চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রশাসন কি সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ?

একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের বরিশাল অফিসের ক্যামেরাপার্সন সুমন হাসানের ওপর নির্মম নির্যাতনের কিছু ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে; যেখানে দেখা যাচ্ছে, তার পুরো শরীরে ভয়ঙ্কর আঘাতের চিহ্ন। পুরো শরীর লাল হয়ে আছে। খালি গায়। মারতে মারতে তাকে অজ্ঞান করে ফেলা হয়েছে। তিনি এখন বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন।

কোনো সন্ত্রাসীগোষ্ঠী বা অজ্ঞাত দুর্বৃত্ত তার ওপর এই হামলা চালায়নি। সুমন হাসানের ওপর এই নারকীয় হামলা চালিয়েছে খোদ গোয়েন্দা পুলিশের কিছু সদস্য। পুলিশের হাতে সাংবাদিকসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষের এরকম নির্যাতনের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। ফলে অনেক সময়ই এরকম প্রশ্ন ওঠে যে, পুলিশ কি তাহলে ক্রমেই একটি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী বাহিনীতে পরিণত হচ্ছে?

গণমাধ্যমের খবর বলছে, ১৩ মার্চ দুপুরে বরিশাল মহানগরীর দক্ষিণ চকবাজারের পুরাতন বিউটি হলের সামনে সাংবাদিক সুমনের এক আত্মীয়ের বাসায় অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ। এ সময় সুমন সেখানে উপস্থিত হন। অভিযানের বিষয়ে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তার বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে ৮ পুলিশ সদস্য সুমনের ওপর চড়াও হয়। তারা সুমনকে বেধড়ক মারধর করে অজ্ঞান করে ফেলে। পরবর্তীতে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যায়। জ্ঞান ফিরলে সেখানে তাকে আবারও বেদম পেটানো হয়। খবর পেয়ে বরিশালের সিনিয়র সাংবাদিকরা উপ-পুলিশ কমিশনার গোলাম রউফকে বিষয়টি জানালে তিনি বিষয়টি সমাধানের জন্য সবাইকে তার কক্ষে নিয়ে আসেন। সুমনের সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন ও সুমনের কাছে নির্যাতনের কথা শুনে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দুঃখ প্রকাশ করেন। তারা নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ডিবি পুলিশের এসআই আবুল বাশার ও তার টিমকে তাৎক্ষণিক ক্লোজড করেন এবং ওই টিমের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করে রিপোর্ট অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।

প্রশ্ন হলো, ক্লোজড বা প্রত্যাহারের মানে কী? এটি কি আদৌ কোনো শাস্তি? অতীতেও বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, যখনই কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে এরকম নির্যাতনের অভিযাগ ওঠে, কর্তৃপক্ষ তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বা পুলিশ লাইনে ক্লোজড করা হয়েছে বলে জানায়। বলাই হয় যে, এটি একধরণের লোক দেখানো শাস্তি। দীর্ঘমেয়াদে অভিযুক্ত ওই পুলিশ সদস্যের পদোন্নতির ক্ষেত্রে এই ঘটনা হয়তো কিছুটা প্রভাব ফেলে। কিন্তু অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় এ ধরনের শাস্তি যথেষ্ট নয়।

আবার হেফাজতে নিয়ে নির্যাতন প্রতিরোধে একটি কঠিন আইন থাকলেও তার বাস্তবায়ন নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন আছে। কেননা আইন যত কঠোরই হোক না কেন, সেখানে ‘সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধ’ বলে একটা ধারা থাকে। অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকেরা প্রকাশ্য দিবালোকে কোনো একজন নাগরিককে গুলি করে মেরে ফেললেও আদালতের কাছে তার এই দাবি করার সুযোগ রয়েছে যে, সে আত্মরক্ষার্থে অথবা সরল বিশ্বাসে ওই অপরাধ করেছে। বরিশালের এই ঘটনায় যদি মামলা হয় তখনও আদালতে গিয়ে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা ওই একই দাবি করবেন এবং এর বিচার বিভাগীয় তদন্ত না হলে এ ঘটনার আখেরে কোনো বিচার হবে না।

Advertisement

নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুনের ঘটনা ছাড়া আর কোনো ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে বড় কোনো শাস্তি হয়েছে, সম্ভবত তার নজির নেই। ঝালকাঠির কলেজছাত্র লিমনকে গুলি করে পঙ্গু করে দিয়েছিল র‌্যাব। কিন্তু ওই ঘটনার কোনো বিচার তো হয়ইনি, বরং লিমন ও তার পরিবারকে সন্ত্রাসী প্রমাণের জন্য তাদের বিরুদ্ধেই একাধিক মামলা দেয়া হয়েছিল। যদিও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মহলের আন্তরিকতায় অন্তত সেই মামলাগুলো থেকে লিমন ও তার ক্ষুদ্র দোকানী বাবা মুক্তি পেয়েছেন।

গত ৯ মার্চ ঢাকার বাইরে বেশ কয়েকজন রিপোর্টারকে নিয়ে একটি আলোচনা অনুষ্ঠান করি। সেখানে অনেকেই একটি অভিযোগ করেছেন যে, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, মাস্তান, ক্যাডারের বাইরেও প্রশাসনও এখন সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ ভাবে। কোনো তথ্য তারা দিতে চায় না। বিশেষ করে দুর্নীতি ও অপরাধ সম্পর্কিত। কেবল সেসব তথ্যই প্রশাসন দিতে চায় যেখানে তাদের নিজেদের বীরত্বের প্রসঙ্গ আছে। এর বাইরে অন্য কোনো ঘটনার অনুসন্ধানী রিপোর্ট করতে গেলে পুলিশ ও স্থানীয় সিভিল প্রশাসন তাদের কোনো ধরণের সহায়তা করে না। শুধু তাই নয়, কোনো কোনো বিভাগের প্রশাসনের উপর মহল থেকে এমন নির্দেশনাও দেয়া আছে যে, সাংবাদিকদের সাথে কোনো কথা বলা যাবে না অথবা কোনো একজন কর্মকর্তাকে নির্দিষ্ট করে দেয়া আছে যে, কেবল তিনিই কথা বলবেন এবং তাও উপর মহলের অনুমতিসাপেক্ষে।

আবার ওই নির্ধারিত কর্মকর্তাকে সব সময় পাওয়াও যায় না। সব মিলিয়ে তথ্য গোপনের একটি যে অপসংস্কৃতি যুগ যুগ ধরে আমাদের দেশে চালু আছে, ২০০৯ সালে তথ্য অধিকার আইন পাসের পরও তাতে ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন আসেনি। এই আইন প্রয়োগ করে সাধারণ মানুষ কিছু তথ্য হয়তো পাচ্ছে, কিন্তু অনেক সময়ই ‘তথ্য সংরক্ষিত নেই’ অজুহাতে দিনের পর দিন নাগরিকদের ঘোরানো বা হয়রানির করার অভিযোগও আছে।

বলা হয়, তথ্য অধিকার আইন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য একটি নতুন দরজা উন্মোচিত করবে। কিন্তু তা কতটুকু করেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কেননা, আইন থাকুক বা না থাকুক, যিনি তথ্য দেবেন, তিনি যদি আন্তরিক না হন, তিনি যদি সাংবাদিককে শত্রু বা প্রতিপক্ষ ভাবতে শুরু করেন, তখন সাংবাদিকদের পক্ষে স্বাধীন ও বস্তুতনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করা খুবই কঠিন হয়ে পড়বে, যা এরই মধ্যে হতে শুরু করেছে।

প্রশ্ন হলো, প্রশাসন কেন সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ ভাবছে? একজন সৎ অফিসার কখনো সাংবাদিককে প্রতিপক্ষ ভাবেন না। বরং তিনি তথ্য দিয়ে সহায়তা করেন এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রশাসন যখন সাংবাদিকদের শত্রুপক্ষ ভাবতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে সমস্যাটা তাদেরই। তারা কিছু গোপন করতে চায়। নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে চায়। কিন্তু সবকিছু কি আড়াল করা যায়?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)