চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

পাপিয়া ইস্যুতে ‘উড়ো খবর’ সরবরাহ করলো কে?

দেশে প্রতিনিয়ত আলোচিত অনেক ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় কোনো নারী সংশ্লিষ্ট থাকলে তাদের জড়িয়ে রসালো অনেক খবর আসে। পাপিয়া ইস্যুতেও পরস্পর বিরোধী একাধিক তালিকা এসেছে। পাপিয়ার ডেরায় কারা গিয়েছেন, সেই সংক্রান্ত। সেটা অনেকের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। তবুও এতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সম্মানহানি হচ্ছে বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়৷

‘সম্মানহানি’র এ দায় কি পাপিয়ার, নাকি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নাকি পাপিয়া যে দল করতো সেই দলের৷ এই সতর্কবাণী কাদের উদ্দেশে? পাপিয়ার এসব তথ্য গণমাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ায় এলো কোথা থেকে? পাপিয়া তো আইনি হেফাজতে। তাহলে এই অসত্য তথ্য কারা সরবরাহ করল? আর এমনটি কেউ করে থাকলে তা কি দণ্ডনীয় অপরাধ নয়?

২২ ফেব্রুয়ারি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শামীমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ, স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে মতি সুমনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাম ও উৎস উল্লেখ করে  প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক, অনলাইন মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিবেশিত  বিভিন্ন সংবাদে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কথা বলা হচ্ছে।

এটা ঠিক যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে আটকদের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নাম জড়িয়ে অযথা সম্মানহানিকর, বিভ্রান্তিকর ও অসত্য সংবাদ প্রচার করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ এমন তথ্য সরবরাহ করলে সেটা কি অপরাধ নয়? এ বিষয়ে কি তদন্ত হচ্ছে? তদন্ত ছাড়াই তাহলে এমন সতর্কতা কাদের উদ্দেশে?

সম্প্রতি সাগর-রুনি হত্যা মামলার অগ্রগতি প্রতিবেদন হাইকোর্টে উপস্থাপনের পর আদালত গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলেছেন। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যায়, ‌‘আদালত এ সময় রাষ্ট্রপক্ষকে বলেন: এ রিপোর্ট মিডিয়ায় কীভাবে গেল? হয় অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়, বা তদন্ত সংস্থার কাছ থেকে এ রিপোর্ট ছুটেছে। কোর্টে উপস্থাপনের আগেই এভাবে মিডিয়ায় রিপোর্ট প্রকাশ পেলে জনমনে এক ধরনের পারসেপশন (ধারণা) তৈরি হয়।’

জবাবে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার বলেন: ‘আমিও সাংবাদিক ছিলাম, আমি কাউকে কোনও রিপোর্ট দেইনি। যে কারণে আমার সাংবাদিক বন্ধুরা আমাকে দেখতে পারেন না।’

তখন আদালত বলেন: ‘সাংবাদিকদের কাজই হলো খবরের পেছনে ছোটা। তারা খবর সংগ্রহ করতে ছুটবেই। আমরা তো সাংবাদিকদের কোন দোষ খুঁজে পাচ্ছি না।’

বিজ্ঞাপন

এ সময় অমিত তালুকদার বলেন: ‘এভাবে রিপোর্ট প্রকাশ আদালত অবমাননার শামিল।’

জবাবে আদালত বলেন: ‘সাংবাদিকরা রিপোর্ট পেলেই ছাপাবে, এটাই স্বাভাবিক। যদি ওই রিপোর্টের সঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদনের মিল না থাকে, তখন তাদের (সাংবাদিকদের) দোষারোপ বা ধরার সুযোগ থাকে। রিপোর্ট আদালতে দাখিলের আগেই যে সাংবাদিকদের হাতে গেছে, এজন্য দোষ তো কাউকে না কাউকে স্বীকার করতেই হবে।’

আদালতের এই মন্তব্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকরা খবরের পেছনে ছুটবেন সেটা স্বাভাবিক। তবে খবর পেলেই যাচাই-বাছাই না করেই প্রকাশ করে দেয়াও সাংবাদিকদের কাজ না। পাপিয়া কাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নামের এই তালিকা যদিও স্বনামধন্য বা মূলধারার কোনো মিডিয়ায় আসেনি। এসেছে অখ্যাত কিছু অনলাইন আর সোশ্যাল মিডিয়ায়। এরপরও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে কথা বলতে হয়েছে। এ বিষয়ে নির্দেশনা দেয়ার আগে কে এই তথ্য উড়ো খবর দিয়েছে সেটা বের করা জরুরি।

এছাড়াও দেশে অনেক ঘটনাই ঘটছে৷ এর মধ্যে সবার অজান্তে টেন্ডার মাফিয়া জিকে শামীমের জামিন পাওয়ার মতো ঘটনাও রয়েছে। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের মধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া আলোচিত ঠিকাদার ও যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা জি কে শামীম অস্ত্র ও মাদক মামলায়  হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে যায়, কিন্তু সেই জামিনের খবর জানে না রাষ্ট্রপক্ষ৷ এটাও কি বিশ্বাসযোগ্য? আর সত্য হলে তো এমন নজির খুবই মারাত্মক।

আগামী দুই মাসের মধ্যে যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত  হতে যাচ্ছে। এতে তাদের নেতৃত্ব হারানোরই সম্ভাবনা। অন্যান্য সংগঠনের নজির তাই বলে। গ্রেপ্তার হওয়ার পর পাপিয়াকে সংগঠন থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু এতদিন পাপিয়া কিভাবে নেতৃত্ব চালিয়ে যেতে পারল?

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায় নাকি ছাত্রলীগ-যুবলীগকে শুদ্ধি অভিযানের আওতায় আনার পর এবার আনছেন যুব মহিলা লীগে। শামীমা নূর পাপিয়ার অনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে আসার পর অবাক আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুব মহিলা লীগে শুদ্ধি অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, অনেকের বিরুদ্ধেই বিভিন্ন অভিযোগ পেয়েছি। কারা কী করছেন সবার আমলনামা আমার কাছে রয়েছে। এ ব্যাপারে অনেক প্রতিবেদন আসছে। অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

প্রধানমন্ত্রীর এমন হুঁশিয়ারির পরও যুব মহিলা লীগের নেতৃত্বের কেন টনক নড়লো না? আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুব মহিলা লীগসহ সবকিছু যদি প্রধানমন্ত্রীকেই দেখতে হয় তাহলে এসব নেতৃত্বের কাজ কী?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।

বিজ্ঞাপন