চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রজন্ম যেন কামাল লোহানীদের ভুলে না যায়

কলা গাছের শহীদ মিনার। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে তৈরি করা এই শহীদ মিনার ভেঙে পুকুরে ফেলে দিয়েছিলেন উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ মাওলানা আবু তালেব। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বানানো শহীদ মিনার ভেঙে ফেলার সংবাদ পাঠায় পত্রিকা অফিসে। পরদিন ছাপা হয়। বেশ কিছুদিন পর ভাষা সৈনিক বরেণ্য সাংবাদিক কামাল লোহানী চাচাকে ফোনে এ বিষয়টি অবহিত করার পর তিনি বললেন: কী বলেন আশরাফ, স্বাধীন দেশে এও কি সম্ভব!

একসময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশের পুরোধা বরণ্যে কামাল লোহানীর সম্পাদনায় দৈনিক প্রভাত পত্রিকায় সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করতাম। সেই সুবােদ ঢাকায় আসলে শান্তিনগরের অফিসে হঠাৎ দেখা করার সুযোগ হতো।

বিজ্ঞাপন

আমাদের শৈশবে এভাবে কলাগাছ দিয়ে শহীদ মিনার বানাতাম। এটা আমাদের আবেগের সঙ্গে জড়িত। স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িত। স্বাধীন দেশে জামায়াত নেতা কর্তৃক শহীদ মিনার ভাঙার বিষয়টি সংবাদ করেছি আমার চেতনায়। পরে এই সংবাদ উচ্চ আদালত স্বপ্রণোিদত হয়ে রুল জারি করেন। শেষ পর্যন্ত উপেজলা জামায়াত সেক্রেটারি মাওলানা আবু তালেবকে আটক করা হয়। উচ্চ আদালত বলেন, রাজাকার, স্বাধীনতা বিরোধীদের বাংলাদেশের থাকার কোন অধিকার নেই। ত্রিশ লাখ লোকের রক্তের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। এদেশকে রাজাকার-আলবদর মুক্ত করতে হবে।

১৯৫৩ সালে পাবনার তৎকালীন জিন্নাহ্ পার্কে (বর্তমান স্টেডিয়াম) মুসলিম লীগ কাউন্সিলে নুরুল আমিনের আগমনের প্রতিবাদ করায় প্রথম গ্রেপ্তার হন কামাল লোহানী। আজীবন দেশবিরোধী কুখ্যাত রাজাকারদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গেছেন এই বরেণ্য। প্রগতিশীলতার ধারক বাহক এই বরেণ্যর জন্য আমরা কী করতে পেরেছি। তার কাছ থেকে কী বার্তা আমরা পেয়েছি। হয়তোবা আমাদের কাছ থেকে আজ চলে যাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, গণমাধ্যমে শোক, শ্রদ্ধা ও স্মৃতিচারণ নিয়ে লেখালেখি করবো। আজও সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানীর মতো বরেণ্য ব্যক্তিদের নিয়ে আমরা কোন প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করতে পারিনি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়েই তো আমরা ভাল মানের কোন ছবি তৈরি করতে পারিনি। হয়তোবা কিছু হয়েছে। কিন্তু বাঙালির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে আমরা আন্তর্জাতিক মানের একটি ছবি তৈরি করতে ব্যর্থ।

বিজ্ঞাপন

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে অনেক বরেণ্য ব্যক্তিত্ব আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন। এখনই নতুন প্রজন্মের অনেকেই কামাল লোহানী সম্পর্কে কম জানেন বলে আমার ধারণা। একটা সময় এই ব্যক্তিদের ইতিহাস আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম জানবে৷ হয়তো কোন এক সময় উইকিপিডিয়া ঘেঁটে দেখতে পারবে স্বল্প পরিসরে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে একসময় অপপ্রচার ও ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছিল। একটা প্রজন্মের বড় হতে হয়েছে বিকৃত ইতিহাস জেনে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিক্ষা জীবনের সময় আজীবন দেশবিরোধী, পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর কুখ্যাত মোনায়েম খানের চরম বাধা দেওয়া সম্পর্কে হয়তো নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছে অজানা।করোনাভাইরাস

মোনায়েম খান হয়তো গল্পের সেই রাখাল বালকের মতো উপলব্ধি করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক অভিঘাতেই তার জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটবে। হয়তো তাই পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হওয়ার পর থেকে তিনি বঙ্গবন্ধুকে হয়রানি ও নিঃশেষ করে দেওয়ার সবরকম প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। সেসময় সুধীমহলের সবাই জানতেন, গভর্নর মোনায়েম খানের প্রধান প্রতিপক্ষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি ছিলেন তারই নিয়োজিত ড. ওসমান গণি। তিনিও ব্যক্তিগতভাবে প্রবল আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী ছিলেন। সেই প্রতিকূল সময়ে শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য যান। কিন্তু মোনায়েম খানের আক্রোশের ভয়ে সেসময় সরকারের প্রবল প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতা, কারাবন্দি ও বিচারাধীন শেখ মুজিবের মেয়েকে ভর্তি করতে অনেক বিভাগ আগ্রহী ছিল না। এরকম বাধা ও প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আজকের শেখ হাসিনা। আমাদের প্রকৃত ইতিহাস জানতে হবে। জানাতেও হবে। জাতির পিতার অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও কারাগারের রোজনামচা গ্রন্থ না পড়লে আমাদের অনেক কিছু অজানা থেকে যেত। নীলিমা ইব্রাহিমের আমি বীরাঙ্গনা গ্রন্থ না পড়লে আমরা অনেক কিছু জানতে পারতাম না মহান মুক্তিযুদ্ধের অনেক ইতিহাস। ভাষা সৈনিক কামাল লোহানীর রেখে যাওয়া গ্রন্থগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে কাজ করে যাওয়া এই ব্যক্তির চির স্মরণীয় করে রাখতে হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

বরেণ্য কামাল লোহানী আমাদের স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস নির্মাণে কাজ করে গেছেন৷ এদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে দিয়ে গেছেন অনেক কিছু। আমরা যেন ভুলে না যাই এই ইতিহাস।

এদেশের স্বাধীনতা, প্রগতিশীলতা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে যারা কাজ করেছেন তাদের অবদান শুধু চলে যাওয়ার দিন বা নির্দিষ্ট সময়ে নয়, সবসময় তুলে ধরা দরকার। আমাদের কাছ থেকে চলে যাওয়া বরেণ্যদের নিয়ে ডকুমেন্টারি তৈরি বা এমন কাজ করা দরকার, যা থাকবে যুগ যুগান্তরে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)