চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

পশ্চিমবঙ্গের ভোটে বিজেপির কতোখানি সম্ভাবনা?

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ভোট পর্ব চলছে। সাম্প্রতিক অতীতে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ভোটে ২০২১ সালের মতো ঘটনাবাহুল্য দেখা যায়নি।বস্তুত ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে কি লোকসভা, কি বিধানসভার যতোগুলি ভোট হয়েছে, তার কোনোটিতেই দেশের প্রধানমন্ত্রী এভাবে কার্যত দিল্লি থেকে পশ্চিমবঙ্গে নিত্যযাত্রী হননি।যেভাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবঙ্গের চলতি বিধানসভার ভোটে প্রচারের কাজে বার বার এই রাজ্যে আসছেন, বিশেষ করে যে দিন ভোটপর্ব চলছে, সেই দিনগুলিকেই বেছে নিচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গে প্রচারের উদ্দেশে, তাতে যে অঞ্চলগুলিতে ভোট চলছে, সেই অঞ্চলগুলিতে নির্বাচনবিধি ভঙ্গ করে ভোটারদের প্রভাবিত করা হচ্ছে কি না, সেই বিতর্ক ও দূরে সরিয়ে রেখে বলতে হয়, এভাবে একটি রাজ্যে নিজের দল কে জেতাতে দেশের প্রধানমন্ত্রীর সময় দেওয়া, প্রধানমন্ত্রী পদটির প্রতি কতোখানি মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্ন অচিরেই উঠবে।দেশের প্রধানমন্ত্রী সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের নেতাই হন।কিন্তু সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের নেতা প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসে যদি এক মুহূর্তের জন্যেও নিজের দলীয় অবস্থান ভুলতে না পারেন, তাহলে অচিরেই সেটি দেশের পক্ষে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক একটা পরিস্থিতি তৈরি যে করতে পারে, সেই আশঙ্কা কোনো অবস্থাতেই এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

প্রতিটি প্রচারে এসেই পশ্চিমবঙ্গের বুকে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি নিজের দলের জয়ের কার্যত আগাম বার্তা দিচ্ছেন।মোদিসহ বিজেপির একাংশের নেতাদের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়লাভ সম্পর্কে এই আগাম পূর্বাভাস আর তাদের নিত্যযাত্রা ঘিরে একটা প্রশ্ন কিন্তু সাধারণ মানুষের ভিতরে খুব তীব্র হয়ে উঠছে।প্রশ্নটি হলো এই যে, প্রধানমন্ত্রী মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সহ বিজেপির আজকের নেতারা যদি পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের দলের আসন্ন জয় সম্পর্কে এতোটাই আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে থাকেন, তাহলে কেন তারা এতো ঘন ঘন এখানে প্রচারে আসছেন? কেন জনগণের করের টাকা এভাবে কেবলমাত্র নিজেদের দলের প্রচারে ঘুরিয়ে ব্যবহার করছেন? প্রধানমন্ত্রী মোদি বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহের ঘন ঘন পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী সফরের ব্যয়ভার কিন্তু এদের নিরাপত্তার স্বার্থে ভারত সরকার ই বহন করেন।দলগত ভাবে বিজেপি বহন করে না।তাই প্রশ্ন, কেবলমাত্র বিজেপির দলীয় স্বার্থে ভারত সরকারের টাকা, যা বস্তুত ভারতীয় নাগরিকদের করের টাকা, কেন এমন বিপুল পরিমাণে ব্যবহার করা হচ্ছে? অতীতে জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, এমন কি বিজেপির অটলবিহারী বাজপেয়ী ও কি এইভাবে পশ্চিমবঙ্গের ভোট প্রচারে ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করেছেন? বিজেপি নেতা মোদি কি করছেন, তা ঘিরে আপামর পশ্চিমবঙ্গবাসী বা ভারতবাসীর সেভাবে মাথা ব্যথা নেই।কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি যখন দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ টিকে এইভাবে একদম দলীয় নেতার স্তরে নামিয়ে আনছেন, তখন তো সেটি জনগণের দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারে না।আর এই দলীয় নেতা আর দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদটিকে মিলিয়ে মিশিয়ে দেওয়ার উপক্রমটি তো কেবলমাত্র ভারত রাষ্ট্রের ভূগোলের সীমানাতেও আবদ্ধ হয়ে থাকতে পারে না।আন্তর্জাতিক দুনিয়া বেশ সতর্কভাবেই দেখছে যে, ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যে নিজের দলকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী কিভাবে প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদাকে একদম দলীয় স্তরের নেতার পর্যায়ে নামিয়ে আনছেন।নরেন্দ্র মোদির এই কার্যাবলী আন্তর্জাতিক দুনিয়াতে ভারতের আত্মমর্যাদাকে যেভাবে হাস্যকর করে তুলছে, তা দলমত নির্বিশেষে যে কোনো ভারতবাসীর কাছেই বিশেষ দুঃখজনক একটি বিষয়। দেশকে পিছনে ফেলে, এইভাবে দলকে সামনে তুলে আনতে ভারতে এর আগে আর কোনো প্রধানমন্ত্রী, এমন কি মোদির নিজের দল বিজেপির বাজপেয়ী ও এইভাবে আচরণ করেননি।মোদির ক্ষেত্রে অবশ্য দেখা গেছে, যেসব রাজ্যে বিধানসভা ভোটে তিনি বেশি তৎপরতার সঙ্গে প্রচার করেছেন, সেইসব রাজ্যেই তার দল বিজেপি ধরাশায়ী হয়েছে।উদাহরণ হিসেবে দিল্লি গণহত্যার অব্যবহিত পরেই অনুষ্ঠিত দিল্লি বিধানসভার ভোটের কথা বলা যেতে পারে।দিল্লির ভোটে মোদি এবং অমিত শাহ কার্যত দিনরাত এক করে দিয়ে প্রচার করেছিলেন।এতো কিছু করেও কিন্তু বিজেপি শেষ রক্ষা করতে পারেনি।জিতেছিলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল।বহু চেষ্টা করেও আম আদমি পার্টির নতুন বিধায়কদের কিনতে পারেনি বিজেপি।ফলে ভোটের ফল কে উল্টে দিয়ে মধ্যপ্রদেশে যেভাবে বিজেপি সরকার করেছিল, সেই স্বপ্ন তাদের দিল্লিতে সফল হয়নি।

বিজ্ঞাপন

পশ্চিমবঙ্গের চলতি বিধানসভার ভোট নিয়ে মোদি- শাহের বিজেপি অত্যন্ত উৎফুল্ল।তারা এই রাজ্যে ক্ষমতা দখলের বিষয়েও খুব আশাবাদী।কিন্তু মোদি- শাহের বিজেপির বাইরে একদম আর এস এস ঘরানার যে বিজেপি, সেই বিজেপি কি এই ভোটের সম্ভাব্য ফল ঘিরে খুব আশাবাদী? যদি তেমন সাফল্যের ধারণা ই একদম কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের থাকতো, তাহলে বহু কেন্দ্রে কেন বিজেপির গোঁজ প্রার্থী? ‘৭৭ সালে আর এস এসের রাজনৈতিক সংগঠন ভারতীয় জনসঙ্ঘ অবলুপ্ত হয়ে জনতা পার্টিতে মিশে গিয়েছিল।দ্বৈতসদস্য পদের বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ‘৭৯ সালে মোরারজি দেশাইয়ের সরকার ভেঙে যায়।জনতা পার্টিও ভেঙে যায়।তারপর পুরনো জনসঙ্ঘীদের দিয়ে আর এস এস তৈরি করে ভারতীয় জনতা পার্টি। এই দলটির বর্তমান কার্যপদ্ধতি কতোটা আর এস এস অনুমোদন করছে, সেই বিতর্কিত অধ্যায়ে না ঢুকে একটি বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার চলতি নির্বাচনে জনসঙ্ঘ, হিন্দু মহাসভা, হিন্দু সভা ইত্যাদি সংগঠের পক্ষ থেকে একটা বড় অংশের বিধানসভা কেন্দ্রগুলিতে লড়াই হচ্ছে।এই লড়াই হিন্দুত্ববাদের পুরনো ধ্যানধারণা নিয়ে চলা দলগুলি লড়ছে কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস, সংযুক্ত মোর্চার পাশাপাশি বিজেপির সঙ্গেও।এইসব পুরনো নামধারী হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির সঙ্গে সংগঠনগতভাবে যে আর এস এসের খুব দূরত্ব আছে, তেমনটা মনে করবার কিন্তু কোনো কারণ নেই।এইসব সংগঠনগুলি আর এস এসের সঙ্গে দৈনন্দিন নৈকট্য বজায় রেখেই এতোকাল এইরাজ্যে তাদের সাংগঠনিক কার্যকলাপ চালিয়ে এসেছে।এইসব সংগঠনগুলির আর এস এস সংযোগের কারণেই পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকারের আমলে প্রশাসন এদের প্রতি আদৌ রাজনৈতিক স্পেস দিয়ে চলতো না।বিগত দশ বছর, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকালে জনসঙ্ঘ, হিন্দু মহাসভা, হিন্দু সভার মতো তিন চার দশক আগে প্রায় অবলুপ্ত হয়ে যাওয়া আর এস এসের শাখা সংগঠনগুলি কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বেশ ফুলে ফেঁপে উঠেছে।এই সংগঠনগুলি আদর্শগতভাবে আর এস এসের কর্মসূচির প্রচার, প্রসার ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে গত দশ বছর, মমতার শাসনকালে এই রাজ্যে বিরাটরকম সাফল্য পেয়েছিল।সেই সাফল্যের ডিবিডেন্ট গত ২০১৯ এর লোকসভার ভোটে ১৮ টি আসন জেতার ভিতর দিয়ে আর এস এসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি বেশ ভালোভাবেই পেয়েছে।

কিন্তু অন্যদল থেকে আসা নেতা কর্মীদের দাপট বিজেপিতে শক্তিশালী হয়ে পড়ছে।নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ, জে পি নাড্ডারা আর এস এসের সাম্প্রদায়িকতার ধ্রুপদীয়ানার পথে থেকে যে পথে হাঁটছে, তাতে মোদির বিজেপি অচিরেই আর এস এসের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে- এই আশঙ্কা তাবড় তাবড় সঙ্ঘ নেতাদের ভিতরে ইতিমধ্যেই দেখা দিতে শুরু করেছে।তাই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ২৯৪ টি আসনের ভিতর ১৫০ র ও বেশি আসনে এই হিন্দু সভা, জনসঙ্ঘ, হিন্দু মহাসভার প্রার্থী দেওয়া ঘিরে একটা রাজনৈতিক আশঙ্কা ক্রমশঃ ই দানা বাঁধতে শুরু করেছে।গত লোকসভা ভোটে যে ধুন্দুমার কাণ্ডের ভিতর দিয়ে আসানসোলে বিজেপি প্রার্থী বাবুল সুপ্রিয় জিতেছেন, সেই বাবুলকে চলতি বিধানসভার ভোটে টালিগঞ্জে প্রার্থী করেছে বিজেপি।গোটা বিষয়টা ঘিরে যে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবিরে বেশ মতদ্বৈততার সৃষ্টি হয়েছে তা পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে ওই আসনে জনসঙ্ঘের সুদীপ সোম প্রার্থী হওয়ার ফলে।

বাবুল সুপ্রিয়র মতো অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঠিক মতো মেনে নিতে পারছে না বলেই কি আর এস এসের কট্টরপন্থী অংশ এই জনসঙ্ঘের ব্যানারে সুদীপ সোমকে প্রার্থী করেছে? বাবুল যদি জেতেন, লোকসভার যে একটি আসনে অকাল নির্বাচন ঘটবে, সেটি কি আর এস এস পছন্দ করছে না? অকাল নির্বাচন যেখানেই হোক, একমাত্র জনপ্রতিনিধির মৃত্যুর কারণ ছাড়া দলবদল, অহেতুক নির্বাচিত প্রতিনিধির নির্বাচন ক্ষেত্র বদলজনিত নির্বাচন যে সাধারণ মানুষকে ক্ষিপ্ত করে তোলে- এই ভাবনা থেকে কি সঙ্ঘ পরিবারের ভিতর থেকে কাউকে টালিগঞ্জে প্রার্থী করেছে আর এস এস?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)