চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু চলছেই- কবে থামবে প্রতিরোধযোগ্য এ মৃত্যু

পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর খবর প্রায় প্রতিদিনই জাতীয় দৈনিকের পাতায় জায়গা করে নিচ্ছে। ব্যতিক্রম হলো না আজও। দৈনিক প্রথম আলো থেকে জানা যায়, ১৩ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরের ভাংগা উপজেলার হামিরদী গ্রামের সামিউল নামে চার বছরের এক শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে।

সামিউল গ্রামের ওহিদুল মাতুব্বরের ছেলে। ঘটনার দিন তাদের বাড়িতে বিয়ের আয়োজন চলছিলো। যদিও পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর এ খবরগুলো ভিতরের পাতায় ছাপা হয় ছোটো বক্স নিউজ আকারে, তবে এতটা ছোটো নয় যে সহসাই পাঠকের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। যেমন চোখে পড়েছিলো ৪ সেপ্টেম্বরের একদিনে ৮ শিশুর পানিতে ডুবে মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর বাংলাদেশ প্রতিদিন ৯ পাতায়। এরকম একটি দুটি নয়, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৩০টি শিশু পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক সংস্থা ব্লুমবার্গ ফিলানফ্রোপিক এর সহযোগিতায় পরিচালিত ২০১৯ এর এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, বছরব্যাপি হিসাব আমলে নিলে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় দশ হাজার। জনসংখ্যা বিবেচনায় যা বিশ্বে সর্ব্বোচ্চ। এ দেশে নিউমোনিয়ার পরে পানিতে ডুবেই সবচেয়ে বেশী শিশু মৃত্যু হয়ে থাকে। কিন্তু যদি শুধুমাত্র এক থেকে চার বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর কথা ধরা হয়, সেক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বাংলাদেশে পানিতে ডুবেই সবচেয়ে বেশী শিশু মারা যায় এবং মৃত্যুর এই হার পৃথিবীতে সর্বোচ্চ। মোট শিশু মৃত্যুর ৪৩ শতাংশই ঘটে থাকে পনিতে ডুবে।

বিজ্ঞাপন

যদিও বছর জুড়েই পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা জটেই চলে তবে বর্ষা মৌসুমে ও বড় উৎসব, পার্বণ পারিবারিক আয়োজনে কিংবা জাতীয় ছুটিকালীন সময়ে দুর্ঘটনার সং খ্যা বেড়ে যায়। যেমনটা উল্লেখ করেছেন বিশিষ্ট গবেষক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গহর নঈম ওয়ারা। গত ঈদে ছুটির ১০ দিনের (২৯ জুলাই- ৯ আগস্ট) গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে বিশ্লেষণ করে তিনি বলেছেন, এসময়ে মোট ৬৮টি শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে, যাদের মধ্যে ৩৮জনই ৫ বছেরর কম বয়সি শিশু। ডিজাস্টার ফোরাম ২৭ জুন ২০ থেকে ২৯ জুলাই ২০২০ পর্যন্ত সময়ে ৪৬ জনের পানিতে ডুবে মৃত্যুর তথ্য উল্ল্যেখ করেছে। এই ৪৬ জনের মধ্যে ৩৬ জনই শিশু এবং আবার তাদের মধ্যে ১ থেকে ৪ বছর বয়সি শিশু ১৪ জন আর ৫-১০ বছর বয়সি শিশু ১১ জন। কষ্ট তখনই বেড়ে যায় যখন জানা, যখন জানা যায়, পানিতে ডুবে শিশুদের এই মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য।

শিশুদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও শিশুদের সুরক্ষা সরকারের সহায়ক নীতিমালা, আইন ও বিধি বিধান রয়েছে। শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা, শিশু নিপীড়ন ও শিশু মৃত্যুরোধে দেশে সরকারি, বেসরকারি ও এনজিওদের উদ্যোগে উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে। পরিকল্পিত সেসব উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যাপক বিনিয়োগের প্রত্যক্ষ ফলাফল হিসাবে শিশু উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ ভালো। আমরা শিশু মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পেরেছি। গর্ভবতী ও শিশু স্বাস্থ্য সেবা বাড়ির দোরগড়ায় নিয়ে যাওয়ায় ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা বিস্তৃত করার ফলে প্রসবকালীন মা ও শিশু মৃত্যু কমানো গেছে। গুটিবসন্ত, হাম, পোলিও বিদায় করা গেছে টিকাদান কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে। সরকার প্রসংসিত হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী পুরস্কার গ্রহণ করেছেন। কিন্তু আমাদের প্রিয় শিশুরা প্রতিদিন পানিতে ডুবে মরছে। কেউ মরছে নির্যাতনের স্বীকার হয়ে, কেউ মরছে ধর্ষিত হয়ে, কেউবা রাস্তায় গাড়ী চাপা পড়ে। শিশুদের জীবন কী এতটাই সস্থা। পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর এ দায় কার?

বিজ্ঞাপন

কেন ও কোন শিশুরা পানিতে ডুবছে?

পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে বাংলাদেশে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে খুব বেশী কাজ হয়নি। প্রতিষ্ঠিত এনজিওরা অজানা কারণে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু নিয়ে কাজ করতে তেমন একটা আগ্রহী নয় বলেই মনে হচ্ছে। কেননা প্রতিষ্ঠিত কোনো এনজিও’র এ সম্পর্কিত কোনো কার্যক্রম কোথাও দৃশ্যমান নয়। তবে আশার কথা হলো, অন্যসব আরো অনেক অবহেলিত, উপেক্ষিত বিষয়ের মতো পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধেও এগিয়ে এসেছে কেউ কেউ- অবশ্য তাদের তেমন কোনো পরিচিতি নেই এনজিও খাতে। তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান সিআরপিআরবি, যাদের পরিচিতিতে হয়তো তেমন জোরালো নয় তবে এমন তারা এমন কাজ করছে যা অন্য হাইপ্রোফাইলরা এনজিওরা করছেন না । তারা আন্তর্জাতিক সংস্থা ব্লুমবার্গ ফিলানফ্রোপিক ও রয়েল লাইফবোট-ইউকে এর সহযোগিতায় দীর্ঘদিন ধরে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে কার্যকরী স্থানীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবণে কাজ করে আসছেন ২০০৫ থেকে।

সিআরপিআরবি’ তার অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক মতামতের ভিত্তিতে বলেছে, দারিদ্র, অসচেতনতা ও প্রতিষ্ঠানিক উদ্যোগহীনতার কারণেই পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেই চলেছে। বাংলাদেশে শিশুরা পানিতে ডুবছে তার বাড়ির ২০ গজের মধ্যে এবং মৃত্যুর এঘটনাগুলো ঘটছে মূলতঃ সকাল ০৯ থেকে বেলা ১টার মধ্যে- যেসময়ে মা-বাবা, বড় ভাইবোন ও কেয়ার গিভাররা অন্য বাস্তুগত কাজে ব্যস্ত থাকেন। এছাড়াও উদ্যেগের বিষয় হলো আমাদেরও বাড়ির পাশের ডোবা, নালা, পুকুর, খাল, বিল সব কিছু অরক্ষিত- কোনো প্রতিরক্ষা দেয়াল নেই এবং যার সহজ শিকার হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা । তার মানে, ৯টা থেকে বেলা ১টা সময়কালে বাস্তবতার আলোকে বলা যায় গ্রামাঞ্চলে বসবাসকরা আমাদের শিশুরা অরক্ষিত থাকেন।

তা হলে করণীয় কী?

পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৭ সালে। সেখানে কমিউনিটির সম্পৃক্ততার মাধ্যমে শিশুদেরও পানির উৎসে যাতায়াতে প্রতিবন্ধকতা তৈরিসহ নীতি পর্যালোচনার বিষয়কে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক সংস্থা ব্লুমবার্গ ফিলানফ্রোপিক ও রয়েল লাইফবোট-ইউকে এর সহযোগিতায় সিআরপিআরবি এর আচল ও ভাসা মডেলকে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে, এই মডেলের সাফল্য প্রমাণিত।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)