত্যেও। একশ্রেণীর মুনাফালোভী যা খুশি মলাটবন্দী করে বাজারে ছাড়ছে। লোককথার ‘ভূত’ নিয়ে সাহিত্য (!) রচনার সেকি ইঁদুর দৌড়! বাস্তবে অস্তিত্ব না থাকলেও কেচ্ছা-কাহিনীর বদৌলতে ভূত ঠিকই মানুষের মনে ও সমাজে জায়গা করে নিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কবি আসাদ চৌধুরী

সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘গুপি ঘাইন বাঘা বাইন’ চলচ্চিত্রে ১৬ প্রকারের ভূতের বিষয়টি নিয়ে আসেন, আর বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যে এর চেয়েও বেশি প্রকার ভূতের দেখা মেলে। বাজারে পাওয়া ছোটদের এসব বইগুলোতে যেসব অসঙ্গতি চোখে পড়ে, সেগুলো হলো বিষয়বস্তু নির্বাচনে ছোট মনের কথা বিবেচনায় না আনা, বানান ভুল, মানহীন ছড়া, ভুল ছন্দ, সায়েন্স ফিকশনের ক্ষেত্রে মৌলিকত্বের অভাব, ভূতের গল্পের নামে আজগুবি বর্ণনা, নিম্নমানের ইলাস্ট্রেশন, অসংলগ্ন প্রচ্ছদ ইত্যাদি।

একটা সময় শিশুতোষ বইয়ে পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষা থাকতো। এখন যেন তার যথেষ্ট ঘাটতি। অনেক ক্ষেত্রেই সায়েন্স ফিকশনের নামে রুদ্ধশ্বাস কল্পকাহিনী লেখা হচ্ছে। বাজারে এখন কোনো কোনো শিশুতোষ বইয়ে থাকছে রগরগে উপস্থাপনা। ভুল ছন্দ আর কাঁচা হাতের গদ্যে লেখা শিশুতোষ বইয়ে তো বাজার সয়লাব!

শিক্ষাবিদ ও মনোবিদরা বলছেন, বই সব সময়ের বন্ধু। শিশুর হাতে ভুল বই তুলে দেয়ার মধ্য দিয়ে তার ভবিষ্যতকে শঙ্কায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে। সে ভুলের মধ্য দিয়ে বই পাঠের অভ্যাস করছে। তারা বলছেন, অনেক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বইয়ে দেখা যাচ্ছে, কে লিখেছে কিছুই লেখা থাকে না। ইন্টারনেট থেকে নামিয়ে যা খুশি তা দিয়ে বই বের হচ্ছে। শিশুর মনোজগততে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।

শিশুতোষ সাহিত্যের সংজ্ঞা সম্পর্কে বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, “শিশুসাহিত্য শিশুদের উপযোগী সাহিত্য। সাধারণত ৬-১০ বছর বয়সী শিশুদের মনস্তত্ত্ব বিবেচনায় রেখে এ সাহিত্য রচনা করা হয়। এই বয়সসীমার ছেলেমেয়েদের শিক্ষামূলক অথচ মনোরঞ্জক গল্প, ছড়া, কবিতা, উপন্যাস ইত্যাদিকেই সাধারণভাবে শিশুসাহিত্য বলে। শিশুসাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য এর বিশেষ বক্তব্য, ভাষাগত সারল্য, চিত্র ও বর্ণের সমাবেশ, হরফের হেরফের প্রভৃতি কলাকৌশলগত আঙ্গিক। শিশুসাহিত্যের বিষয় বৈচিত্র্য অফুরন্ত। এতে থাকে কল্পনা ও রোমান্স, জ্ঞান-বুদ্ধির উপস্থাপনা, রূপকথা, অ্যাডভেঞ্চার আর ভূত-প্রেতের গল্প।”

শিশু সাহিত্যিক আলী ইমাম

কবি আসাদ চৌধুরী বলেন, “বাজারে হাজার হাজার বই আসুক তাতে কোন সমস্যা নেই। কালি-কাগজের ব্যবসা ভালো হবে। লেখা ভালো না হলে পাঠক তা পড়বে না। কিন্তু শিশুদের বইয়ের প্রতি নজর দিতে হবে। তাদের হাতে যেন মানসম্পন্ন বই পড়ে সে ব্যাপারে কড়া নজরদারি প্রয়োজন।”
শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল তরুণ শিশুসাহিত্য রচয়িতাদের উদ্দেশে বলেন, “শিশুসাহিত্য লিখতে গেলে সবার আগে নিজের শৈশবের কথাই চিন্তা করা উচিত। আজকাল শিশু-কিশোরদের জন্য যারা বই লিখছেন, সেসব তরুণদের রচনা দেখে মনে হয় তারা নিজেদের খুব বেশি গুরুজন মনে করেন। বইয়ের পাতায় পাতায় তারা উপদেশ দেন। কিন্তু আসলে তো ব্যাপারটা তা নয়। শিশুদের জন্য লিখতে হবে সুন্দর, সহজ গল্প।”

শিশু সাহিত্যিক আলী ইমামের মতে, “ভুল বাক্য ও শব্দ চয়নে দুর্বলতার কারণে অধিকাংশ শিশুসাহিত্য মান হারিয়েছে। আর মানহীন শিশু সাহিত্য বা রচনাগুলো শিশুদের বিভ্রান্ত করছে। রহস্য রোমাঞ্চ বা গল্প যাই লিখছি না কেন আমরা, একটা পরিকল্পিত প্যাটার্ন নেই বলে শিশুসাহিত্য এখনো সু-সাহিত্য হয়ে উঠতে পারছে না।”

বিজ্ঞাপন