চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

পিতা হারানোর শোকই হোক আমাদের শক্তি

মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র বলেছিলেন, “A genuine leader is not a searcher for consensus but a molder of consensus.” কথাটি ধ্রুব সত্য। কারণ সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ হিসেবেই পৃথিবীতে আগমন ঘটে একজন মহান নেতার। নেতৃত্বের গুণাবলী কিন্তু সবার থাকেনা এবং তা সৃষ্টিকর্তা সবাইকে দেননা । কিছু বিশেষ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ থাকে যাদের এক নজর দেখলেই মনে হয় এরা একরাশ আলো নিয়ে চলেন, যা পথভোলা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিতে সক্ষম । পৃথিবীতে এমন বহু মহামানব এসেছেন যারা নেতৃত্ব দিয়ে ,অনুপ্রেরণা দিয়ে অনেক রাষ্ট্রকেই মুক্ত করেছেন পরাধীনতার বেড়াজাল থেকে। জন্ম দিয়েছেন এক একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের। এমনি একজন নেতা আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ছিলেন নেতাদের নেতা। ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিটি শুধুমাত্র এই মহামানবই পেয়েছেন তার কারণ, তিনি বাঙ্গালী জাতির দুঃখ কষ্ট গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি বাংলার বন্ধু। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কবল থেকে অনেক নেতাই বাঙালি জাতিকে মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু সবাই তা করতে সক্ষম হননি। একমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু স্বাধীন বাংলার স্বপ্নই দেখেননি তার সাথে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে যে ভূমিকা পালন করেছেন তা চিরস্মরণীয়। তাঁর বজ্রকন্ঠেই শোভা পায় ‘কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না।’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথা যখনই বলা হয়, তার সাথে বঙ্গবন্ধুর নাম ওতোপ্রতভাবে জড়িত । আর এজন্যই তিনি জাতির পিতা। কারণ এই জাতির জন্মই হয়েছে তার হাতে ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী দেখলেই বুঝতে পারা যায় যে, তিনি জীবনের শুরু থেকেই রাজনীতির ব্যাপারে উৎসুক ছিলেন। তিনি সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন অধিকার বঞ্চিত, শোষিত, নিপীড়িত মানুষের মুক্তির জন্য। তার এই নেতৃত্ববোধের উদ্ভব হয় বাঙালি জাতির দুঃখ- কষ্ট উপলব্ধি করার মাধ্যমে । তিনি সব কিছুই উপলব্ধি করতেন গভীরভাবে। এ জাতির প্রতি তার টান যেন অবিচ্ছিন্ন। বঙ্গবন্ধু একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। অনেক অল্প বয়স থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন এবং তাকে এর জন্য জীবনের দীর্ঘসময় কারাবাসও বরণ করতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধু বেড়ে উঠেছেন উপমহাদেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝে। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষেরও সাক্ষী তিনি। এসব কিছুই তার মাঝে এক প্রতিবাদী মানুষের জন্ম দেয়। শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ তার সম্পর্কে লিখেছিলেন, “শেখ মুজিব দৈহিকভাবেই মহাকায় ছিলেন, সাধারণ বাঙালির থেকে অনেক উচুঁতে ছিলো তার মাথাটি, সহজেই চোখে পড়তো তার উচ্চতা। একাত্তরে বাংলাদেশকে তিনিই আলোড়িত-বিস্ফোরিত করে চলেছিলেন, আর তার পাশে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে যাচ্ছিল তার সমকালীন এবং প্রাক্তন সকল বঙ্গীয় রাজনীতিবিদ।” নেতাজি সুভাষ চন্দ্র ঘোষ এবং বাংলার বাঘ খ্যাত এ কে ফজলুল হক তার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছেন। এভাবেই রাজনৈতিক অঙ্গনে তার পথচলা শুরু হয় । কলকাতায় অধ্যায়নরত অবস্থায় বঙ্গবন্ধু মুসলিম লীগের সঙ্গে যুক্ত হন। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনামল থেকে মুক্ত হয়েও এমনকি ১৯৪৭ এ পাকিস্তান স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠলেও বাঙালি জাতির অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। শুধু শাসক পরিবর্তন হয়েছে মাত্র।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তান দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে, পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তান। এটা সবারই জানা যে বর্তমান বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তানের অংশে ছিল। সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা, শিল্প, সংস্কৃতি থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই বাঙালিরা শোষণের শিকার হচ্ছিল। ১৯৪৮ সালে যখন মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ এবং লিয়াকাত আলী খান এই ঘোষণা করেন যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা মূলত তখন থেকেই বঙ্গবন্ধুর মনে স্বাধীন বাংলার জন্য আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। এই আন্দোলনেই স্বাধীন বাংলার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হয়। আন্দোলনে অংশ নেয়ায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয় ১১ মার্চ ১৯৪৮ সালে। তাও তিনি থেমে থাকেননি। কারাবাস থাকাকালীন অবস্থাতেও তিনি আন্দোলনে শরীক হয়েছেন। অবশেষে ১৯৫২ র ২১ শে ফেব্রুয়ারী রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলা তার রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা পায় এটা সবারই জানা। বঙ্গবন্ধু এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার কারাবাসকালীন সময়ে আন্দোলনে অংশ গ্রহণের কারণে তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব চলে যায়। বঙ্গবন্ধু ধীরে ধীরে ছাত্রলীগ নেতা এবং আওয়ামীলীগের যুগ্ম সচিব হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তানের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্ত ফ্রন্ট জয় লাভ করলে যুক্তফ্রন্টের সর্বকনিষ্ঠ মন্ত্রী হিসেবে যোগ দান করেন। কিন্তু পরবর্তীতে এই মন্ত্রীসভা বাতিল ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাগারে প্রেরণ করা হয় । ১৯৫৬ সালে আবারও শেখ মুজিবুর রহমান গণপরিষদের কনিষ্ঠ মন্ত্রী হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু ১৯৫৭ সালে স্বেচ্ছায় মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করেন আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনের লক্ষ্যে। আবারও ১৯৫৮ সালে বঙ্গবন্ধু কে গ্রেপ্তার করে ১৪ মাসের কারাবাসে প্রেরণ করা হয় বিভিন্ন দোষে অভিযুক্ত করে। এরপর ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারীতে তাকে আবারও গ্রেপ্তার করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠীর জন্য হুমকি স্বরূপ হয়ে পরে, যার কারণেই এভাবে বারে বারে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে তার আন্দোলনের পথে বাঁধা উৎপন্ন করা হত। তবে কোন বাঁধাই শেখ মুজিবুর রাহমানকে আটকে রাখতে পারেনি।

১৯৬৩ সালে বঙ্গবন্ধু আওয়ামীলীগের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং এর পর থেকেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ তাদের আন্দোলন পরিচালনা করা শুরু করে। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু লাহোরের একটি রাজনৈতিক সভায় ছয় দফা দাবী উত্থাপন করেন। এই ছয় দফা দাবী মূলত কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র কাঠামোয় কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের অধিকারের দাবী করা হয়ে থাকে। ১৯৭০ এর ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত প্রায় সমস্ত আন্দোলনই এই ছয় দফার উপর নির্ভর করেই সংঘটিত হয়। ছয় দফা আন্দোলন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এবারে পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী ছয় দফা দাবী না মেনে বঙ্গবন্ধুকে ৮ মে গ্রেপ্তার করে । তার গ্রেপ্তারের পর বাংলার ছাত্র জনতা প্রবল আন্দোলনে ফেটে পড়ে ।

এরপরেই ১৭ জুন ১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্ট এ সরিয়ে নেয়া হয় এবং তার বিরুদ্ধে করা হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। বঙ্গবন্ধুকে মুখ্য আসামী করে ভারতের সাহায্যে বাংলার স্বাধীনতা অর্জনের চেষ্টা করছে এই দোষে অভিযুক্ত করা হয় । বাঙালি জনতা তাদের এই নেতার উপর এই আরোপের বিপক্ষে ১৯৬৯ সালে প্রবল গণআন্দোলন শুরু করে । এই আন্দোলনকে বলা হয় ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান। ফলশ্রুতিতে বঙ্গবন্ধু এবং তার সাথে আন্দোলনকারী সবাই মুক্তি লাভ করে এবং মামলা তুলে নেয়া হয়। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নয়া দিল্লিতে একটি গোল টেবিল বৈঠকের আমন্ত্রণ পান। তবে পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর এই বৈঠক ফলপ্রসূ হয়নি। ছয় দফা দাবী এবারেও মানা হয়নি ।

১৯৬৯ এর ২৫ শে মার্চ আইয়ুব খান তার ক্ষমতা জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে হস্তান্তর করে। জেনারেল ইয়াহিয়া খান গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দেন এবং সেই লক্ষ্যে ১৯৭০ এর ডিসেম্বেরে সাধারণ নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। সেই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ফলে সে অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পদ লাভ করার কথা তবে পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নির্বাচনের এই ফলাফল মেনে নিতে পারে নি। যার ফলশ্রুতিতে ৩রা মার্চ নবনির্বাচিত প্রার্থীদের নিয়ে একটি পূর্ব নির্ধারিত সমাবেশ বাতিল ঘোষণা করা হয়। যার ফলে আবারও বাংলার জনতা আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠী বাঙালি জাতিকে দাবিয়ে রাখতে ইতিহাসের ঘৃণ্যতম গণহত্যা সংগঠিত করে ১৯৭১ এর ২৫ শে মার্চ রাতে। বঙ্গবন্ধুকে ঐদিন মধ্যরাতেই গ্রেপ্তার করা হয়। তবে গ্রেপ্তারের আগে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। তারই নেতৃত্বে বাঙালি জনতা প্রায় ১০ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বের বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে সক্ষম হয়। এই পুরো সময়টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারাবাসে ছিলেন। কেউ জানতোনা তিনি তখনও জীবিত আছেন নাকি মৃত। তার অনুপস্থিতিতেও তার দেয়া নির্দেশ মেনেই বাঙালি জাতি তাদের সর্বস্ব দিয়ে হলেও যুদ্ধ করে গেছে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন এবং ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারী স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী রূপে যোগদান করেন। তারপরই তিনি স্বাধীন বাংলার সংবিধান প্রবর্তনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং সেই সংবিধান অনুযায়ী অনুষ্ঠিত ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামীলীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেন এবং পাঁচ বছর মেয়াদি সরকার ব্যবস্থার সূচনা করেন । এরপর ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনী অনুযায়ী সরকার ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধন করে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থার প্রচলন করেন। বঙ্গবন্ধু তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে মাত্র তিন বছরেই যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনীতিক পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন । এটা শুধু মাত্র শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষেই সম্ভব ছিল । বাংলাদেশের উন্ময়নের লক্ষ্যে তার সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা ছিল । ১৯৭৩ সালে আলজেরিয়াতে একটি নিরপেক্ষ সম্মেলনে যোগদান করে তিনি বলেছিলেন, “The world is divided into two halves, the oppressed and the oppressors. I am with the oppressed”.

তিনি ছিলেন বিচক্ষণ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন নেতা। গরীব খেটে-খাওয়া মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটাতে তিনি আপোসহীনভাবে লড়াই করে গেছেন। তিনি জানতেন বাংলাদেশকে “সোনার বাংলা” করতে হলে শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের বিকল্প নেই। তাঁর লেখা “আমার দেখা নয়াচীন” বইটিতে রাজনীতি, অর্থনীতি, বৈষম্য, সামাজিক নানা অনুষঙ্গ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, মানবিক যোগাযোগ, বিশ্ব বাস্তবতা, শান্তিবাদ এবং নয়া চীনের উন্নয়নের রহস্য উদঘাটন করার পাশাপাশি বাংলাদেশের অবস্থাও তুলনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, “ চীন সরকার উন্নতি করছে, মাথাভারী ব্যবস্থার ভিতর দিয়া নয়, সাধারণ কর্মীদের দিয়া।’…‘.‘শ্রমিকদের জন্য আলাদা হাসপাতাল আছে। অসুস্থতার সময় বেতনসহ ছুটি দেওয়া হয়। বৎসরে তারা একবার ছুটি পায়। যারা বাড়ি যেতে চায় তাদের বাড়িতে যেতে দেওয়া হয়, আর যারা স্বাস্থ্যনিবাসে যেতে চায় তাদেরও ব্যবস্থা করা হয়।’ বঙ্গবন্ধু আরও লিখেছেন, ‘আমাদের দেশে যখন পাট চাষির ঘরে থাকে, তখন দাম অল্প হয়। যখন মহাজনদের ঘরে থাকে তখন দাম বাড়তে থাকে। চাষি উৎপাদন খরচও পায় না।…কিন্তু নয়াচীন একটা সামঞ্জস্য বিধান করেছে, কৃষক যা বিক্রি করে তার দাম দিয়ে ভালোভাবে অল্প দামে তেল, নুন, কাপড় কিনতে পারে।’

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশকে “সোনার বাংলা” রূপে গড়ে তোলাই তার স্বপ্ন ছিল । কিন্তু সেই স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায় ১৯৭৫ এর ১৫  আগস্ট । তারই দেশের কিছু স্বার্থান্বেষী হত্যাকারীর হাতে প্রায় সপরিবারে নিহত হন তিনি । বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ রেহানা এবং বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে যান। এমন মহান বিশ্বনেতার বিদায় হবার কথা ছিল কতইনা আড়ম্বরপূর্ণভাবে। কিন্তু যে দেশের মুক্তির জন্য, যে দেশের মানুষের জন্য তাকে না জানি কতবার জীবন বাজি রাখতে হয়েছে, সেই দেশেরই একদল নরপিশাচ এতটা নির্মমভাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে পারে তা ভাবা যায়না। এ ক্ষতি পুরো জাতির জন্য** **অপূরণীয় ক্ষতি । সেদিন শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল পুরো জাতি। সেদিনের কথা মনে হলেই আমার মনে পড়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন এর মৃত্যুতে লেখা Walt Whitman এর শোককবিতা “O Captain! My Captain!”** **এর এই পঙক্তিমালা-

O Captain! my Captain! our fearful trip is done,

The ship has weather’d every rack, the prize we sought is won,

The port is near, the bells I hear, the people all exulting,

While follow eyes the steady keel, the vessel grim and daring;

But O heart! heart! heart!

O the bleeding drops of red,

Where on the deck my Captain lies,

Fallen cold and dead.

বঙ্গবন্ধু শুধু স্বপ্নই দেখেননি তার সাথে স্বাধীন বাংলা গড়ে দিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন । তার প্রখর ব্যক্তিত্ব, কথা বলার ভঙ্গী, বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, তার অদম্য ইচ্ছা শক্তি আর দূরদৃষ্টি ছাড়াও সবচেয়ে বড় যে গুণ ছিল তা হল নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা । তিনি স্বাধীনতার চেতনা সাত কোটির মানুষের অন্তরে জাগ্রত করতে পেরেছিলেন । তার সব চেয়ে বড় প্রমান ৭ মার্চের রেসকোর্সে ময়দানের ভাষণ। সেই ভাষণের এমন শক্তি ছিল যে মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে যুদ্ধ করেছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে। যুদ্ধকালীন সময়ে তাঁর কণ্ঠই যেন বাংলার জনগণের প্রেরণা এবং শক্তির উৎস ছিল। যে মানুষের, যে নেতা এত সক্ষম তাকে নেতা হিসেবে পাওয়া আমাদের জন্য ছিল পরম সৌভাগ্য। তবে আমাদের ভাগ্য বেশিদিন সুপ্রসন্ন হয়নি। তিনি চলে গেছেন আমাদের ছেঁড়ে, রেখে গেছেন তাঁর আদর্শ এবং ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্ন। তিনি দেশ গড়ে গেছেন তবে সেই দেশকে সুখী, সমৃদ্ধশালী এবং উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা এখন আমাদের দায়িত্ব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ও তাঁর আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের পরিকল্পনায় সেই পথেই হাঁটছি আমরা। অদম্য বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও উদ্ভাবনই হবে আমাদের এগিয়ে চলার সোপান। বঙ্গবন্ধুকে তো আমরা হারিয়েছি সেই শোক কখনই ভোলার নয়। এই শোককেই শক্তিতে রুপান্তর করে আমাদের দেশকে আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর, উন্নত ও মানবিক “সোনার বাংলা” হিসেবে গড়তে হবে। আর তা হলেই আমাদের জাতির পিতার আত্মত্যাগ সফল হবে । আমাদের শোকই হোক আমাদের শক্তি, আমাদের প্রেরণা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)