চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

পুলিশের ঘাড়ে চেপে বসেছে সামন্ততন্ত্রের ভুত

ব্যাংক কর্মকর্তা গোলাম রাব্বীর কাছে টাকা দাবি করে ক্রসফায়ারের হুমকি, সিটি কর্পোরেশনের পরিদর্শক বিকাশ চন্দ্র দাসকে মারধর, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে হয়রানি আর সর্বশেষ চা বিক্রেতা বাবুল মাতুব্বরকে চুলার আগুনে দগ্ধ করার ঘটনায় অভিযোগের আঙুল সরাসরি পুলিশের দিকে। পুলিশের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ নতুন না হলেও সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের বেপরোয়া আচরণ আগের তুলনায় বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে দমনযন্ত্র হিসেবে যথেচ্ছ ব্যবহার এবং ক্ষমতাযন্ত্রের একচ্ছত্র নির্ভরতার সুযোগে পুলিশের অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের কঠোর শাস্তি না হওয়ায় বাকিরা উৎসাহিত হচ্ছে। এ কারণে দিন দিন আইন ভঙ্গের নিন্দনীয় সব দৃষ্টান্তের জন্ম দিচ্ছে আইনের রক্ষকরাই। সামাজিক-পারিবারিক কারণ এবং রাজনৈতিক পরিবেশ পুলিশের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। সংস্কার, প্রশিক্ষণও কাজে আসছে না। নিয়োগে দুর্নীতি এবং আঞ্চলকি প্রীতির কারণে দোষী পুলিশরা সাজা পাচ্ছে না।

চ্যানেল আই অনলাইনের মাধ্যমে পুলিশের অপরাধ প্রবণতার সাম্প্রতিক উর্ধগতি নিয়ে এসব বিষয় তুলে ধরেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান, পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেসন্স বিভাগের সহকারী মহাপরিদর্শক নজরুল ইসলাম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ কামাল উদ্দীন।

ক্রিমিনোলজির শিক্ষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান বলেন,‘পুলিশের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা নতুন নয়। তবে বর্তমানে ক্ষমতাকেন্দ্রের দমনযন্ত্র হিসেবে একচ্ছত্র ব্যবহারে পুলিশ ক্ষমতার অপব্যবহার বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ পুলিশ এখন মনে করছে তাদের ছাড়া সরকার চলবে না’।

বার বার পুলিশের বিরুদ্ধে অন্যায়-অনিয়ম এবং অসদাচরণের যে অভিযোগ উঠছে এর জন্য দোষী পুলিশদের শাস্তি না হওয়াকে বড় কারণ বলে মনে করেন এই শিক্ষক।

তিনি বলেন, ‘পুলিশ সদস্য দোষ করলে তাকে ক্লোজ করার রীতি চালু আছে। এখানে শাস্তির বদলে সে বরং বসে বসে বেতন নেয়ার নিশ্চয়তা পেয়ে যায়। বড়জোর সাময়িক বরখাস্তের মতো লঘু শাস্তি দেয়া হয় তাদের। আসলে পুলিশের শৃংঙ্খলা ভঙ্গের শাস্তি অতোটা কঠোর নয়। অথচ আইনের রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকার জন্য কঠোর শাস্তির দৃষ্টান্ত নেই। এজন্যই আইনশৃংঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে’।

Advertisement

পুলিশের অপরাধ প্রবণতার জন্য গোটা পুলিশি ব্যবস্থার ত্রুটিকে দায়ী করে অপরাধ বিজ্ঞানের এই শিক্ষক বলেন,‘মেয়াদোত্তীর্ণ ১৮৬১ সালের ব্রিটিশ আইনে চলা পুলিশের ঘাড়ে এখনো সামন্ততান্ত্রিক ভুত চেপে বসে আছে। ব্রিটিশ আমলের মতো পুলিশ এখনো একটা দমন শক্তি ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে পুলিশ জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিতকারী একটি আইনি সংস্থায় পরিণত হয়েছে অনেক আগেই। দেশের পুলিশ বিভাগে নেয়া সংস্কার কর্মসূচি দেখলে প্রহসন বলে মনে হয়। ২০১২ সালে পুলিশ সংস্কার কর্মসূচির বেশিরভাগ সুপারিশ আলোর মুখ দেখেনি।’

তবে কিছু সদস্যের জন্য গোটা পুলিশ বাহিনীকে দায়ী করতে নারাজ পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেসন্সের সহকারী মহাপরিদর্শক নজরুল ইসলাম।

চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন,‘প্রশিক্ষণের সময় প্রত্যেক পুলিশ সদস্যকে করণীয়-বর্জনীয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেয়া হয়। কিন্তু একটি পরিবার ও সামাজিক বাস্তবতায় বেড়ে ওঠা মানুষকে কোনো প্রশিক্ষণ দিয়েই আদতে পরিবর্তন করা যায় না। ব্যক্তির আচরণ সবসময় নিয়ন্ত্রণেও রাখা সম্ভব নয়। এজন্যই অপ্রীতিকর ঘটনাগুলো ঘটে।’

কিন্তু পুলিশের অপরাধে কোনো ছাড় না দেয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন,‘মানবিক সীমাবদ্ধতা থাকবে। তবে পুলিশের মতো সেবাধর্মী পেশায় অপরাধের কোনো ছাড় নেই। পুলিশ সদস্য অপরাধ করলে সে আর পুলিশ সদস্য নয়, অপরাধী হিসেবেই বিবেচিত হবে। আর শৃংঙ্খলা ভঙ্গের শাস্তিতো পেতেই হবে। গতবছরই পুলিশের ৭৭ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছে।’

পুলিশের মধ্যে নৈতিকতা ও মানবিকতার সঙ্কটের জন্য রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতির দিকটি খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ কামাল উদ্দীন।

তিনি বলেন,‘অপরাধ প্রবণতা সবার মধ্যেই আছে। পুলিশের মধ্যে একধরণের অসন্তোষ বিরাজ করছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পেছনে আর্থিক বিষয় পরোক্ষ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে। মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা পরিশ্রমের তুলনায় পর্যাপ্ত পারিশ্রমিক পায় কিনা সেটাও ভেবে দেখার সময় এসেছে। অভাব অনেকসময় বিবেককে বিপথে নিয়ে যায়। তাছাড়া পুলিশের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি সবসময়ই নেতিবাচক। পুলিশের সমালোচনায় তাদের অনেকের ভালো কাজও চাপা পড়ে যায়। গণহারে দোষারোপের জন্য জনগণের থেকে পুলিশ আরও দূরে সরে যাচ্ছে। অসদাচরণের পেছনে পুলিশ সদস্য নিজে যতোটা দায়ী তেমনি সমাজের আরোপিত কিছু বিষয়ও দায়ী।’