চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

পুরান ঢাকার পরিপাটি ২ লাইব্রেরিতে পাঠক নেই কেন?

লালবাগ কেল্লা থেকে কিছুটা পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়েই রহমত উল্ল্যাহ মডেল হাইস্কুল (বালক)।  আরেকটু সামনে এগোতেই হাতের বামে রাজা শ্রীনাথ রায় স্ট্রিট। পুরান ঢাকার আর দশটা গলির মতো এখানেও রয়েছে গাড়ির গ্যারেজ, চা-পানের দোকান এবং কয়েকটি মুদি ও পুরি-সিংগাড়ার দোকান। তবে অন্য দশটি গলি থেকে এই গলিটির বিশেষত্ব হচ্ছে- এখানে রয়েছে পুরান ঢাকার জ্ঞানভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত ‘গ্রন্থবিতান’ লাইব্রেরি।

কোলাহলপূর্ণ ঘিঞ্জি পুরান ঢাকার মধ্যেও সবুজে ঘেরা ছিমছাম পরিবেশ পুরো লাইব্রেরি চত্ত্বরে। একতলা ভবন বিশিষ্ট লাইব্রেরির সামনের আঙিনাটি বেশ বড়। সেখানে রয়েছে মেহগনীসহ বেশ কিছু প্রজাতির গাছ। বুধবার লাইব্রেরিতে যখন প্রবেশ করলাম তখন বিকেলে পৌনে পাঁচটা। রমজান মাস এবং আকাশে মেঘ থাকায় লাইব্রেরির কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছিলেন লাইব্রেরিয়ান হারুণ অর রশিদ। দুই জন পাঠক পত্রিকা পড়ছিলেন, শেষ পাঠক হিসেবে তারাও বের হয়ে গেলেন।

বিজ্ঞাপন

হারুণ জানালেন, রমজানে আমরা বিকেলে ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত খোলা রাখি। অন্যান্য সময় বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত।

পাঠকদের আগ্রহ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিগত কয়েক বছর যাবত এখানে পাঠক সংখ্যা কমতির দিকে। যে ৮-১০জন নিয়মিত আসেন তারা মূলত পত্রিকার পাঠক। বই পড়া পাঠকদের সংখ্যা নেই বললেই চলে।

‘‘আগে বেশ কিছু তরুণ পাঠক নিয়মিত আসতো। কিন্তু মোবাইল আর ইন্টারনেটের কারণে তাদেরও আর দেখা যায় না।।’’

বেশ কিছু বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক এবং ম্যাগাজিন নিয়মিত রাখা হয় লাইব্রেরিতে। কিছু নির্দিষ্ট পত্রিকার প্রতি পাঠকদের আগ্রহ বেশি থাকায়, একটি পত্রিকা একজন পাঠক কতক্ষণ রাখতে পারবেন সে সময় নির্দিষ্ট করা আছে। একজন পাঠক একটি পত্রিকা সর্বোচ্চ ২০ মিনিট পড়তে পারেন।

পুরান ঢাকার গ্রন্থবিতান লাইব্রেরি

১৯৫২ সালে নিজস্ব সম্পত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই লাইব্রেরিতে রয়েছে সাহিত্য, বিজ্ঞান, রাজনীতি আর ইতিহাসের আকর গ্রন্থ। সবমিলিয়ে বইয়ের সংখ্যা ১০ হাজারেরও ওপরে।

হারুন জানান, তিন মাস পরপর বইগুলো রোদে নেড়ে ঝাড়পোছ করে আবার তাকে সাজানো হয়। এসব কাজের জন্য কয়েকজন কর্মচারিও রয়েছে।

২০ সদস্যের একটি কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে এই লাইব্রেরি। কর্মচারিদের বেতন ভাতাও হয় তাদের মাধ্যমেই।

বিজ্ঞাপন

পাঠক নেই, ভবনও ঝুঁকিপূর্ণ আজাদ মুসলিমে
গ্রন্থবিতান থেকে বের হয়ে কিছুটা এগিয়ে ডানে মোড় নিয়ে কিছুটা হাটলেই আমলিগোলা পার্ক। শুধু নামেই পার্ক, গাছ আছে মোটে চারটি। ছোট একটা মাঠ, সেখানে এলাকার ছেলেরা খেলাধুলা করে। এই পার্কেই আজাদ মুসলিম পাবলিক লাইব্রেরি।

লাইব্রেরিটি প্রতিষ্ঠার গৌরবময় ইতিহাস থাকলেও বর্তমানে এর অবস্থা খুবই শোচনীয়। পাঠকের আনাগোনা যেমন নেই বললেই চলে, দীর্ঘদিন মেরামতের অভাবে ভবনটিও হয়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ।  ভবনের সঙ্গে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ লেখা সাইনবোর্ডও টাঙানো রয়েছে।

দুই তলা ভবনের নীচতলা ব্যবহৃত হয় কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে। এলাকার মানুষের বিয়ে-শাদীসহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় এখানে। দ্বিতীয় তলায় রয়েছে লাইব্রেরি।

পর্যাপ্ত টেবিল চেয়ার সমৃদ্ধ লাইব্রেরিতে রয়েছে ১৭ আলমারি; যার প্রতিটিই বইয়ে ঠাসা। বেশিরভাগই ধুলোমলিন। পাঠক নেই, তাই যত্নও কম।

আমলিগোলার স্থানীয় বাসিন্দা মনির হোসেন (৫০) জানালেন, এক সময় প্রচুর লোক এখানে আসতো, পড়াশোনা করতো। এখন আর তেমন কাউকেউ দেখা যায় না।

তিনি বলেন, পত্রিকা পড়তে কয়েকজন আসেন নিয়মিত, কিন্তু সংখ্যাটা বলার মতো না। চারটি পত্রিকা রাখা হয়। সেগুলোতেই নেড়েচেড়ে চলে যান তারা।

আমলীগোলা পার্কের আজাদ মুসলিম লাইব্রেরি

দোতলার মিলনায়তনে মাঝেমধ্যে স্মরণসভা, আলোচনা সভা জাতীয় অনুষ্ঠান হয়। গত বুধবারও এখানে নির্বাচনী সহিংসতা প্রতিরোধে জনগণ এবং সুশাসনের জন্য নাগরিক’র (সুজন) একটি গোলটেবিল বৈঠক ছিল।

লাইব্রেরিটি প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়, ১৯৫২ সালরে শুরুর দিকে ভাষা আন্দোলনের চেতনা বুকে নিয়ে পুরান ঢাকার বিশিষ্ট শিক্ষাব্রতী নাজির হোসেনের নেতৃত্বে একদল উদ্যমী যুবকের প্রচেষ্টায় লাইব্রেরিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর এলাকার শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা যুবক এবং শিক্ষানুরাগীদের মিলনমেলায় পরিণত হয় লাইব্রেরিটি। কিন্তু কালের বিবর্তনে এটির বর্তমান অবস্থা খুবই করুণ।

স্থানীয়দের ধারণা, জীর্ণশীর্ণ লাইব্রেরিটি মেরামত করে আধুনিক সুযোগ সুবিধা দিতে পারলে হয়তো পাঠক সংখ্যা বাড়বে। এলাকার মানুষেরও উপকার হবে।

Bellow Post-Green View