চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রবাসীর বোবা কান্না

অস্ট্রেলিয়া আসার এক সপ্তাহের মাথায় একটা লেখা লিখেছিলাম: ‘প্রিয়জনের ওম’ শিরোনামে। সেখানে বলতে চেয়েছিলাম দূর পরবাসের জীবনে স্বচ্ছলতা থাকলেও প্রিয়জনদের স্নেহের পরশ নেই। প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের সাথে দেখা এবং কথা হলেও তাদের একটু আলতো স্পর্শ আমরা বুভুক্ষের মতো খুঁজে ফিরি। ইতোমধ্যেই অস্ট্রেলিয়া পাঁচ বছর পার হয়ে গেছে আমাদের। এর মধ্যেই অনেক প্রিয়জনকে হারিয়েছি যারা আর কখনওই আমাদের জীবনে ফিরে আসবে না কিন্তু সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারে থাকার কারণে স্বভাবতই তাদের অন্তিম মুহূর্তে তাদের পাশে উপস্থিত থাকতে পারিনি।

হারানো মানুষের তালিকায় একেবারে পরিবারের নিকট আত্মীয় থেকে শুরু করে কলেজের শিক্ষক পর্যন্ত আছেন। আমার জীবনে আমার বাবা মায়ের পরেই আমার বন্ধু-বান্ধব আর শিক্ষকদের স্থান। তাঁরাই আমাকে এতদূর নিয়ে এসেছেন তাই তাদেরকে হারানো আমার জীবনের এক অপূরণীয় ক্ষতি। কলেজের পোদ্দার স্যার, শিরীন ম্যাডাম মারা গেলে আবারও ‘প্রবাসীর বোবা কান্না’ এবং ‘মায়ার বাঁধন’ শিরোনামে আরো দুটো লেখা লিখেছিলাম। সেখানে বলতে চেয়েছিলাম, প্রবাসীরা আত্মীয়স্বজন হারিয়ে শত কষ্ট পেলেও তাদের কান্নাটা কেউই দেখতে পান না। মনের গভীরেই চলে সেই বোবা কান্না।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

এরপর আমাদের তখনকার বাড়িওয়ালা নাজমুল ভাই অসুস্থ্য হলে আরো একটা লেখা লিখেছিলাম ‘প্রবাসীর বোবা কান্না-দুই’। অবশ্য উনাকে বাড়িওয়ালা না বলে প্রতিবেশী বলাই শ্রেয় কারণ উনি কখনও অন্যদের কাছে আমাদেরকে ভাড়াটিয়া বলে পরিচয় করিয়ে দিতেন না। বলতেন আমরা উনার প্রতিবেশী। সেই প্রথম হাতে কলমে জানলাম মানুষকে আসলে কিভাবে সম্মান দিতে হয়। সৃষ্টিকর্তার রহমতে নাজমুল ভাই এখন ভালো আছেন। দেশে আত্মীয় পরিজন ফেলে আসা আমাদের জীবনে স্থানীয় অভিভাবকের জায়গা নিয়ে আছেন। উনি অবশ্য আমাদের মতোই আরো অনেকের স্থানীয় অভিভাবক। আসলে প্রবাসে বিপদে আপদে সবাই সবার পাশে এসে দাঁড়ায়।

তবে করোনাকালে এসে প্রিয়জন হারানোর তালিকাটা অনেক দীর্ঘ হয়ে গেছে। এই তালিকায় সরাসরি পরিচিত মানুষ যেমন আছেন তেমনি আবার এমন মানুষ আছেন যাদের সন্তান সন্ততি প্রবাসে আমাদের আত্মার আত্মীয় তাই খুব কাছ থেকে তাদের বোবা কান্নাগুলো দেখেছি। সেই অশ্রুর দাগ অবশ্য শুকিয়ে যায়নি এবং আমার বিশ্বাস যতদিন উনারা বেঁচে থাকবেন ততদিন একটা আফসোস নিয়ে বেঁচে থাকবেন যে প্রিয়জনের অন্তিম মুহূর্তে তাদের পশে উপস্থিত থাকতে পারেননি। আবার অনেকে উপস্থিত থাকতে পারলেও এমন মনেহবে যে যদি দেশে থাকতাম তাহলে হয়তোবা সেবা শুশ্রুষা করে প্রিয়জনদের ভালো করে ফেলতে পারতাম।

শুরুতেই করোনাতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন নাজমুল ভাইয়ের ছোট ছেলে সজীবের শ্বাশুড়ি। নাজমুল ভাই এবং উনার ছেলে দুজনকেই আমরা ভাই বলে সম্বোধন করি তাই নাজমুল ভাইয়েরা যেমন আমাদের আত্মার আত্মীয় তেমনি উনার ছেলেরাও প্রবাসে আমাদের একান্ত আপনজন। সজীবের স্ত্রী ফাহিমা সিলেটের মেয়ে। সর্বদা হাসিখুশি থাকতে ভালোবাসেন এবং আশেপাশের সবাইকে খুশি দেখতে পছন্দ করেন। তখনও উনার সাথে পরিচয় হয়নি। উনারা থাকতেন দোতলায় আর আমরা থাকতাম নিচতলায়। হঠাৎ একদিন শুনি কেউ একজন ফোনে কথা বলছেন এবং একটু পরপর ‘অয় অয়’ করছেন। সিলেটের ভাষা সম্মন্ধে ধারণা থাকায় তখন আমি আমার গিন্নীকে জিজ্ঞেস নাজমুল ভাইদের বাসায় কি সিলেটের কেউ এসেছেন। উত্তরে গিন্নী বললোঃ উনাদের ছোট ছেলের বউ ফাহিমাদের দেশের বাড়ি সিলেটে। এরপর দিনে দিনে উনাদের সাথে একটা আত্মিক বন্ধন তৈরি হয়েছে।

প্রবাসে সবাই দেশের স্মৃতিময় গল্পগুলো করে। আমরাও নিজেরা নিজেদের গল্পগুলো বলতাম আর চেষ্টা করতাম দেশে ফেলে আসা দুরন্ত শৈশব কৈশোরের আনন্দের ছিটেফোঁটা হলেও আমাদের পরবর্তি প্রজন্মের জীবনে ফিরিয়ে আনতে। সেই চেষ্টা থেকেই আমরা বাসার সামনের খোলা জায়গায় ইট দিয়ে চুলা বানিয়ে চড়ুইভাতি করেছি, বৃষ্টি আসলে দলবেঁধে বৃষ্টিতে ভিজেছি, আবার পাইন গাছের খোলা জোগাড় করে দেশের সুপারি গাছের খোলার মতো করে বাচ্চাদের বসিয়ে সারা বাসময় টেনে নিয়ে বেড়িয়েছি। এইসব পাগলামোই ফাহিমা দেশে তার মায়ের সাথে কথা হলে বলতেন তাই উনার মা উনাদের পাশাপাশি আমাদেরও চিনতেন। উনার মায়ের সাথে কখনও কথা হয়নি কিন্তু ফাহিমার সাথে কথা বলতে বলতে পুরোপুরি চিনে ফেলেছিলাম। ফাহিমা অনেকবার বলেছেন: ভাইয়া দেশে গেলে আমাদের বাসায় কিন্তু যেতে হবে। আমি বলতাম অবশ্যই অন্ততপক্ষে আপনার মায়ের সাথে দেখা করতে যেতে হবে। আমি কেন জানি পৃথিবীর সব মায়ের মধ্যেই নিজের মায়ের ছায়া দেখতে পাই। আসলে মায়েদের অকৃত্রিম আদর অতুলনীয়। সেই হাসিখুশি মানুষটা করোনাতে আক্রান্ত হলেন।

আমরা ধরেই নিয়েছিলাম উনি সুস্থ্য সমর্থ মানুষ করোনা উনার কোন ক্ষতি করতে পারবেন না। আমরা সবাই উনার আশু রোগমুক্তির জন্য দোয়া করতে থাকলাম। এরপর কয়েকদিনের গ্যাপে হঠাৎ একদিন গিন্নী বাসায় এসে বলল: ফাহিমার মা আমাদেরকে ছেড়ে অনন্ত অসীমে পাড়ি দিয়েছেন। মনটা ভীষণ ভারাক্রান্ত হয়ে গেলো। এরপর ভয়ে আর উনাদের বাসমুখ হয়নি দীর্ঘদিন কারণ আমি মানুষকে সান্ত্বনা দিতে পারি না। উল্টো নিজেই আবেগাক্রান্ত হয়ে যায়। ফাহিমা অনেক শক্ত মনের মেয়ে কিন্তু কোন মানুষ যতই শক্ত মনের হোক না কেন বাবা মা হারানোর ক্ষতটা কেউই আর সারাজীবনে কাটিয়ে উঠতে পারে না।

বিজ্ঞাপন

বেশ অনেকদিন পর ফাহিমার সাথে দেখা হলো একদিন। আমি পারতপক্ষে কথা বলছিলাম না কারণ বেশি কথা বললেই যদি উনার মায়ের প্রসঙ্গ চলে আসে। সেই কদিনে ফাহিমার বয়স মনে হলো প্রায় দশ বছর বেড়ে গিয়েছে। চোখের নিচে কালী, মুখের মধ্যে একটা গভীর দুঃখ ভারাক্রান্ত ভাব। আমি জানি ফাহিমা ঠিকই তাঁর মায়ের জন্য বোবা কান্না করেন।

এরপর মারা গেলেন রুপা বৌদির বাবা। বিজয় দা, রুপা বৌদি, উনাদের সন্তান এলভিরা এবং রেনোর আমাদের পারিবারিক আত্মীয়। সেভাবেই উনাদের পরিবারের মানুষজনও আমাদের একান্ত আপনজন। রুপা বৌদির মা অসুস্থ্য থাকাতে বাংলাদেশ থেকে ভারতে চিকিৎসা করতে গিয়েছিলেন কিন্তু করোনার কারণে আর ফিরতে পারছিলেন না। ইতোমধ্যে রুপা বৌদির বাবা হঠাৎ অসুস্থ্য হয়ে পড়েন কিন্তু করোনার কারণে হাসপাতালে ভর্তি হতে বেগ পেতে হয়। অবশেষে হাসপাতালে ভর্তি হন কাকাবাবু। একটু ভালো বোধ করার পর উনি জোর করেই হাসপাতাল থেকে বাসায় চলে আসেন এবং সেইদিন রাত্রেই পরপারে পারি জমান। এই খবর আমি পাই রুপা বৌদির কাছ থেকে কারণ কাকাবাবু অসুস্থ্য হবার পর থেকেই আমি ফলোআপ করতাম। রুপা বৌদিও ভীষণ হাসিখুশি মানুষ। সবাইকে সবসময় মাতিয়ে রাখেন। আমি বলতাম আমি হচ্ছি ভাই আর রুপা বৌদি হচ্ছেন আমার জমজ বোন কারণ আমরা দুজন একই ব্যাচের।

এরপর কাকাবাবুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য আয়োজন চলতে থাকলো। একদিন সকালে বিজয় দা ফোন দিয়ে বললেন: ইয়াকুব ভাই, বাবার শ্রাদ্ধ করার জন্য কলাপাতা লাগবে, রুপা বলল আপনাকে ফোন দিতে। আমি বললাম: কোন সমস্যা নেই, আমি এক্ষুণি নিয়ে আসছি। আমি আমাদের এক প্রতিবেশীর বাসায় কলাগাছ দেখে সেই বাসায় যেয়ে কড়া নাড়লাম। কেউ উত্তর দিলো না তাই নিজে থেকেই একটা কলাপাতা কেটে নিয়ে রুপা বৌদিদের দিয়ে আসলাম। রুপা বৌদিকে দেখেও ভীষণ মায়া লাগছিলো। বারবার কাকাবাবুর কথা বলছিলেন। কাকাবাবু মারা যাওয়ার পর অনেক অচেনা অজানা মানুষ উনাকে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। রুপা বৌদি বললেনঃ উনি এমনই ছিলেন, একেবারে চুপচাপ, কারো উপকার করবেন কিন্তু কাক পক্ষিও সেটা টের পাবে না। রাস্তার কুকুরের জন্য নিজ হাতে ভাত রান্না করে খাইয়ে বেড়াতেন কাকাবাবু তাই উনাকে দেখলেই সারা পাড়ার কুকুর পিছু নিতো। এগুলো বলছিলেন আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন। আমি শুধু ভাবছিলাম এই প্রবাস জীবন আসলে আমাদের কি দিয়েছে আর কি কেড়ে নিয়েছে।

আগের এই দুজন মানুষকে আমি সরাসরি চিনতাম না তবুও ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিলাম কারণ দেশে আমাদেরও বাবা মায়েরা রয়েছেন। অতি সম্প্রতি মারা গেছেন মিশু শ্যালিকার বাবা। উনার বাবা মা দুজনকেই সরাসরি চিনি। সিডনি আসার পর উনাদের সাথে পরিচয় হয়েছিল। পুরোপুরি আধুনিক এবং চমৎকার দুজন মানুষ। অতি সহজেই মানুষকে আপন করে নেয়ার একটা ক্ষমতা উনাদের আছে। খালাম্মা আমাকে দেখেই এমনভাবে আলাপ শুরু করতেন যেন আমি উনার নিজের মেয়ের জামাই এবং আমাদের পরিচয় অনেকদিনের। খালুজানকে একবারই সালাম দেয়ার সৌভাগ্য হয়েছিলো। খালুজান এবং খালাম্মার পরিচয়ের গল্প শুনেছি মিশু শ্যালিকার কাছে। সেখান থেকেই জেনেছি দুজনেই হরিহর আত্মা। আমি একজন মেয়ের বাবা হিসেবে এখন জানি বাংলাদেশে চার চারটি মেয়েকে বড় করে তোলা কতবড় গুরুদায়িত্ব তার অভিভাবকদের জন্য। খালুজান সেই কাজটা খুবই সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছেন বলেই আমার বিশ্বাস।

হঠাৎ একদিন শুনি খালাম্মা এবং খালুজান দুজনেই করোনায় আক্রান্ত। খালাম্মা সুস্থ্য হয়ে গেছেন কিন্তু খালুজানের অবস্থা অপরিবর্তিত। মিশু শ্যালিকা দেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। করোনার সময়ে দেশে যাওয়ার অনেক ঝক্কি তবুও উনি হাল ছাড়েননি এবং শেষ পর্যন্ত উনারা দুবোন দেশে যেতে পারলেন। এরপর একদিন হঠাৎ শুনি উনার বাবাও অনন্তকালের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিয়েছেন। উনাকে দেয়ার মতো সান্তনার কোন ভাষা আমি আজও খুঁজে পাইনি। উনাদের জীবনে ভাইয়ের এবং বাবার দুজনের আসনেই ছিলেন উনাদের বাবা তাই খালুজানের প্রতি উনাদের ভালোবাসার গভীরতাটা সহজেই অনুমান করা যায়। উনাদেরকে আমি সরাসরি দেখতে পাচ্ছি না বা কথা হচ্ছে না কিন্তু আমি জানি উনারা ঠিক কতটা মুষড়ে পড়েছেন। হয়তোবা উনাদের মনেহচ্ছে আরো আগে দেশে যেয়ে সেবা শুশ্রুষা করলে উনাদের বাবা হয়তোবা ভালো হয়ে যেতেন। এখন সারাজীবন এই আক্ষেপটা মিশু শ্যালিকা বয়ে বেড়াবেন।

এভাবেই প্রবাস জীবন আমাদের জীবন থেকে আত্মীয় পরিজনের ‘ওম’ কেড়ে নিচ্ছে একে একে। প্রবাসে আমাদের পরবর্তি প্রজন্ম বড় হচ্ছে আত্মীয় পরিজনের ভালোবাসাহীন এক পরিবেশে। এতেকরে ওরা হয়তোবা জীবনে অনেক সফল হবে কিন্তু আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি ওদের মানসিক বিকাশ পুরোপুরি হবে না। ওরা কখনওই আত্মীয়পরিজন হারানোর বেদনা আমাদের মতো করে অনুভব করবে না। আর আমরা যারা প্রথম প্রজন্ম ‘বোবা কান্না’ করে যাবো দেশে হারানো পরিজনের জন্য। একটা কান্নার ডেলা গলার কাছে আটকে যাবে আমাদের। তার পরিবর্তে একটা দীর্ঘশ্বাস হয়তোবা বুক থেকে বেরিয়ে যাবে। সেটা শুধু আমরাই অনুভব করতে পারবো।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)