চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রবাসীর করোনাকালীন বাবা দিবস

পঞ্জিকার পাতা ঘুরে আবার আমাদের সামনে এসেছে বাবা দিবস। সন্তানের প্রতি বাবার অকৃত্রিম স্নেহ, ভালোবাসা, ত্যাগ তিতিক্ষার খবরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাতা ভরে উঠেছে। অনেকেরই বাবা জীবিত আছেন আবার অনেকের বাবাই গত হয়েছেন কিন্তু রয়ে গেছেন সন্তানের স্মৃতিতে। বাবা বিষয়ে প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ বলতেন, পৃথিবীতে অনেক খারাপ মানুষ আছে কিন্তু একটাও খারাপ বাবা নেই। যাই হোক করোনার এই সময়ে বাবা দিবসটা অনেকের কাছেই বড্ড দুঃখের কারণ এই করোনা তাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে তাদের প্রাণপ্রিয় বাবাকে। যে বাবাকে পাশে নিয়ে কেক কেটে বা হুল্লোড় করে বাবা দিবস পালন করার কথা ছিলো সেই বাবা আজ আশ্রয় নিয়েছেন ছবির ফ্রেমে।

আজ এমনই দুজন বাবার গল্প বলবো। প্রবাসে আমরা একে একে জীবনের সবকিছু অর্জন করলেও সবসময়ই যে জিনিসটা খুবই অনুভব করি সেটা হচ্ছে দেশে গুরুজনের অকৃত্রিম স্নেহ এবং ভালোবাসা। তাই প্রবাসী প্রথম প্রজন্ম সবসময়ই বোবাকান্না করে চলে দেশে ফেলে আসা স্বজনদের জন্য বিশেষকরে লুকিয়ে অশ্রু মুছেন দেশে ফেলে আসা বাবা মায়ের জন্য। অনেকেই চেষ্টা করেন বাবা মাকে নিজের কাছে নিয়ে এসে রাখার। আবার অনেকেই নিয়ে আসতে না পারলেও কিছুদিনের জন্য হলেও বেড়াতে নিয়ে আসেন। আর তাও না পারলে অন্ততপক্ষে প্রতিবছর নিজেরা দেশে যেয়ে বাবা মাকে দেখে আসেন। তাদের স্নেহের স্পর্শে খুঁজে নেন প্রিয়জনের ওম। বর্তমান বিশ্বে বাবা মাকে চাইলেই দেখা যায়, কথা বলা যায় কিন্তু তাদের মায়াময় স্পর্শ পাওয়া যায় না। সামান্য একটা স্পর্শ যে মানুষের দুঃখকে কতখানি লাঘব করতে পারে সেটা প্রবাসী মাত্রই আমরা হাড়েহাড়ে বুঝি।

বিদেশে আসার পর আমার গিন্নী প্রায় প্রতিদিনই আমার শ্বশুর শাশুড়ির সাথে কথা বলতেন এবং কান্না করতেন। সময়ের পরিক্রমায় কান্নার পরিমাণটা কমে আসলেও দীর্ঘশ্বাস কিন্তু থেমে নেই। প্রতিবার উনাদের সাথে কথার শেষ করে বুকে আটকে থাকা দীর্ঘশ্বাসটা বেরিয়ে আসে মনের অজান্তেই। আমরাও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে উনাদের আমাদের কাছে নিয়ে আসতে পারিনি। আর করোনার কারণে উনাদের কাছে যাওয়াও বন্ধ হয়ে গেছে। তাই পরিচিত কারো বাবা মা তাদের কাছে বেড়াতে আসলে আমরা সবসময়ই উনাদেরকে একটা দিনের জন্য হলেও আমাদের বাসায় বেড়াতে আসতে বলতাম। গুরুজনদের সান্নিধ্যে আমরা কিছুক্ষণের জন্য হলেও ফিরে পেতাম দেশে ফেলে আসা স্বজনদের ছোঁয়া আর আমাদের দ্বিতীয় প্রজন্ম ফিরে যেতো শেকড়ের কাছে।

আমার গিন্নীর ক্যাম্পাসের বান্ধবী প্রণতি। উনারাও অস্ট্রেলিয়া থাকেন আমাদের বাসার কাছেরই একটা সাবার্বে। ২০১৭ সালে উনাদের বাবা মা এবং ছোট ভাই উনাদের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন। উনাদের আসার খবরে প্রণতির পাশাপাশি আমরাও খুশি হয়েছিলাম কারণ বহুদিন পর কোন অভিভাবকদের দেখা পাওয়া যাবে। উনারা অস্ট্রেলিয়া এসে ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করছিলেন। প্রণতির বাবা সুবোধ কাকুর সাথে এর আগে থেকেই ফেসবুকে যোগাযোগ ছিলো তাই উনি আমাদের সবাইকেই একেবারে নামে চিনতেন। ফেসবুকে আমরা যেকোনো কিছু পোস্ট করলেই উনি এসে সবার আগে প্রতিক্রিয়া এবং মন্তব্য দিতেন। এভাবেই উনি আমাদের কন্যা তাহিয়া এবং পুত্র রায়ানকে নিজের নাতি নাতনীর মতোই স্নেহ করতেন।

সপরিবারে সুবোধ দাশ

আমিও কাকাবাবুর পোস্টগুলো মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। উনি অফিসের কাজের জন্য বিভিন্ন জেলায় গেলেই সেসব জায়গার ছবি তুলে পোস্ট করতেন। সেগুলো আমার খুবই ভালো লাগতো তাই আমি উনার কাছে আবদার করে রেখেছিলাম দেশে গেলে উনার সাথে ঘুরবো কিছুদিন। এছাড়াও প্রণতির ছোট ভাই প্রীতমের সাথেও ফেসবুকে যোগাযোগ ছিলো। প্রীতম গ্রামীণফোনে চাকরি করেন। আমিও জীবনের একটা দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে বাংলা লিংক কোম্পানিতে চাকরি করেছি। আর আমাদের অনেক বন্ধু বিভিন্ন টেলিকম কোম্পানিতে চাকরি করতো বা এখনও করে। সেদিন দিয়েও প্রীতমের সাথে একটা আত্মীক টান অনুভব করতাম। একসময় গ্রামীণফোন বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের জার্সি তৈরি করলো। আমি আবদার করাতে প্রীতম আমাদের তিনজনের জন্য সেই জার্সি পাঠিয়ে দিয়েছিলো। সেগুলো এখনও আমরা যত্ন করে রেখে দিয়েছি। বাংলাদেশের খেলা থাকলেই আমরা সেগুলো পরে খেলা দেখি। আবার ছেলে এবং মেয়েটা স্কুলের ‘জার্সি ডে’তে সেই জার্সি পরে এখনও স্কুলে যায়।

বিজ্ঞাপন

অবশেষে একদিন সন্ধ্যার সময় উনারা আমাদের বাসায় বেড়াতে আসলেন। এসেই তাহিয়া এবং রায়ানকে কাছে ডেকে নিয়ে পরম স্নেহে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। এ যেন জীবনের পরম আদরের ধনকে কাছে পাওয়া। তাহিয়াকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের বাসার ওয়াইফাই এর পাসওয়ার্ড কি? ও যখন পাসওয়ার্ডটা বললঃ তখন উনি খুবই খুশি হলেন। এরপর তাদের নানা নাতনীর গল্প শুরু হলো। দেখে মনে হবে তাদের এই গল্প যেন আর কখনওই শেষ হবে না। ছোট্ট রায়ান মাঝেমধ্যে এসে উঁকি দিয়ে যাচ্ছিলো। এরপর উনাদের নিয়ে গেলাম আমাদের বাসার পাশের মিন্টো টেম্পলে। সেখানে যেয়ে পূজা সেরে কাকাবাবু অনেক ছবি তুলে নিলেন আর আমাকে বললেন, তোমাদের এখানকার মন্দিরগুলো অনেক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। কাকাবাবুরও আমার মতো ছবি তোলার উৎসাহ ছিলো। যেকোন জায়গায় গেলে সেখানকার অনেক ছবি তুলতেন।

এরপর রাতের খাওয়া শেষ করে শ্যালক প্রীতমকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম আমাদের বাসার পাশের সবার্ব কেন্টলিনের উদ্দেশ্যে। কেন্টলিন সবার্বটা জর্জেস নদীর অববাহিকায় অবস্থিত। নদীর দুপাশেই ঘন বন। তার মধ্যে দিয়েই আছে পায়ে হাঁটার (বুশ ওয়াক) পথ, সাইকেল চালানোর পথ এবং মোটর বাইক চালানোর পথ। গাড়ি চালিয়ে একটা জায়গায় যেয়ে রাস্তা শেষ হয়ে যায়। সেখানে গাড়ি পার্ক করে অন্য কাজগুলো শুরু করতে হয়। আমরা রাস্তার শেষ প্রান্তে যেয়ে গাড়ি পার্ক করে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি চাঁদমামা উঁকি দিচ্ছেন। গোলাকৃতি জায়গাটার চারদিকেই বন তাই আমাদের মাথার উপরে শুধু এক টুকরো গোলাকার আকাশ দেখা যাচ্ছিলো। প্রীতম বেশকিছু ছবি তুলে নিলো। এরপর বাসায় ফিরে আসলাম আমরা। তার কিছুক্ষণ পর উনারা ফিরে গেলেন।

সিডনি অপেরা হাউসের সামনে সুবোধ দাশ

এটাই ছিলো কাকাবাবুর সাথে আমাদের শেষ দেখা। এরপর একসময় উনারা দেশে ফিরে গেলেন কিন্তু আমার কখনও মনে হতো না যে উনারা আমাদের থেকে দূরে আছেন কারণ কাকাবাবু ফেসবুকে প্রচন্ড অ্যাকটিভ ছিলেন এবং আমাদের প্রত্যেকটা কাজকর্মে নজর রাখতেন। এভাবেই সময় বয়ে যাচ্ছিলো। আমি মনে মনে পরিকল্পনা করছিলাম ২০২০ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফিরে কাকাবাবুর সাথে অন্ততপক্ষে একটা ট্যুর দেয়ার। সেই মোতাবেক আমাদের টিকেটও করা ছিলো আগাম কিন্তু করোনা এসে সব ভেস্তে দিলো। কাকবাবুকে অফিসের কাজেই বাসার বাইরে যেতে হতো। তাই এর মধ্যেই একসময় উনি করোনায় আক্রান্ত হলেন। উনি আমার দেখা একজন অন্যতম জীবন যোদ্ধা ছিলেন কারণ উনার হৃদযন্ত্রের হাজারো সমস্যাকে কেয়ার না করেই উনি জীবন চালিয়ে নিচ্ছিলেন। আমরা তাই এবারও ভেবেছিলেন উনি করোনাকেও জয় করে আবার আমাদের মধ্যে ফিরে আসবেন কিন্তু এইবার উনি আর ফিরলেন না। চলে গেলেন মহাকালের পথে।

প্রবাসীর বাবা দিবস মানেই একটা দীর্ঘশ্বাসের নাম কারণ বাবাকে ছুঁয়ে দেখতে পারেন না। কিন্তু জীবিত থাকলে অন্ততপক্ষে কথা বলা যায়, তাকে দেখা যায়। করোনার জন্য আমাদের অনেকেই তাদের বাবাকে হারিয়েছেন। তাই এখন তাদের জন্য বাবা দিবস মানে বোবা কান্নার দিবস। বাবার অন্যান্য সন্তানেরাও হয়তো কান্না করেন কিন্তু প্রবাসীদের সাথে তাদের তফাৎ হলো প্রবাসীরা তাদের বাবাদের শেষ সময়ে উপস্থিত থাকতে না পারার কারণে মনের মধ্যে একটা ক্ষত বয়ে নিয়ে চলেন বাকি জীবনটা। এরপর তাই যতবারই তাদের জীবনে বাবা দিবস আসে ততবারই মনের মধ্যে একটা হাহাকার কাজ করে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন