চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রতিবেশী শহরের গল্প (পর্ব-৩)

দ্বিতীয়বারের মতো কফি হাউসে এসেছি। বিকেল বেলাতেই প্রচন্ড ভীড়। দশ বছর আগে ও পরের মধ্যে কফি হাউসের কোনো পরিবর্তন নেই। মানুষগুলোর পরিবর্তন আছে শুধু। এখন কফি হাউসে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে কিশোরী ধুমপায়ীর মুখ। বোঝা যায়, স্কুল পেরিয়েছে কেবল। কলেজ বা কোচিং ক্লাস শেষ করে ব্যাগ কাঁধে কফি হাউসে ঢুকে পড়াটা একটা ফ্যাশন। সেটিও আবার একটু অন্য ধরনের। মানে আর্ট কালচারও আছে, আবার কিছুটা ঔদ্ধত্যও আছে। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তিনতলায় একেবারে কোনায় গিয়ে টেবিল ফাঁকা পেলাম। পাশের টেবিলে একটি ছেলে তিনটি মেয়ে। দুইজন মেয়ে ধুমপায়ী। অন্য ছেলে ও মেয়ে অধুমপায়ী। ওরা ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারের ওপরে হবে না। কিন্তু রকম শকমে বেশ ধাতস্থ মনে হয়। কোনো সংশয় জড়তা নেই। আমার স্ত্রী লাইলা খালেদা এসব দেখে বললেন, এরা ‘ফাস্ট কিন্তু স্মার্ট না’। লক্ষ্য করে দেখলাম কথাটা একেবারে ঠিক। তারপরও বিষয়টিকে ইতিবাচক মনে হলো। এদের পোশাকি বাহাদুরিটা নেই। পোশাক দেখে পারিবারিক অবস্থাটা বুঝে নেয়া যায়। এক ধরণের সংগ্রাম আছে চেহারার মধ্যে। সংগ্রামের ভেতর দিয়ে চলছে বলে এদের পারিবারিক আর বাহ্যিক জীবনের মধ্যে বড় কোনো পার্থক্য নেই। যে কারণে ওরা বাস্তবতাকে সঙ্গে করে চলে। বাংলাদেশে কিশোর তরুণরা পোশাকের আবরণে অনেক ক্ষেত্রে ছদ্মবেশি হয়ে যায়। কথাবার্তাতেও অনেকসময় ছদ্মবেশ ভর করে। তারা বাস্তবতাকে সঙ্গে করে চলে না। যে কারণে, সবখানেই ঝামেলা ও সংঘাত সৃষ্টি হয়।

অজস্র বেয়ারা কর্মীতে ঠাসা কফি হাউস বোধ হয় এখন পৃথিবীর একমাত্র চায়ের দোকান, যেখানে পেটের ক্ষুধা নয় মনের ক্ষুধা মেটাতেই প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ আসে। এদের ষাট-সত্তরভাগই তরুণ বয়সের। ভারতবর্ষের তারুণ্য কি জিনিস তা বোঝার জন্য এখানে দাঁড়িয়ে থাকা যায়। এদের আলোচনার বিষয়গুলোতে কান দেয়া যায়। এই কফি হাউসে যারা যাতায়াত করে তাদের রুচি বা চিন্তা-ভাবনা ভিন্ন ধরনের। আমরা যারা বাংলাদেশ থেকে যায় তারা মান্ন্ দে’র গানের সব চরিত্র খুঁজে বেড়াই কফি হাউসে। মনে হয় কোনো টেবিলে হয়তো খোদ মান্না দে’র তরুণ অবয়ব বসে চায়ে চুমুক মেরে দু আঙুলের ফাঁকে রাখা চারমিনার ঠেসে ধরছে ঠোঁটে। ধোঁয়ার সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে অদ্ভুত সুর।

বিজ্ঞাপন

কলকাতায় এখন ধূমপায়ীর মুখের ধোঁয়া কম। বিড়ি সিগারেট অনেক কমিয়েছে ‘খইনি’। সব বয়সী মানুষ, সব সমাজের মানুষই হাতের তালুতে ঘষছে তামাক। সিগারেটের দোকানগুলোতে খইনির বস্তা বেশ উঁচু। রিক্সাঅলা ভাড়ায় যাবে না, হাতের খইনি ঘষে পিষ্ট করে ঠোঁটের পাটিতে না ফেলা পর্যন্ত। অবশ্য, খইনি কাউকে বেসামাল করছে বলে মনে হলো না। একটি লঘু নেশার ব্যাপার। ভারী নেশাও তরুণরা করছে। একেবারে রিক্সাচালক পর্যায়েও মধ্যম পর্যায়ের চোর ও প্রতারকের সন্ধান পাওয়া যায়। বোঝা যায়, ওরা ভারী নেশা করে। এক সন্ধ্যায় রাস্তার দিক হারিয়ে পার্ক স্ট্রিট থেকে এক রিক্সাঅলাকে বললাম, নিউ মার্কেট। বললো ৩০ টাকা। একেবারে নিউমার্কেটের পাশে নামিয়ে দেব। কিন্তু ৩০ টাকার রিক্সাঅলা যা করলো তা রীতিমত প্রতারণা। সে একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন গলির ভেতর দিয়ে গিয়ে এমন জায়গায় নামিয়ে দিল যেখানে কোনো দিক খুঁজে পাওয়া যায় না। যার কাছে শুনি, সেই এমন পথ দেখিয়ে দেয়, নিউমার্কেট যেন দূরে চলে যায়। পরে বুঝলাম, রিক্সাঅলা জেনেশুনে আমাদের হয়রানি করেছে। নেশার টানে দ্রুত টাকার জন্য এই বুদ্ধিটি খাটিয়ছেছে সে।কলকাতার সব রাস্তা চিনে নেয়াটা সহজ নয়। আবার অলিগলিতে গেলে তো দিকহারা হওয়ার যথেষ্ট আশংকা আছে। তবে সেদিন ওই চোরাগলির মধ্যে ঢুকে না পড়লে কলকাতার আদি চেহারাটি দেখা হতো না। রাস্তা থেকেই উঠে গেছে পুরনো বিল্ডিয়য়ের ছোট ছোট খুপড়ির মতো কক্ষ। সেখানে একটি কক্ষের ওপরে মাচা করে এক পরিবার, নীচে আরেক পরিবার। অধিকাংশ খুপড়ির দরজা খোলা। এক বৃদ্ধা শুয়ে, একজন তার মাথার কাছে বাটনা বাটছে। কয়েকটি শিশু এদিক ওদিক ঝুলছে। তার মধ্যে আরো দুয়েকজনের মাথা দেখা যায়। ঘরে টিমটিমে বাতি। বোঝা যায় এটি অন্যরকম জীবন। এই জীবনটিই দীর্ঘদিন যাপন করেছে কলকাতার বড় একটি অংশের মানুষ। এদের কাছে এক কাপ চা হয়তো এখনও দামী হয়ে আছে। দীর্ঘকাল এরা একই জীবন যাপন করছে। হয়তো কয়েক প্রজন্ম একই থালায় ভাত খায়, একই গ্লাসে পানি খায়, একই বালিশে ঘুমায়। একেকটি ঘরে কয়েক প্রজন্মের শ্রম, ঘাম আর স্বস্তি-অস্বস্তির গন্ধ ছড়ানো।

পার্ক স্ট্রিট আর সদর স্ট্রিট বহু আগে থেকেই বাংলাদেশপাড়া। হোটেলগুলো পুরনো হয়ে যাচ্ছে। কম টাকায় মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করে রেখে হোটেলগুলো ভালোই ব্যবসা করছে। কেউ কেউ যাবতীয় সুযোগ সুবিধা সম্বলিত হোটেল কক্ষের ব্যবস্থা করেছে ঠিক, তবে বেশি দামের কক্ষের তুলনায় কমদামের কক্ষগুলো আগে ভরে যায়। বেশি টাকার কক্ষে উঠেও স্যাঁৎসেতে ভাব, ওয়াইফাই সংকটের মতো বিষয়গুলো মোকাবিলা করতে হয়। তাই একটু দূরে পার্ক সার্কাস এলাকায় উঠেছিলাম এবার। হোটেলের নাম লী ইন্টারন্যাশনাল। ছোটখাটোর মধ্যে ভালো ব্যবস্থাই সেখানে। তবে ইন্টারন্যাশনাল শব্দটি ব্যবহারের কারণে তাদের ছোট পরিসরেই বিশেষন জায়েজ করার একটা প্রয়াস আছে। যেহেতু ইন্টারন্যাশনাল তাই হোটেলে বাংলা সংবাদপত্র দেবে না। যেহেতু ইন্টারন্যাশনাল তাই বাফেট ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা আছে। সমস্যাটি হচ্ছে একটির সাথে আরেকটি মেলে না। আটটায় ঘুম থেকে ডেকে জানিয়ে দেয় স্যার নাস্তা সাজিয়েছি এসে খেয়ে নিন। এরপর কিছুক্ষণ পর পর ডাকতেই থাকে। এই ব্যবস্থাটি ইন্টারন্যাশনাল নয়, একেবারেই স্থানীয়। তবে আমার জন্য সুবিধা ছিল এই যে হোটেল থেকে আমার দরকারি জায়গাগুলো কাছে। হেঁটেও যাওয়া যায়। কাছাকাছি বেশ কয়েকটি মসজিদ। আজানের শব্দও ভেসে আসে। এসব সুবিধাই আগে বিবেচনা করেছি।

বিজ্ঞাপন

কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের প্রতি কোনো অধিকার নেই, প্রতিবেশি হলেও এটি অন্য দেশ। কিন্তু একটি জায়গাই যেন এই ভূখন্ডকে আপন করে রাখে। তা হলো ভাষা। অন্তত. প্রাণ খুলে কথা বলা যায়। কিন্তু দিনে দিনে সে অবস্থাটি আর থাকছে না। সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, কলকাতাই বুঝিয়ে দেবে, তারা অন্যদেশ, অন্য সংস্কৃতির। বাংলা নিয়ে তাদের আদিখ্যেতা থাকলেও দরদ বলতে কিছু নেই। বাংলার চর্চাটাও একেবারে ঝিমিয়ে পড়ছে। একটি প্রাইভেট মেডিক্যাল সেন্টারে টানা কয়েকদিন যেতে হচ্ছে। লক্ষ্য করলাম, সেখানে কর্মীরা হরদম হিন্দি বলছেন। কর্মকর্তা পর্যায়ের কয়েকজন একটি কক্ষে বসা। তাদের কাছে একটি বিষয় নিয়ে গেছি। আমি বলছি বাংলায় আর তারা বলছে হিন্দিতে। আমি হিন্দি একেবারেই বুঝি না, তাই বললাম, আপনারা সবাই তো পশ্চিমবঙ্গের তাই না ? তাহলে তো বাংলা বলতে পারেন। বাংলা তো জন্মসূত্রে সবাই জানেন। একজন বললেন, তা হলেও হিন্দিটা জাতীয় ভাষা। এটা তো বলতেই হবে, বুঝলেন! আমি বললাম, বুঝলাম। অবশ্য, তারপরে তারা অনেকক্ষণ আমার সঙ্গে বাংলাতেই কথা বলেছে। আমিও এও বুঝে নিলাম, বাংলাটা এদের ঘরের আটপৌরে ভাষা। অফিসে কিংবা সামাজিকতায় হিন্দি বলাটা এদের কাছে আভিজাত্যের মতো। এই আভিজাত্যের চর্চাটাই চলছে গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে। আর দুয়েক প্রজন্ম যেতে যেতেই বাংলা যে এখানে দুষ্প্রাপ্য হয়ে যাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

জাতীয়তা বলে কথা। সবাই কেন্দ্রে পৌঁছতে চায়। কেন্দ্রে যেতে হলে হিন্দি দিয়েই যেতে হবে। আর বৃত্ত ভাঙতে হলে লাগবে ইংরেজি। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের এই প্রত্যয় ঠিকই বুঝে নেয়া যায়। এর পাশাপাশি শুদ্ধাচার ও কর্পোরেটের চর্চাও এগিয়ে যাচ্ছে প্রবলগতিতে। আমি যে মেডিক্যাল সেন্টারে যাই, সেখানকার কথাই বলি। কাজগুলো চলছে একটি সিস্টেমের ভেতর। ব্যক্তি যেন কিছুই করছে না। সিস্টেমই তাকে কাজ করিয়ে নিচ্ছে। যারা সেখানে রোগী হিসেবে ঢুকছে তারাও সিস্টেমে পড়ে যাচ্ছে। বাণিজ্য আছে কিন্তু তার মধ্যে আছে স্বচ্ছতা। যার যা দায়িত্ব অফিসে তিনি সেটুকুই জানেন। এর বাইরে আর কিছুই জানেন না। এ কারণে কোনো জায়গাতেই জট তৈরি হচ্ছে না। কোথাও বাজে প্রতিযোগিতা ও বিশৃংখলা নেই। কোনো বিশেষ ব্যক্তির প্রতি অতি তোষামদি নেই। বস বস স্যার স্যার নেই। মিটিংয়ের অজুহাত নেই। সিস্টেমের কারণে ভোক্তা বা সেবাপ্রার্থীও যেন নতুন গতি পেয়ে যাচ্ছে। দূর্বলতা কেটে যাচ্ছে তাদের। অপেক্ষার বিষয় আছে বটে কিন্তু সে অপেক্ষার মধ্যেও একটি শৃংখলা আছে। হঠাৎ করে কোনো কারণে কেউ বেশি গুরুত্ব পেয়ে গেল, কারো গুরুত্ব কমে গেল এমন বিষয় নেই। যা হোক, একজন মেডিক্যাল এসিসস্ট্যান্ট ইনজেকশন দিলেন। বেশ গুরুত্ব দিয়ে তিনি কাজটি করলেন। ভাবলাম তাকে দুশো টাকার খুশি করাই যেতে পারে। কিন্তু অবাক হলাম। টাকা নিয়ে খুশি হওয়ার সংস্কৃতিই যেন তার একেবারে অপিরিচিত। টাকা তো নিলেনই না বরং টাকা বের করার কারণে বেচারা মনে হয় একটু বিব্রতই হলেন। আমিও বিব্রত হলাম। আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, আমাদের ওখানেও এসব ছোটখাটো ব্যাপারে টাকাপয়সা দেয়ার রেওয়াজ নেই। এখানে অন্য হসপিটালে আছে, তাই…। একই ঘটনা ঘটলো আমরা বেরিয়ে আসছি একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী আমাদের বিদায় দিতে এগিয়ে এলেন। বুঝে নিলাম, তিনি কিছু আশা করেন। এক’শ টাকার একটি নোট বের করে হাতের ভেতর দিতে চাইলাম। ধাক্কা খেলাম এখানেও। এমনকি অনুরোধ করেও তাকে দিতে পারলাম না।

(চলবে)

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

Bellow Post-Green View