চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রশ্নপত্র ফাঁস: শিক্ষক-অভিভাবকদের যতো অভিযোগ

প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য সরকারকে দায়ী করেছেন এক মুক্ত আলোচনার বক্তারা। শুধু তাই নয়, তাদের দাবি: উত্তরপত্রও সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে দিচ্ছে না সরকার। পরীক্ষায় জিপিএ-৫ বৃদ্ধি এবং পাসের হারে তাত্ত্বিক ‘ক্রেডিট’ নিতে গিয়ে সরকার শিশুদের প্রতিভা এবং সৃজনশীল মন-মনোভাব নষ্ট করে দিচ্ছে বলেও দাবি তাদের।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ড. এ আর মল্লিক লেকচার হলে অনুষ্ঠিত হয় ওই মুক্ত আলোচনা। বিষয় ছিলো- ‘সরকার প্রশ্ন ফাঁস হতে দিচ্ছে, উত্তরপত্র সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে দিচ্ছে না:  তাহলে আমাদের করণীয় কী?’

আলোচনা অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে শিক্ষা ও শিশু রক্ষা আন্দোলন (শিশির) নামের একটি সংগঠন। মুক্ত আলোচনায় অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং স্কুলের শিক্ষকরা অংশ নেন। সংগঠনটির আহ্বায়ক রাখাল রাহা।

শুরুতে আহ্বায়ক রাখাল রাহা দাবি করেন, এসএসসি পরীক্ষায় এবার এখন পর্যন্ত বাংলা দ্বিতীয় পত্র, ইংরেজী দ্বিতীয় পত্র ও গণিত বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে তথ্য-প্রমাণ এসেছে।

‘ব্যক্তিগত সূত্রেও আমরা বিভিন্ন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকের মাধ্যমে জেনেছি। প্রশ্নফাঁসের যে ধারা চলছে তার ভিত্তিতে ধরে নেওয়া যায়, এবারের এসএসসি পরীক্ষায় আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রশ্ন ফাঁস হতে পারে।’

তার ধারণা, যেহেতু ফাঁস হওয়া ৩টি প্রশ্ন দিয়ে অনুষ্ঠিত পরীক্ষা বিষয়ে এখনও পর্যন্ত সরকার কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি, সুতরাং ধরে নেওয়া যায় ‘ফাঁস হতে যাচ্ছে এমন পরীক্ষা বিষয়েও সরকার কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না’।

রাখাল রাহা বলেন, প্রশ্ন ফাঁস বিষয়ে শুরু থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী প্রথমে অস্বীকার করেছেন, পরে গুজব ছড়ানোর বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারী দিয়েছেন, কিছু লোক দেখানো তদন্ত কমিটি করেছেন, দু-একজনকে শাস্তি দেওয়ার মতো কিছু করে থাকতে পারেন, প্রশ্ন ফাঁসের চেষ্টা হলে ‘হাত ভেঙে দেবেন’ বলেছেন এবং সর্বশেষ গত বছর এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের পর বলেছেন, “প্রশ্ন ফাঁস কিভাবে সামলাবো? … আমরা তো স্কুলে স্কুলে এত পাহারা বসাতে পারবো না।”

‘সুতরাং আমরা ধরেই নিচ্ছি মন্ত্রণালয়ের আর এ বিষয়ে কিছু করার নেই!’

বিজ্ঞাপন

মুক্ত আলোচনায় শতাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন। বক্তারা বলেন, উত্তরপত্র মূল্যায়নে অসততার বিষয়েও গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি হচ্ছে। শিক্ষকরা উত্তরপত্র থেকে তুলে দিয়ে বলছেন, শিক্ষার্থীরা কি ধরণের উত্তর লিখছে অথচ পরীক্ষায় কি ধরণের ফল লাভ করছে। ফলে যারা সারাবছর পড়াশোনা করছে তাদেরকেও অসৎ প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে হচ্ছে।

এরকম অবস্থায় যারা অভিভাবক, শিক্ষক, সাধারণ মানুষ — তাদের আসলে করণীয় কি? এ পরিস্থিতির হাত থেকে তাদের সন্তানদের কিভাবে বাঁচাতে পারেন? এ বিষয়টা থামাতেই-বা কি করা যায়, এসব প্রশ্ন নিয়েই মুক্ত আলোচনাটি অনুষ্ঠিত হয়।

ফেসবুকে গ্রুপ খুলে প্রশ্ন বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ করেন বক্তারা। তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কেউ ফেসবুকে কয়েকটি কথা লিখলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু ফেসবুকে সরাসরি প্রশ্নপত্র বিক্রি করছে এমন কাউকে কেন গ্রেপ্তার করা বা ধরা যাচ্ছে না? সরকার চাইলে তা বন্ধ করতে পারে।

তারা বলেন, শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁস নয়, পাঠ্যপুস্তকেও ব্যাপক ভুল আছে। কবিতার লাইন পরিবর্তন করে দেয়া হচ্ছে। পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দেয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন বক্তারা।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত একজন গবেষক বলেন, এতগুলো পরীক্ষা কেন রাখা হচ্ছে? এটি মূলত শিক্ষার্থীদের নিয়ে বড় একটি বাণিজ্য। এটি বাণিজ্য লোভ। সরকার এবং সরকারের সাথে যে গোষ্ঠী আছে তারাই এসব করছে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও পাঠচক্র বিষয়ক সম্পাদক গোলাম রাব্বানি জানান, ছাত্রলীগ প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিনি দাবি করেন, ফেসবুকে অসাধু উপায় অবলম্বন করে এমন অনেকগুলো  গ্রুপের বিরুদ্ধে তারা আইসিটি মন্ত্রীর সাথে কথা বলে বন্ধ করেছেন। তিনি বলেন, সব বিষয়ে সরাসরি সরকারকে অভিযুক্ত করা ঠিক হবে না।

ফাতিমা সুলতানা নামক একজন শিক্ষিকা বলেন, পিইসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি এবং চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা থেকে শুরু করে সর্বত্র প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। সরকার বলে তারা জানে না। আমরা কিছু বললে সরকার বলে, এটা তো ঠিক না। জনগণ যা বলে সবই বেঠিক। তাহলে সবকিছুতে সরকারই সঠিক?

অনুষ্ঠানে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, আমি একটি কথা সবসময় বলি: ব্রাহ্মণরা চায় শাস্ত্রের সঠিক বাণী যেন শুদ্ররা শুনতে না পায়। শুদ্ররা সংখ্যায় কোটি কোটি, আর ব্রাহ্মণরা সংখ্যায় কম। শুদ্ররা যদি সঠিক জ্ঞান পেয়ে যায় তাহলে ব্রাহ্মণদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। একইভাবে আমাদের সমাজ সাধারণ মানুষকে প্রকৃতপক্ষ জ্ঞান কমই দিতে চায়। সংবিধানে লেখা থাকে একরকম, বাস্তবে করে আরেক রকম। সংবিধান প্রণয়ন করার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোন সরকারই সংবিধান অনুযায়ী শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেয়নি।

বিজ্ঞাপন