চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

পিটিয়ে মারার ব্যস্ত শ্মশানে…

‘একখানা ইট যদি পাওয়া যেতো,
নোংরা মুখটা করতাম থেঁতো,
ভাবতে ভাবতে গেলো একজন,
ক্ষত-বিক্ষত ছেলেটার কাছে,
যেন দুজনের শত্রুতা আছে…।’

প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী কবীর সুমনের ‘কাঁদতে দে’ শিরোনামের এই গানটি হয়তো আপনিও শুনেছেন। একটি ছেলেকে পিটিয়ে মারার যে ভয়াবহ বর্ণনা, তা মিলে যাচ্ছে দেশের নানা প্রান্তে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে মারার সাথে।

বিজ্ঞাপন

রোববার বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ, কেবল শনিবারই (২০ জুলাই) দেশের বিভিন্ন স্থানে এরকম ছেলেধরা সন্দেহে অন্তত পাঁচজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, যাদের মধ্যে দুজন নারী। এছাড়া গণধোলাই দিয়ে পুলিশে দেয়া এবং আহত করার সংখ্যা ১০ জনের বেশি। পরদিন রোববারও দেশের বিভিন্ন স্থানে এরকম গণপিটুনির শিকার ১০ জনের বেশি লোককে উদ্ধার করেছে পুলিশ।

দুঃখজনক এবং দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, রাজধানীতে যে নারীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, তিনি স্কুলে গিয়েছিলেন তার সন্তানের ভর্তির বিষয়ে খোঁজ নিতে। অথচ কেউ একজন সন্দেহ করেছে তিনি ছেলেধরা। অতএব ‘সচেতন’ জনগণ সম্মিলিতভাবে ওই নারীর উপর আক্রমণ করে এবং পঞ্চাশজনক লোকও যদি একটি করেও ঘুষি দেয়, তাতেও তো তার বাঁচার কথা নয়।

এই ঘটনায় অজ্ঞাত প্রায় পাঁচশো জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। নিশ্চয়ই ঘটনাস্থলে সিসি ক্যামেরা ছিল এবং ফুটেজ দেখে পুলিশ হয়তো অনেককে গ্রেপ্তার করবে। এই সুযোগে অনেক নিরপরাধ লোকও গ্রেপ্তার হবে। গ্রেপ্তার ও পুলিশি হয়ানি এড়াতে অনেকেই গা ঢাকা দেবেন। অনেকের পরিবারে নেমে আসবে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। সেটি এই ঘটনার আরেকটি ডাইমেনশন। অর্থাৎ ছেলেধরা সন্দেহে যেমন এমন নিরীহ ও নিরপরাধ নারী খুন হয়েছেন, তেমনি এই ঘটনার বিচার ইস্যুতেও হয়তো অনেক নিরপরাধ লোকই ফেঁসে যাবেন।

উল্লেখ্য, যেদিন এভাবে পিটিয়ে কয়েকজনকে হতাহত করা হলো, সেদিনই পুলিশ সদরদপ্তর থেকে একটি বিবৃতি দেয়া হয়েছে যেখানে পিটিয়ে মারাকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এভাবে আইন নিজের হাতে তুলে না নিতে জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন হলো কেন এমনটি হয়? মানুষ কেন আইন নিজের হাতে তুলে নেয়? সে আসলে কার বিরুদ্ধে কীসের প্রতিশোধ নেয়? আইনের শাসনের অভাব কিংবা প্রচলিত বিচারব্যবস্থার প্রতি তার আস্থা নেই নাকি সে অন্য কারণে ক্ষুব্ধ যা অন্য কোনো ঘটনার দ্বারা সেই ক্ষোভ প্রশমিত করতে চায়? এটা কি এক ধরনের ক্যাথারসিস? এইসব প্রশ্নেরও জবাব খুঁজতে হবে।

আমি নিজেও সপ্তাহে অন্তত দু’দিন কেজিতে পড়ুয়া মেয়েকে স্কুলে দিয়ে আসি। অনেক সময়ই সে চিপস ও চকলেটের জন্য এমন বায়না ধরে যে, না দিলে রাস্তায় বসেই চিৎকার করে। তখন তাকে অনেকটা জোর করেই রিকশায় তুলি। এখন কোনো একজন ‘সচেতন’ লোক যদি আমার মেয়ের চিৎকার শুনে আমাকে ছেলেধরা সন্দেহে মার শুরু করে, পরিচয় দেয়ার আগেই দেখা যাবে আরও জনাবিশেষ লোক এসে আমাকে মারতে শুরু করবে এবং সেই জনরোষ থামবে হয়তো আমার মৃত্যুর পরে। এরকম একটা দৃশ্য আরও অনেকেই কল্পনা করতে পারেন; বিশেষ করে যারা এরকম ছোট সন্তানকে নিয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করেন। বিভিন্ন স্থানে জনতার রুদ্ররূপ দেখে আমার স্ত্রীকেও তাই বলেছি, মেয়েকে স্কুলে আনা-নেয়ার পথে যেন তিনি আরও বেশি সতর্ক থাকেন। কারণ কখন কোন সচেতন জনতা হামলা শুরু করে, তা বলা মুশকিল। কারণ এখন পরিস্থিতি কবীর সুমনের ওই গানের মতোই: যেন দুজনের শত্রুতা আছে। অর্থাৎ সবাই এখন সবার শত্রু। কে কাকে মারছে, কেন মারছে তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই।

তাহলে এই বিভীষিকাময় পরিস্থিতি থেকে বাঁচার উপায় কী? উপায় একটাই, তা হলো সারাদেশে এখন মাইকিং করে মানুষকে বলতে হবে যে, কাউকে যদি সত্যিই ছেলেধরা বা এরকম অপরাধী বলে মনে হয় তাহলে সাথে সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে খবর দিতে হবে। প্রয়োজনে তাকে আটক করে নিকটস্থ থানায় দিতে হবে। কিন্তু কোনোভাবেই মারধর শুরু করা যাবে না। কারণ কেউ একজন একটা ঘুষি দিলেই সেখানে মুহুর্মূহু ঘুষি দেয়া লোকের অভাব হয় না।

রাজধানীর বাড্ডায় রেনু নামে যে নারীকে পিটিয়ে মারা হয়েছে ওই ভিডিও যারা দেখেছেন তারা বুঝবেন এর বিভৎসতা, ভয়াবহতা। মানুষ এতই হিংস্র যে, কেউ কেউ তখন বলছিলো, ভালো করে মরে নাই। অবস্থা কতটা সঙ্গীন হলে একদল লোক মিলে একজন নারীকে, সন্তানের ভর্তির খবর নিতে আসা একজন মাকে এভাবে নির্মমভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলতে পারে। মানুষ আসলে কাকে মারছে? সে কোন ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে?

এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে এখন সব এলাকার জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় হতে হবে। প্রয়োজনে রাস্তায় নেমে তাদের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার নানারকম কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। না হলে উত্তেজিত জনতার হাত থেকে মানুষকে বাঁচানো যাবে না।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View