চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

পর্নোগ্রাফির একাল-সেকাল

গল্পটা শুনেছিলাম আমার আব্বার কাছে। আব্বারা তখন রংপুর কারমাইকেল কলেজের ছাত্র। বেশ কয়েকজন সমবয়সী ভাই রংপুরে তাদের আইনজীবি জ্যাঠো, মানে বড়চাচার বাসায় থাকতো। আব্বার জ্যাঠো ছিলেন কঠিন ধরণের মানুষ। সন্ধ্যা-রাতে হঠাৎ হঠাৎ এসে টহল দিয়ে যেতেন আব্বাদের ঘরে, কী হচ্ছে? ছেলেগুলো ঠিকমত পড়াশোনা করছে কীনা? সঠিক সময়ে ঘরে ফিরেছে কিনা?

ঠিক এরকমই একদিন টহল দিতে গিয়ে আমার এক চাচার সামনে গিয়ে জানতে চাইলেন, “কী বাহে, কী পড়ছেন?” চাচা উত্তরে বললেন, “ জ্যাঠো গ্রামার “ ”বাহ বাহ, খুব ভাল, খুব ভাল। দেখি,” বলে উনি টেবিল থেকে বইটি তুলে নিয়ে আঁৎকে উঠলেন, বইয়ের নাম ’প্রিয়া ও পরকীয়া’। গ্রামার না পড়ে তার ভাতিজা এরকম একটা ‘ন্যাক্কারজনক’ বই পড়ছে, তা দেখে উনি হতচকিত। গম্ভীর কন্ঠে শুধু বললেন, “ বাহে প্রিয়াটাতো বুঝিনু কিন্তু পরকীয়াটা কী?” সেকালে এই বই পড়াটাই ছিল ভয়াবহ একটি অপরাধ। ছেলে নষ্ট হয়ে গেছে এমনটাই ধারণা নিয়ে আমাদের দাদা ‘হায় হায়’ করতে করতে প্রস্থান করলেন। শুনেছি ঐ রাতেই দাদা তাঁর ছোট ভাইকে, মানে ঐ চাচার বাবাকে তার ছেলের বিপথে যাওয়া নিয়ে একটি নাতিদীর্ঘ পত্রও লিখেছিলেন।

এরপর আমরা যখন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, সম্ভবত ১৯৮৪/৮৫ সাল, এলো ভিসিআর। আমাদের অনেক বন্ধুবান্ধব মাসে বা দু’তিন মাসে একবার দল বেধে ভিসিআরে ট্রিপল এক্স বা পর্ণ মুভি দেখতো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা পুরান ঢাকার নির্দিষ্ট বাড়িতে গিয়ে ৪/৮ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে এসব দেখতো। অথবা কোন বন্ধুর বাসায়, ভিসিআর ভাড়া করে এনে। তবে এই শো দেখাটা খুব একটা ঝুকিঁহীন ছিলনা। প্রায়ই পুলিশ, এলাকাবাসীর বা অভিভাবকের তাড়া খেতে হত। তারপর দৌড়ে এছাদ-ওছাদ হয়ে পালাতে হত।

Advertisement

কারো কারো অবশ্য ঐসব জায়গায় গিয়ে নীলছবি দেখারও সাহস হতোনা। বড়জোর নীলক্ষেত থেকে চটি বা পর্নো ম্যাগাজিন কিনে ছবি দেখতো লুকিয়ে চুরিয়ে, কেউ কেউ শুধু নগ্ন পোষ্টার কিনেই ক্ষান্ত হতো। তবে সবাই কাজটা করতো মাঝেমাঝে ও খুব ভয়ে ভয়ে যাতে বাবা মা বা বড়রা টের না পায়। মেয়েরাও মাঝেমাঝে বিপ্লবী হয়ে এসব দেখার উদ্যোগ নিতো। কিন্তু খুব একটা ভাল অভিজ্ঞতা ছিলনা সেটা। দিনকাল বদলেছে, এসেছে আধুনিক প্রযুক্তি, ছেলেমেয়েরাও অনেকটাই সাহসী ও স্বাধীন হয়ে উঠেছে। আর সবকিছুর সাথে সাথে বদলে গেছে তাদের সবধরণের চাহিদা ও রুচিবোধ। পর্নোগ্রাফি দেখা বা সেটা নিয়ে বন্ধুবান্ধবের সাথে আলোচনা করাটা এখন আর কোন নিষিদ্ধ বিষয় নয়। শুধু দেখা নয়, শিশুরা এখন এসব পর্নোগ্রাফিতে ব্যবহৃতও হচ্ছে–জেনে বা না জেনে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার স্কুলগুলোর শতকরা ৭২ টি বাচ্চা পর্নোগ্রাফি দেখে, লেনদেন করে !!!  আমরা দ্বিতীয় দফা গবেষণায় হাত দিচ্ছি, দেখা যাক আরো কী ভয়াবহ তথ্য বেড়িয়ে আসে।

ইন্টারনেট, আধুনিক মোবাইল ফোন, অসংখ্য পর্নো ওয়েবসাইট এর ব্যাপক ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বিষয়টিকে ভয়াবহ অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ২০০৯ সালে যে গবেষণা করেছিল শিশুদের পর্নোগ্রাফি দেখা, বিনিময় ও জড়িয়ে পড়া নিয়ে, তা থেকে যে তথ্য বেড়িয়ে এসেছিল, তা উদ্বেগজনক। বাবা মা বা অভিভাবকরা ধারণাই করতে পারছেনা তাদের সন্তান মোবাইল ফোন, ব্লুটুথ, পেনড্রাইভ, ল্যাপটপ, কম্পিউটার ও ইন্টারনেটকে কী কায়দায় ব্যবহার করছে। অভিভাবকদের অবিরত ব্যস্ততা ও অজ্ঞতা, সন্তানকে বুঝতে না পারা, শিশুর একাকীত্ব, প্রযুক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার এবং আজেবাজে সঙ্গ শিশুকে বিপথে চালিত করছে।

দিনে দিনে এর হার বাড়ছে। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হচ্ছে শিশুরা পর্নোগ্রাফি দেখছে, তাদের এখানে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং এরা পর্নোগ্রাফি ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। তরুণ, যুবকদের অবস্থা আরো সাংঘাতিক। ধনী, মধ্যবিত্ত এবং পথশিশু কেউই বাদ যাচ্ছেনা এর আক্রমণ থেকে। আশংকা, পর্নোগ্রাফির এই আগ্রাসন এখন যেকোন কিছুর চেয়েও প্রাণঘাতি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)