চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

পিপলস লিজিং বন্ধ হলে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে কী প্রভাব পড়বে?

ঋণ বিতরণে অব্যবস্থাপনাসহ নানা কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিংয়ের কার্যক্রম বন্ধ করার যে উদ্যোগ গ্রহণ করছে, তা বাস্তবায়ন হলে এ খাতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

তারা বলছেন, পিপলস লিজিং বন্ধ হলে শুধু এ খাত নয়, যেহেতু আর্থিক খাত পরিচালনা করা হয় ব্যাংকিং পদ্ধতিতে তাই পুরো ব্যাংকিং খাতে এর প্রভাব পড়বে। এছাড়া পুঁজিবাজারেও এর ধাক্কা লাগবে।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, পিপলস লিজিংয়ে ঋণ বিতরণে অব্যবস্থাপনা, সম্পত্তির ঝুঁকি ও তারল্য সংকটে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আমানতকারীর অর্থ ফেরত দিতে পরছে না। সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে চিঠি দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। এর পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়ে অনুমোদন দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ও। শিগগিরই প্রতিষ্ঠানটির অবসায়ন চেয়ে উচ্চ আদালতে আবেদন করবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

এ বিষয়ে বুধবার সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, যেহেতু পিপলস লিজিংয়ের গ্রাহকের আমানতের চেয়ে সম্পদের পরিমাণ বেশি, তাই আমানতকারীদের ভয়ের কিছু নেই। তারা আমানত ফিরে পাবেন। কারণ, প্রতিষ্ঠানটির আমানতের পরিমাণ ২ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। বিপরীতে সম্পদ আছে ৩ হাজার ২৩৯ কোটি টাকার।

তবে আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, আমানতকারীদের আমানত ফিরে পেতে অনেক সময় লাগবে। কিন্তু এর নেতিবাচক প্রভাব পুরো ব্যাংক ও আর্থিক খাতে পড়বে। লিজিং কোম্পানিগুলোর আমানতের পরিমাণ কমে যাবে। এতে পুরো খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: অনেক দিন ধরেই পিপলস লিজিংয়ের অবস্থা খারাপ। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি সময়মত সেখানে পদক্ষেপ নিতো তাহলে হয়তো এখন বন্ধ করা লাগতো না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই ভূমিকা নেয়নি। এখন এটা বন্ধ করে দেয়া ছাড়া উপায় নাই। বন্ধ হলে তাদের সম্পদ বিক্রি করে আমানতকারীদের আমানত ফেরত দিতে হবে।

তিনি বলেন, পিপলস লিজিং আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠান। তাই এ খাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। আমানতকারীদের আস্থা কমে যাবে। যেহেতু এটাও ব্যাংকিং সিস্টেমের মতো, তাই পুরো ব্যাংকিং খাতে এর প্রভাব পড়বে। তবে এটাও হতে পারে যে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আমানতকারীরা আমানত তুলে তা ব্যাংকে রাখতে পারে।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবু আহমেদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আমানতকারীদের আস্থা কমে যাবে। ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত (লং টার্ম বোরোয়িং) কমে যাবে। আমানত পেতে অতিরিক্ত সুদ হার অফার করতে হবে। ব্যবসার খরচ বাড়বে। ফলে ক্ষতির সম্মুখিন হবে আর্থিক খাত।

অধ্যাপক আবু আহমেদ

তিনি বলেন, ১৯৯৭ সালে কার্যক্রম শুরু করা এমন একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে পুঁজিবাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ইতোমধ্যে পড়ছেও। মোটকথা আর্থিক খাতের জন্য অশনি সংকেত। বিনিয়োগকারীরা মনে করবে অন্যান্য লিজিং কোম্পানিগুলোরও কোনো ব্যবসা নেই। আস্থার জায়গায় চিড় ধরেছে। কারণ এ ধরনের প্রতিষ্ঠান চলে বিশ্বাসের উপর।

বিজ্ঞাপন

আবু আহমেদ বলেন, পিপলস লিজিংয়ে বিনিয়োগকারীরা তাদের পুঁজি হারাবে। কারণ এটার বিদ্যমান যে সম্পদ রয়েছে তা বিক্রি করে আগে আমানতকারী ও অন্যান্য খরচ মেটানোর পর যদি কিছু থাকে তা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের দেয়া হবে। তবে এটা আদৌ সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

জানা গেছে, পিপলস লিজিংয়ে ঋণ বিতরণে অব্যবস্থাপনা, সম্পত্তির ঝুঁকি ও তারল্য সংকটে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আমানতকারীর অর্থ ফেরত দিতে পরছে না। সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে চিঠি দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই চিঠিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইনের ২২ (৩) এবং ২৯ ধারায় প্রতিষ্ঠানটি অবসায়নের উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়। সম্মতি দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় গত ২৬ জুন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চিঠি দেয়। চিঠি পাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এজন্য প্রতিষ্ঠানটিতে আটকে থাকা আমানতের পরিমাণ, অনিয়মের ধরণ, প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ও মাসিক বেতন-ভাতার পরিমাণ উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে।

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক তথ্য অনুযায়ী, পিপলস লিজিংয়ে আমানত রয়েছে ২ হাজার ৮৬ কোটি টাকা। তবে দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার মতো নগদ অর্থ সংকটে রয়েছে। ফলে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না।

১৯৯৭ সালে কার্যক্রম শুরু করা এ প্রতিষ্ঠানের ১ হাজার ১৩১ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি ৭৪৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৬৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। ধারাবাহিক লোকসানের কারণে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এ প্রতিষ্ঠানটি ২০১৪ সালের পর থেকে কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি।

তাদের মোট শেয়ারের ৬৭ দশমিক ৮৪ শতাংশই রয়েছে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের হাতে। বাকি শেয়ারের মধ্যে স্পন্সর ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে ২৩ দশমিক ২১ শতাংশ। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং শূন্য দশমিক ১৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে।ব্যাংক খাতে অনিয়ম

আইনে কী বলা আছে?
আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইনের ২২ (৩) ধারা অনুযায়ী, আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষায় যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসায়নের জন্য উচ্চ আদালতে আবেদন করতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই আইনের ২৯ ধারায় বলা হয়েছে, কোম্পানি আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ ব্যাংকের আবেদনের ভিত্তিতে কোনো আর্থিকপ্রতিষ্ঠান অবসায়নের জন্য আদেশ দিতে পারবে।

একই আইনের ৮ ধারায় যেকোনো আর্থিকপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংককে দেয়া হয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন কারণে যে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করতে পারবে।

এসব কারণের মধ্যে রয়েছে আমাতকারীদের স্বার্থহানি হয় এমনভাবে ব্যবসা করা, দায় পরিশোধে অপর্যাপ্ত সম্পদ, অবসায়ন বা কার্যক্রম বন্ধ, লাইসেন্স পাওয়ার জন্য মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য সরবরাহ ইত্যাদি।

অর্থ ফেরতের বিষয়ে আইনে কী বলা আছে?
সংশ্নিষ্টরা জানান, অবসায়ন হওয়া প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীর অর্থ কোন উপায়ে ফেরত দেয়া হবে, সে বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইনে কিছু বলা নেই। এক্ষেত্রে আদালত যে উপায়ে অর্থ পরিশোধ করতে বলবেন, তা কার্যকর হবে। তবে সাধারণভাবে সম্পদ বিক্রি এবং সরকারের সহায়তার আলোকে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেয়া হয়।

এজন্য প্রথমে প্রতিষ্ঠানের দায় ও সম্পদ নিরূপণ করা হয়। এরপর একটি স্কিম ঘোষণা করা হয়। যেখানে নির্দিষ্ট মেয়াদ উল্লেখ করে কোন পরিমাণ আমানত কবে নাগাদ পরিশোধ করা হবে তার উল্লেখ থাকে।

Bellow Post-Green View